সূর্যমুখী ফুলেদের সাথে একদিন
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : সূর্যমুখী
মানুষ সুন্দরের পূজারী, যেকোনো সুন্দর জিনিস পেতে মানুষের মন ব্যকুল হয়। ফুল হচ্ছে মানুষের কাছে তেমনই ভালবাসা ও আকাঙ্ক্ষার এক বস্তু। মন ভালো করার জন্য ফুলের বাগানে ভ্রমণ অত্যন্ত সুখকর একটি বিষয়। ফুল এমন একটি বস্তু যা চোখের পলকেই বিষণ্ণ মনকে প্রফুল্ল করে দিতে পারে। সত্যি কথা বলতে, একটি মানুষ মনের দিক দিয়ে যতই কঠোর হোক না কেন ফুল তার ভালো লাগবেই। কেননা, ফুল ভালোবাসে না এমন মানুষ এই পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। সহধর্মিণী সানন্দা এসেছেন ঘুরতে, তাই আগের থেকেই আবদার করে রেখেছিল তাকে নিয়ে ঘুরতে যেতে হবে। কিন্তু নতুন কোথায় যাওয়া যায়, পড়লাম বেশ চিন্তায়। হঠাৎ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোঁজ পেলাম সিলেট শহর থেকে অল্প দূরত্বে কামাল বাজারে সূর্যমুখী ফুলের বাগানে। মনটা বেজায় খুশি হল নতুন একটি জায়গায় ঘুরতে যেতে পারবো ভেবে । তাছাড়া সহধর্মিণীর আবদার ও পূরণ করতে পারবো। যাই হোক শনি বার দিবা দ্বিতীয় প্রহরে আমরা বের হলাম সূর্যমুখী ফুলের বাগান ঘুরে দেখার জন্য।
চলছি নতুন গন্তব্যের পানে
সূর্যদেবের প্রখরতার মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি নতুন গন্তব্যের পানে।সাথে আছে আমাদের পাইলট পলাশ ভাই। বন্দর বাজার, দক্ষিণ সুরমা, টেকনিক্যাল রোড পেড়িয়ে চলছি আমরা। মহাসড়ক থেকে নতুন পথে পা দিলাম। আমরা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি পথে দেখা মিললো মায়াবতী সুরমা নদীর অসাধারণ রূপ। ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা করে মাছ ধরছে নাম না জানা মাঝি। আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে রেল লাইন এর পাশ বেয়ে । রেললাইনে এর আঁকা বাঁকা পথের দৃশ্য মন কে নাড়িয়ে দেয়। আমরা গাড়ি থেকে নেমে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম এদিকে সূর্য মামা তার রক্তিম বর্ন প্রদর্শন করে বেশ মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। রেল লাইন ধরে হাঁটছি আর নতুন স্থানের সবকিছুকে দেখছি প্রখর দৃষ্টিতে বেশ মনোযোগের সহিত। আমাদের গাড়ির পাইলট পলাশ ভাই মনে করিয়ে দিলেন আমাদের গন্তব্য কামাল বাজারে যেতে হলে এখনই যেতে হবে। তাই আবার আমরা গাড়িতে চেপে রওনা দিলাম গন্তব্যে। নতুন গন্তব্য তাই চারদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে। এই বুঝি গন্তব্য স্থান পেড়িয়ে চলে যাচ্ছি।চলে এসেছি গন্তব্যে
স্বাগতম কামাল বাজার ইউনিয়ন পরিষদ দেখে খুব খুশি হলাম, এবার বোধকরি চলে এসেছি গন্তব্যে। কিন্তু বেশ খানিক পথ যাবার পরেও কোন ফুলের তো দেখা পাচ্ছি না। ভুল পথে চলছি না তো আমরা। পলাশ ভাইকে বললাম এলাকার কারো কাছে যেনে নেন সঠিক পথে যাচ্ছি তো আমরা। পলাশ ভাই গাড়ি থামিয়ে জানতে চাইলেন, কোথায় গেলে সূর্যমুখী ফুলের বাগান এর দেখা পাওয়া যাবে।