আলি আমজদের ঘড়ি : ঊনবিংশ শতকে নির্মিত সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বিশেষ একটি ঘরের চূড়ায় স্থাপিত সিলেটের ঐতিহ্য নান্দনিক এই ঘড়ি

সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত আলী আমজদের ঘড়ি। সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত আলী আমজদের ঘড়ি। ছবি : ডেইলি সান

সিলেট শহরের সুরমা নদীর ওপর কিন ব্রিজের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়েছিল লাল রঙের বিশাল ঘড়িটা। অবাক হতে হবে টিনের তৈরী বহুদিনের পুরনো ঘড়ি টাকে দেখে৷ সিলেটের সুরমা নদীর চাদনী ঘাটে অবস্থিত বেশ বিখ্যাত এক স্থাপনা এই 'আলি আমজাদের ঘড়ি'। ঘড়িটির স্থাপত্যে রয়েছে পাশ্চাত্যের সুস্পষ্ট ছাপ। প্রায় ১৪৬ বছরের পুরনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সাথে জড়িয়ে রয়েছে অনেক ইতিহাস। টাওয়ার আকৃতির এই আলি আমজদের ঘড়ির উচ্চতা ২৪ দশমিক ৩ ফুট। ঘড়ির ডায়ামিটার আড়াই ফুট এবং ঘড়ির কাঁটা দুই ফুট লম্বা। ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে, যখন ঘড়ির তেমন একটা প্রচলন ছিলনা, ঠিক সেসময় সিলেট মহানগরীর প্রবেশদ্বার (উত্তর সুরমা) কিন ব্রিজের ডানদিকে সুরমা নদীর তীরে এই ঐতিহাসিক ঘড়িঘরটি নির্মাণ করেন সিলেটের কুলাউড়ার পৃত্থিমপাশার জমিদার নবাব আলি আহমদ খান। ওই বছর তৎকালীন বড়লাট লর্ড নর্থব্রুক সিলেট সফরে এসেছিলেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নবাব আলি আহমদ খান ঘড়িটি বানিয়েছিলেন। তিনি ঘড়িটির নামকরণ করেন নিজের ছেলে আলি আমজদ খানের নামে।

ছবি : সিলেট সিটি কর্পোরেশন

গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ভারতের দিল্লির চাঁদনী চক থেকে অনুপ্রণিত হয়ে নবাব আলি আহমদ খান এই ঘড়িটি স্থাপনে উদ্যোগী হয়েছিলেন। লোহার খুঁটির ওপর ঢেউটিন দিয়ে সু-উচ্চ টাওয়ার আকৃতির ঘড়ি ঘরটি তখন থেকেই আলি আমজাদের ঘড়ি নামে পরিচিতি লাভ করে। তখনকার সময়ে এখানকার মানুষ সাধারণত সূর্যের আলো দেখেই সময় আন্দাজ করে নিতেন। ঘড়িটি চালু হওয়ার পর সময় জানার জন্য এটিই তখন অনেকের অবলম্বন হয়ে ওঠে। সে আমলে মানুষজন শহরের প্রবেশপথে স্থাপিত ঘড়িঘরের সময় দেখে শহরে আসা-যাওয়া ও কাজকর্ম সম্পাদন করতেন। সেই সময়ে শহরে প্রবেশ করতেই দর্শকদের চোখে পড়ত বিখ্যাত কিন ব্রিজের পশ্চিম পাশে অবস্থিত ঘড়িটির দৃশ্য। বিশাল আকারের ঘড়িতে বড় বড় কাঁটা। অনেক দূর থেকে চোখে পড়ে। ঘড়ির জন্য নির্মিত হয়েছে রীতিমতো বিশাল একটি কাঠামো। বিরাট আকারের ডায়াল ও কাঁটা সংযুক্ত সু-বিশাল ঘড়িটির ঘণ্টাধ্বনি শহরের বাইরে অনেকদূর থেকেও শোনা যেত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে এই প্রাচীন ঘড়িঘর বিধ্বস্ত হয়। স্বাধীনতার পর সিলেট পৌরসভা ঘড়িটি মেরামতের মাধ্যমে সচল করলেও কিছুদিনের মধ্যেই ঘড়ির কাঁটা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে আলি আমজদের ঘড়ি মেরামত করে পুনরায় চালু করা হয়।

