রক্তরাঙা শিমুল বাগান : ভ্রমণ গল্প

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : শিমুল বাগান




শিমুল বাগান

ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ



এলোরে বসন্ত। গাছে গাছে কোকিলের মিষ্টি সুরেলা গান। ছায়া ঘেরা নিরিবিলি পরিবেশে অনবরত কুহু-কুহু ডাক। আর সেই সুরেলা আওয়াজ যদি হয় রক্ত রাঙ্গা শিমুল ফুল ফোটা গাছের তলায়ম, তাহলে তো আর কথাই নেই। পুরো বাগান জুড়ে এখন ফুটন্ত শিমুল ফুল। কাক ডাকা ভোরে গাছে থাকা থোকায় থোকায়, আর ঝড়ে পড়া সবুজ ঘাসের ওপর বিছানো ফুল গুলো দেখার মাঝে এক অন্যরকম অপার্থিব সুখ অনুভূত হয়। সুনামগঞ্জ জেলার রক্ত রাঙ্গা শিমুল বাগান দেখার জন্য ভ্রমণপিপাসুরা যখন হুমড়ি খেয়ে পড়ে,তখন আমাদের দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুরাও বাদ যায়নি। অনেকে শুধু বাগান ঘুরেই আবার ফিরতি পথ ধরেছিলেন। কিন্তু সেই জেলাতেই যে আরও কত রকমের মায়াবী প্রকৃতির ছড়াছড়ি রয়েছে তা হয়তো জানা ছিল না অনেকের।

রাত্রি যাপন

প্রায় একশত কেয়ার (ত্রিশ শতাংশে এক কেয়ার) জমির ওপর সৃজন করা শিমুল বাগানে তাঁবু টানিয়ে রাত্রি যাপন আর ঝলসানো আগুনে দেশী মোরগের গোস্ত পুড়ে খাওয়ার মজাই ছিল অন্যরকম আনন্দের। সেই সঙ্গে হুট করেই আয়োজন করা, বাগানের ভেতরেই ভাতের পাতে হাওরের রুই আর গুড়া চিংড়ী। আমাদের এহেন কাণ্ডে এতক্ষণ আশপাশ থেকে যারা এসে জড়ো হয়েছিল, রাত বাড়ার সাথে সাথে তারা যে যার মতো চলে গেল। একসময় পুরো বাগান জুড়ে শুধু আমরাই ৬জন। রাত্রি যখন গভীর সুনসান নিরিবিলি, পুরো শিমুল বাগান জুড়ে নৈশব্দ। সঙ্গী তখন চৌধুরীর অনবরত কর্কশ নাক ডাকার আওয়াজ আর মাঝেমধ্যে দু-চারটা কুকুরের ঘেউঘেউ। তাতে করে মন্দ লাগেনি। বাগানের পাশেই নদীর পানি বয়ে চলেছে অজানায়। মায়াবিনী জাদুকাটা নদীর ওপার ভারতের মেঘালয় প্রদেশের সীমান্ত চৌকির উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বাতি গুলো জ্বল জ্বল করছিল। ভর বসন্তেও ছিল শীতের হীমহীম হাওয়া। প্রকৃতির নিস্তব্ধতাও ভিন্নরকম ভালোলাগার। যা আপনার ভাবুক মনকেও নদীর পানির মতো নিয়ে যাবে দূর অজানায়।

সূর্যোদয়ের সকাল

ভাবুক মনের ক্লান্তি দেহে ভর করলে এক সময় ঘুমের দেশে হারিয়ে যাই। উঠি খুব সকালে। সূর্যাস্তের বিকেল আর সূর্যোদয়ের সকালে এরকম দুটো সময়েই আমরা শিমুল বাগানের রূপ-রঙের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে বেশ আপ্লুত হই। বাগানের পাশের এক বাড়িতে দ্রুত সাফসুতর হয়ে, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলা স্টাফ রিপোর্টার হাবিব সরোয়ার আজাদ ভাই'র নিকট বিদায় নিয়ে বাইকে করে ছুটি নেত্রকোনার কমলাকান্দার পথে। কিছুটা পথ এগিয়েই থামি গিয়ে লাউড়ের গড় বারেকটিলা।



শহীদ সিরাজি লেক

শহীদ সিরাজ লেক। ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ



একটি পিলার দিয়েই ভারত-বাংলাদেশের সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশেই জাদুকাটা নদীর দৃষ্টিনন্দন তীর। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ধুধু মরু প্রান্তর। অসাধারণ এক নজরকাড়া প্রকৃতি। চা চক্র শেষে আবারো ছুটি। ভারত সীমান্তের উঁচু উঁচু পাহাড়ের পাদদেশ বাংলাদেশ সীমান্তের সড়ক পথে মটর সাইকেল চলে দুর্বার গতিতে।