প্রত্যুতরে জনৈক ভদ্র লোক বললেন সামনেই দেখা পাবেন ফুল বাগানের। আগন্তুকের কথা মত কিছু দূর যাবার পরেই আমরা দেখা পেলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই সূর্যমুখী ফুলের বাগানের। নীল আকাশের মায়াবী রূপের সাথে সূর্যমুখী ফুলের মায়াবী রূপ যে কারোর মন কে নাড়া দিতে বাধ্য। আমাদের মত অনেকেই এসেছেন এই নতুন গন্তব্য দেখতে। মাঠজুড়ে হলুদের রাজ্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন প্রকৃতি-প্রেমীরা পর্যটকরা। হলুদের আভায় চারিদিকেই যেন ছড়িয়ে আছে অপার মুগ্ধতা। রূপে প্রাণ জুড়িয়ে যাবে যে কারোরই। সবুজ মাঠ আর হলুদের ফুলের ওপর মৌমাছি, পাখির আনাগোনা চোখে পড়ার মত। ফুল থেকে তেল উৎপাদনের পাশাপাশি এখানে উৎপাদিত হচ্ছে মধুও। সূর্যমুখী খেতে পাখির আনাগোনা।বাগানে প্রবেশ
সূর্যমুখী ফুলের মোহনীয় রূপ আমাদের বিমোহিত করলো। অনুমতি নিয়ে বাগানে প্রবেশ করি আমরা। অসাধারণ লাগছিল সূর্যমুখী ফুলের বাগান দিয়ে হেঁটে যেতে। আমি একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম। বলে রাখা ভালো শীতের ফুল সূর্যমুখী। এই ফুল দেখতে কিছুটা সূর্যের মতো। সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে বলে এর নাম হয়েছে সূর্যমুখী। সূর্যমুখীর বৈজ্ঞানিক নাম হেলিয়ানথাস। দেখতে কিছুটা সূর্যের মতো এবং সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে বলে একে সূর্যমুখী ফুল বলা হয়। এর পাপড়িগুলো চারদিকে ছড়ানো। ফুলের ব্যাস ৩০ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। সূর্যমুখী এক ধরনের একবর্ষী ফুলগাছ। এই ফুলের গাছ ১-৩ মিটার উঁচু আর কাণ্ড ও পাতা বেশ রোমশ হয়।তেলের উৎস হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সূর্যমুখীর ব্যাপক চাষ হয়। আমাদের দেশে শীতকালীন শস্য হিসেবে এর চাষ হয়ে থাকে। ১৯৭৫ সাল থেকে সূর্যমুখী তেল ফসল হিসেবে এ দেশে আবাদ হচ্ছে। সূর্যমুখী কয়েক জাতের হয়। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সূর্যমুখী ফুল ফোটে।এর বীজ হাঁস মুরগির খাদ্য-রূপে ও তেলের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ বীজ যন্ত্রে মাড়াই করে তেল বের করা হয়। তেলের উৎস হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সূর্যমুখীর ব্যাপক চাষ হয়। সূর্যমুখীর তেল 'ঘি'-এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হয়, যা বনস্পতি তেল নামে পরিচিত। এই তেল অন্যান্য রান্নার তেল থেকে ভাল এবং হৃদরোগীদের জন্য বেশ কার্যকরী। বন্ধুদের কাছে একটি অনুরোধ করবো যারা যাবেন সূর্যমুখী ফুলের বাগান ঘুরে দেখতে দয়া করে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করুন ফুল বাগানে। কোন প্রকার পানির বোতল, চিপস প্যাকেট ফেলে দূষিত করবেন না পরিবেশ।
পথের ঠিকানা :
ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, রাজারবাগ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রিনলাইন, শ্যামলী, এনা, হানিফ বা বিআরটিসি বাসে অথবা ট্রেনে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালে আন্তঃনগর পারাবাত, দুপুরে জয়ন্তিকা ও কালনী এবং রাতে উপবন সিলেটের পথে ছোটে ভাড়া ৩৬০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে । সিলেট শহর থেকে কামাল বাজার সিএনজি অথবা গাড়ি ভাড়া করে যেতে হবে। ভাড়া ৫০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা।সুমন্ত গুপ্ত এস এম