ঘড়িটি চালু করার পর তা যেন ঠিকমতো চলতে থাকে সেজন্য ঢাকার একটি কোম্পানী থেকে রিমোট কন্ট্রোলের ব্যবস্থা করা হয়। পৌর চেয়ারম্যানের অফিস থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে ঘড়ির কাঁটা ঘুরানো হতো। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই ঘড়ির কাঁটা আবার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সিজান কোম্পানী ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে ঘড়িটি পূনরায় চালু করার ব্যবস্থা করে। কিন্তু বছর না ঘুরতেই ঘড়ির কাঁটা আবারও বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এই ঘড়িটিকে আবার মেরামত করায় এবং এরপরে এটি দৈনিক ২৪ ঘন্টাব্যাপী সচল রয়েছে। বর্তমানেও সিলেট বাসীদের কাছে ঘড়িটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। আলি আমজদের ঘড়িকে কেন্দ্র করে সিলেটে একটি স্থানীয় প্রবাদ চালু ছিল :

'চাঁদনী ঘাটের সিড়ি,

আলি আমজাদের ঘড়ি,

জিতু মিয়ার বাড়ি,

বঙ্কু বাবুর দাড়ি'

ছবি : উকিমিডিয়া কমনস্

সিলেটের এই অনন্য ঐতিহ্যবাহী ঘড়িটি দেখতে হলে চলে আসতে হবে ক্বীন ব্রীজের কাছে। সিলেট শহরের যেকোনো জায়গা থেকেই অটো রিকশা, সিএনজি কিংবা রিকশায় করে অল্প সময়েই পৌঁছে যাওয়া। তবে তার আগে পৌছাতে হবে সিলেট শহরে। ঢাকা থেকে সড়ক, ট্রেন ও আকাশপথে সিলেট যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে সড়ক পথে সিলেটের দূরত্ব ২৪১ কিলোমিটার। ঢাকার সায়েদাবাদ ও গাবতলী বাস স্টেশন থেকে সরাসরি সিলেট যাওয়ার এসি ও নন-এসি বাস সার্ভিস রয়েছে। এই বাসগুলোতে করে ঢাকা থেকে সিলেটে যাতায়াত করতে সাড়ে চার থেকে ছয় ঘন্টার মত সময় লাগে।

ঢাকা থেকে সিলেট গামী নন-এসি বাসগুলো হল ইউনিক সার্ভিস, শ্যামলী পরিবহন, এনা, আল মোবারাকা, মামুন এন্টারপ্রাইজ, আরপি এলিগ্যান্স ও হানিফ এন্টারপ্রাইজ। ভাড়া ৪৫০ থেকে ৪৭০ টাকা। আর এসি বাসগুলো হলো গ্রিন লাইন পরিবহন, সৌদিয়া এসআলম পরিবহন, শ্যামলি পরিবহন, লন্ডন এক্সপ্রেস পরিবহন ও গোল্ডেন লাইন পরিবহন। ভাড়া ৯৫০ থেকে ১,২০০ টাকা। ঢাকা থেকে সিলেট রেল স্টেশনের দূরত্ব ৩১৯ কিলোমিটার। ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে সিলেটগামী ট্রেনে সরাসরি সিলেট আসা যায় সাত থেকে আট ঘন্টার মধ্য। কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে প্রতিদিন অনেকগুলো ট্রেন সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে সিলেট রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলো হল পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও কালনি এক্সপ্রেস। এসব ট্রেনের ভাড়া সর্বনিম্ন ২৬৫ থেকে সর্বোচ্চ ১,০৯৯ টাকা পর্যন্ত। ঢাকা থেকে দ্রুত সিলেটে পৌছানোর জন্য সরাসরি বিমানে আসা যায়। ঢাকা থেকে সিলেটগামী বিমানগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড়াল দিয়ে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করে। বিমান বাংলাদেশ, নভো এয়ার, ইউ এস বাংলা এয়ারলাইনস প্রভৃতি বিমান ঢাকা থেকে সিলেটে রুটে নিয়মিত চলাচল করে। বিমান ভাড়া সর্বনিম্ন ২,৭০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭,০০০ টাকা পর্যন্ত।


তথ্যসূত্র : https://bn.m.wikivoyage.org/wiki/%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A7%80_%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%98%E0%A6%A1%E0%A6%BC%E0%A6%BF https://scc.gov.bd/niceplaces/%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A7%80-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%98%E0%A7%9C%E0%A6%BF/ http://www.sylhet.gov.bd/http://www.sylhet.gov.bd/site/top_banner/3574117d-0758-11e7-a6c5-286ed488c766/%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%9F-%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B2-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%A8,-%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A7%80%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%9C,-%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A7%80-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%98%E0%A7%9C%E0%A6%BF-%E0%A6%8F%E0%A6%AC%E0%A6%82-%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A7%81-%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BF http://www.sylhetdiv.gov.bd/site/view/tourist_spot https://www.flightexpert.com/blog/dhaka-sylhet-airtickets http://www.railway.gov.bd/site/page/293eb35f-8b6a-4036-898c-fd94437670b4/%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%9F--%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%9F%E0%A6%B8%E0%A7%82%E0%A6%9A%E0%A6%BF