শমসেরনগরের বধ্যভূমিতে একদিন

বাংলাদেশ শহীদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিখাদ দেশপ্রেমের চূড়ান্ত ফসল শমসেরনগরের বধ্যভূমি


বধ্যভূমি

ছবি: সুমন্ত গুপ্ত


 আজ বিকেলে ফিরতে হবে নিজ গন্তব্যস্থলে, তাই আগের থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম আজ সকাল সকাল বের হবো। নতুন গন্তব্যের সন্ধানে তা না হলে ফিরতি ট্রেন ধরতে দেরি হয়ে যাবে। শীত আসি আসি করছে তাই এই সময়টার ঘুম অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় আরামদায়ক। ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হচ্ছিল বৈকি। ঘুম থেকে উঠেই প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলাম নতুন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য। মনে মনে ভাবছিলাম কোথায় যাওয়া যায়, কারণ ফিরতি ট্রেন ধরে আমাদের ফিরে যেতে হবে শহর পানে তাই বেশি সময় দেয়া যাবে না। ও বলাই হলো না, আমরা আছি সিলেটের শমসের-নগরে অবস্থিত সুইস ভ্যালী রিসোর্টে। আমরা রিসোর্টের কর্মীর কাছে জানতে চাইলাম আশেপাশে খুব কম সময়ে কোথা থেকে ঘুরে আসতে পারবো। বলতেই বললেন নিকট দূরত্বে চা বাগান আছে সেখানে ঘুরে আসতে পারেন। আমি বললাম চা বাগান তো দেখেছি আর কোথায় যাওয়া যায়? তিনি বললেন, তাইলে আপনারা বধ্যভূমি থেকে ঘুরে আসতে পারেন। সেখানে তেমন একটা লোকজন যায়না বললেই চলে। আমি বললাম তাইলে যাওয়া যায়। আর এই সুযোগে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর সেনানীদের শ্রদ্ধা ও জানিয়ে আসতে পারবো।

যাব কীভাবে

আমরা যাব কীভাবে জিজ্ঞেস করতেই প্রত্যুত্তরে রিসোর্টের কর্মী জানালেন, আপনি রিসোর্ট থেকে বের হয়ে যে কাউকে বললেই আপনাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে বধ্যভূমি থেকে। আমরা বের হলাম রিসোর্ট থেকে, বের হয়েই পথের ধারে তিন চাকার যানবাহন পেলাম। বললাম বধ্যভূমিতে যাব, আমার কথা শুনে আকাশ থেকে পরলেন তিন চাকার যানের কাণ্ডারি। তিনি বললেন, এখানে বধ্যভূমি পেলেন কোথা থেকে, আমি বললাম সামনেই আছে বুঝি। আমার কথা শুনে পাইলট মহোদয় বললেন চলেন যাই খুঁজে বের করে নেবো। আমি আশেপাশে কোন যানবাহনের দেখা নেই দেখতে পেয়ে ভাবলাম ওনাকেই নিয়ে নেই খুঁজে বের করে নেবো, এখন সময় নষ্ট করা যাবে না। আমরা বের হলাম, পাইলট সাহেব বললেন বাজারে গিয়ে দেখি কেউ চিনতে পারে কিনা আপনাদের কাঙ্ক্ষিত বধ্যভূমিটি। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম বাজারে। পাইলট মহোদয় কয়েক জনের সাথে কথা বললেন। এবার বললেন চলেন, এইবার চিনতে পারেছি। এইখানে মানুষজন যায় না বললেই চলে, তাই চিনতে পারছিলাম না আমি। পঁচিশ মিনিটের মাঝেই আমরা পৌঁছলাম বধ্যভূমির সামনে।