শহীদ সিরাজ লেক

বাইক এসে থামে টেকের ঘাট শহীদ সিরাজ লেক।টলটলে নীলাভ পানির লেক। চার পাশে উঁচু নিচু পাহাড় আর টিলার মাঝে লেকটির অবস্থান। অতি উৎসাহীরা নীলাদ্রি নামে ডেকে থাকে। কেউবা বাংলার কাশ্মীর হিসেবেও সম্বোধন করে থাকে। তবে যে যা নামেই ডাকুক না কেন শহীদ সিরাজ লেকটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য। এরপর ছুটে চলি টাঙ্গুয়ার হাওর পানে। মটরবাইক চলে সরু পথ ধরে। মাঝে লাকমাছড়া খানিকটা বিরতি। সাদা পাহাড়ের পাশে বেশ ভালোই লাগে। এবার যাচ্ছি বাগলী বাজার। অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই। স্থানীয় এক দোকানে চলে যার যা ইচ্ছে মতো পুরি, সিঙ্গারা, ছোলা, পিয়াজু, মুড়লি, মিষ্টি আর গরুর দুধের মাস্তি। ইতোমধ্যে আজাদ ভাইর পরিচিত শেখ মোস্তফা ভাইও লোকজন পাঠিয়ে দিয়েছেন।

দে-ছুট বন্ধুদের নিয়ে যাবে ইন্দ্রপুর গ্রামে। সেখানে রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওর। সবাই রেডি-বাইক স্টার্ট। ছুটছি তো ছুটছি, একসময় ইন্দ্রপুর গ্রামের মায়াময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে হাওরের বুক চিরে আমরা এগিয়ে যাই। বর্ষায় যখন হিজল কড়চ গাছ গুলো প্রায় ডুবু ডুবু তখন এই মৌসুমে আমরা সেখান দিয়ে হেঁটে বেড়াই। জলের ধারে পৌঁছে নাও পাই কিন্তু মাঝি নাই। অগত্যা নিজেরাই নাও বাহিয়া হাওরের স্বচ্ছ জলরাশিতে ভেসে বেড়াই। হাওরের এ পাশটা মাছের অভয়াশ্রম। তাই পাখির দেখাও মিলে বেশ।

মহিষখোলা

বেলা প্রায় তিনটা। পেটেও টান পড়েছে। যাই এবার মহিষখোলা। যাওয়ার পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কীভাবে এই স্বল্প লিখনিতে প্রকাশ করব তা ভেবে পাচ্ছি না। শুধু এতটুকুন বলব-যখন বাইক এগিয়ে যাবে তখন মনে হবে আপনি যেন দূর পাহাড়ের কোথাও সব পিছুটান ছুড়ে ফেলে, সুখি নব জীবনের দ্বার প্রান্তে। প্রায় সীমান্ত ঘেঁষা পথে ছুটছি। আগে থেকেই অস্থির ইফতেখার সেখানে অবস্থান করে বাজারের এক হোটেলে লাল আলু দিয়ে দেশী মোরগের ঝোল আর নানান পদের ভর্তার আয়োজন করে রেখেছে।

ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই মহিষখোলা বাজারের হোটেলে পৌঁছে যাই। আহ্ কি ঘ্রাণ। কোন মতে হাত মুখ ধুয়ে বসেই যাই খেতে। একেকজনের খাওয়ার ভাব দেখে মনে হল যেন কত বছর ধরে এরকম সুস্বাদু খাবার পাতে জোটে না! খাবার শেষে এবার যাই নেত্রকোনা’র কলমাকান্দা। বিদায় ভাটির দেশ সুনামগঞ্জ। পাহাড়ের পাদদেশের সড়ক পথে মটর বাইকে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা নিশ্চিত ভ্রমণ ঝুলি সমৃদ্ধ করবে। চৈতা নতুন বাজার হতেই প্রাকৃতিক রূপের রানী নেত্রকোনা জেলা শুরু। আজ থাক এই পর্যন্তই। পরের কোন এক সংখ্যায় কলমাকান্দার গল্প হবে।




দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের সদস্যরা। ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ


যোগাযোগ : ঢাকার গাবতলি বা সায়দাবাদ হতে সুনামগঞ্জ নানান পরিবহন চলাচল করে। সুনামগঞ্জ সুরমা ব্রিজ হতে মটর বাইক বা লেগুনায় সরাসরি শিমুল বাগান। সেখান থেকে মটর বাইকে নেত্রকোনা।

বাসভাড়া : ঢাকা-সুনামগঞ্জ নন এসি ৫৫০টাকা। মটর বাইক,লেগুনা ভাড়া দরদাম করে নেয়াটাই উত্তম হবে।  

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম   এস এম