শমসেরনগরের বধ্যভূমি

জঞ্জালেঘেরা অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় দেখতে পেলাম বধ্যভূমি। দেখে খারাপই লাগলো। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, পৃথিবির বুকে জন্ম নেয় নতুন একটি রাষ্ট্র। বিশ্ব মানচিত্রে যুক্ত হয় বাংলাদেশের নাম। টানা ৯ মাস ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে বাংলাদেশকে দিতে হয়েছে ৩০ লক্ষাধিক শহীদের প্রাণ আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার দ্বারা এদেশের মানুষের সাথে ঘটে যাওয়া বর্বরতা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনার অন্যতম উদাহরণ। বাংলাদেশ শহীদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিখাদ দেশপ্রেমের চূড়ান্ত ফসল। কিন্তু আমরা সেসব শহীদদের প্রাপ্ত সম্মান কি দেখাতে পেরেছি? জানিয়েছি কি সেসব শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস প্রজন্মের কাছে? মনে মনে খুঁজছিলাম এই বধ্যভূমির ইতিহাস সম্বলিত কোন ফলক পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু কোন ইতিহাস লিপিবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পেলাম না । শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার শিকার শহীদদের নাম ও ঠিকানা একে একে করে দেয়া আছে। বধ্যভূমির পাশে তেমন কারোর দেখাই পেলাম না, কিছুক্ষণ পর পর যাত্রীবাহী যানবাহন ছাড়া। আমার পাইলট মহোদয় ও এর ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই বলতে পারলেন না।


বধ্যভূমি

ছবি: সুমন্ত গুপ্ত


 

ফলকে শহীদদের নাম এবং শ্রদ্ধা

শমসেরনগরের বধ্যভূমি-র ফলকে যাঁদের নাম দেখতে পেলাম তাঁরা হলেন পিযুষ পাল–সোনাপুর গ্রাম , প্রতাপ পাল-সোনাপুর গ্রাম, মোঃ রুস্তম মিয়া–কেছ্লুটি গ্রাম, মোঃ আমজদ আলী-শমশেরনগর বাজার, মোঃ মবশ্বীর আলী-সোনাপুর গ্রাম, আব্দুল হাই–শিংরাউলী গ্রাম, মরহুমা জহুরা হাই-শিংরাউলী গ্রাম, মোতাহির আলী–শিংরাউলী গ্রাম, হাজী সাদ উল্ল্যা-ভাদাইরদেউল গ্রাম, ডাঃ হোসেন আহমদ-ভাদাইরদেউল গ্রাম । আমরা কিছু সময় দাঁড়িয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। পুবের বাতাস বইছে, দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের ডাক। আমাদের পাইলট সাহেব বললেন এক জায়গায় বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকবেন না জোঁকে ধরতে পারে। ওনার কথা শুনতেই আমি তাকাতে লাগলাম পা এর দিকে। কিছু সময় দাড়াতেই পা বেয়ে বিচুটি ওঠা শুরু করেছিল চোখে পরেছিল বলে রক্ষা। দেখতে দেখতে কীভাবে যে সময় ছুটে চলছিল আমরা টেরই পেলাম না। আমরা ফিরে চললাম ফিরতি পথে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক এসব বধ্যভূমি, যাতে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের ত্যাগ, নির্যাতিত মা বোনদের হাহাকার। আর সাক্ষী হয়ে আছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এ দেশীয় সহচরদের নারকীয় গণহত্যা , নারী নির্যাতনের ইতিহাস। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, খোলা আকাশের নিচে বধ্যভূমি স্মৃতি স্তম্ভটি নির্ভীক প্রহরীর মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

কীভাবে যাব শমসেরনগরের বধ্যভূমি তে ?

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানযোগে মৌলভীবাজার যাওয়া যাবে। রেলপথে এলে ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে করে নামতে হবে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ বা শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে। সব আন্তঃনগর ট্রেন শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করলেও ভানুগাছ ও শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে সব আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। ফলে আগেই জেনে নিতে হবে কোথায় নামতে হবে। শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে নামলে সেখান থেকে বাস ও সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া যায়। শমসেরনগর পর্যন্ত বাসে যাওয়ার পর সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সহজেই লেকটিতে পৌঁছানো সম্ভব। যাদের প্রচুর হাঁটার অভ্যাস আছে তারা শমসেরনগর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটেও যেতে পারেন। আর ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাসে আসতে চাইলে মৌলভীবাজারগামী বাসে ওঠে নামতে হবে শ্রীমঙ্গলে। সেখান থেকে একইভাবে লেকটিতে যাওয়া যায়। এ ছাড়া বিমানে এলে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে নেমে বাস বা ট্রেনে আসা যাবে শমসেরনগর। পরিবহণের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন গন্তব্য–০১৯২৯৪১৭৪৪১  

সুমন্ত গুপ্ত   এস এম