কিশোরগঞ্জে অবস্থিত উপমহাদেশের প্রথম মহিলা কবির নামে মন্দির
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : কবি চন্দ্রাবতী মন্দির যেন বেদনাবিধুর এক বিরহগাথা
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সু-উচ্চ স্থাপনা। ছবি : মাইজখাপন স্থাপন
'শৈশব কালের সঙ্গী তুমি যৈবন কালের সাথী
অপরাধ ক্ষমা করো তুমি চন্দ্রাবতী
পাপিষ্ঠ জানিয়া মোরে না হৈলা সম্মত
বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মতো'
উপরের পঙক্তিমালা রচনা করা হয়েছিল চন্দ্রাবতীকে উদ্দেশ্য করে, রচয়িতা চন্দ্রাবতীর শৈশবকালের প্রেমিক জয়ানন্দ। এক বেদনাবিধুর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এই পঙক্তিমালা এখনো শোভা পাচ্ছে শতবর্ষ পুরাতন চন্দ্রাবতী মন্দিরের প্রবেশপথে। কে ছিলেন এই চন্দ্রাবতী? কি পরিণতি হয়েছিল চন্দ্রাবতী আর জয়ানন্দের সেই প্রণয়ের? কোথায়ই বা এই চন্দ্রাবতী মন্দির? আজকের এই লেখার মাধ্যমে এই প্রশ্নগুলির জবাব তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে। কবি চন্দ্রাবতী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি। ষোড়শ শতকের বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত নিদর্শন মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা দ্বিজবংশী দাস এবং সুলোচনা দাসের কন্যা চন্দ্রাবতীর জন্ম ১৫৫০ সালে, বর্তমান কিশোরগঞ্জের পাতুয়াইর গ্রামে। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে এই পাতুয়াইর গ্রাম একসময় ছিলো ফুলেশ্বরী নদীর তীরে, যার আজ কোনো চিহ্নমাত্র নেই।
এই নদীতীরেই বেড়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যের এই আদি মহিলা কবি। বাবা দ্বিজবংশী দাসের মতই চন্দ্রাবতীও ছিলেন একাধারে একজন ভাসান কবি, গীতিকার এবং রামায়ণ রচয়িতা। ১৫৭৫ সালের দিকে কবি তার বাবাকে সাথে নিয়ে মনসা দেবীর ভাসান রচনা করেন।
চন্দ্রাবতী রামের সমালোচনার মাধ্যমে সীতার দৃষ্টিকোণ থেকে রামায়ণ রচনা শুরু করেন। 'মৈমনসিং গীতিকা'র সংগ্রাহক ডক্টর দীনেশ্চন্দ্র সেন চন্দ্রাবতীর লেখা রামায়ণ প্রকাশ করেন। এছাড়াও মৈমনসিং গীতিকার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক এই মহিলা কবির প্রেম, কাব্য এবং বিরহের উপাখ্যান।
কবি চন্দ্রাবতী মন্দির, পাতুয়াইর, কিশোরগঞ্জ। ছবি : অফরোড বাংলাদেশ
কবি চন্দ্রাবতীর এই মন্দিরের সাথে জড়িয়ে আছে এক বিরহগাঁথা। কবি চন্দ্রাবতীর প্রণয় ছিলো পার্শ্ববর্তী করিমগঞ্জ উপজেলার সুন্ধা গ্রামের জয়ানন্দের সাথে। জয়ানন্দ ছিলেন তার খেলার সাথী এবং শৈশবের বন্ধু। দুইজনের শিশুকালের বন্ধুত্ব একসময় প্রণয়ে রূপ নিলে দুই পরিবারের সম্মতিতে বিবাহের আয়োজনও সম্পন্ন হয়। কিন্তু এরই মধ্যে জয়ানন্দ স্থানীয় এক মুসলমান মেয়ের প্রেমে পড়েন এবং ধর্মান্তরিত হয়ে তাকে বিবাহ করেন। এই খবরে চন্দ্রাবতীর হৃদয় ভেঙ্গে যায় এবং তিনি আজীবন কুমারী থাকার ব্রত গ্রহণ করেন। চন্দ্রাবতী তার বাবার কাছে অনুরোধ করলে দ্বিজবংশী দাস ফুলেশ্বরী নদীতীরে দুটি মন্দির স্থাপন করে দেন। এই মন্দির দুটিতেই শিবের উপাসনায় নিয়োজিত থাকতে লাগলেন চন্দ্রাবতী। একসময় নিজের ভুল বুঝতে পেরে প্রেমিক জয়ানন্দ মন্দিরে ফিরে এলেও অভিমানী চন্দ্রাবতীর মন গলে না। ব্যর্থ মনোরথে জয়ানন্দ মন্দিরের দরজায় সন্ধ্যামালতী ফুল দিয়ে উপরোক্ত আকুতিমূলক কাব্য লিখে ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাপিয়ে পরে আত্নাহুতি দেন।
ধ্যান ভেঙ্গে চন্দ্রা মন্দির পবিত্র করার জন্যে নদীতে জল আনতে গিয়ে জয়ানন্দর মৃতদেহ দেখে সহ্য করতে না পেরে তিনিও ঝাপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হয়, আনুমানিক ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মৃত্যু হয় এই কিংবদন্তী মহিলা সাহিত্যিকের, আর এভাবেই শেষ হয় এক বিরহের উপাখ্যান। বর্তমানে সেই ফুলেশ্বরী নদীর অস্তিত্ত্ব না থাকলেও কবি চন্দ্রাবতীর স্মৃতিবিজড়িত মন্দির দুটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আপন মহিমায়। মূলত দুটি মন্দিরই শিব মন্দির। দুটি মন্দির একটি আরেকটির তুলনায় একটু ছোটবড় আছে। মূল যে মন্দিরটি সেটি অষ্টভূজ আকৃতির। উচ্চতায় প্রায় ৩২ ফুট, আট বাহুর প্রত্যেকটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ ফুট করে। দ্বিতল এই মন্দিরের নিচতলায় রয়েছে প্রবেশপথ এবং ৭ টি কুলুঙ্গি। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে একটি প্রশস্ত কুলুঙ্গি এবং সুদৃশ্য পোড়ামাটির কাজ। দ্বিতীয় তলা থেকেই মন্দিরটি ক্রমশ সরু হয়ে ৩২ ফুট উপরে গিয়ে শেষ হয়েছে।
১৯৯০ সালে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক এখানে কিছু সংস্কার কাজ করা হয়। মন্দির দুটি ছাড়াও এখানে রয়েছে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত দ্বিতল একটি আবাসস্থল, যেটি স্থানীয়দের মতে কবি চন্দ্রাবতীর পূর্বপুরুষ জমিদার নীলকণ্ঠ রায়ের বলে ধারণা করা হয়।
ছবি : কলকাতা টিভি
ছুটির দিনে এবং বিকালে বহু পর্যটকের আনাগোনা হয় এই চন্দ্রাবতীর মন্দির দেখতে। একটি বিকেল আপনিও কাটিয়ে আসতে পারেন এখানে। হয়তো নেই সেই খরস্রোতা ফুলেশ্বরী নদী, নেই চন্দ্রাবতী কিংবা জয়ানন্দ, কিন্তু এই মন্দিরের প্রতিটি ইট আর দরজার চৌকাঠ যেন বর্ণনা করে চলেছে শতবর্ষ পুরানো সেই করুণ বিরহের উপাখ্যান। এই অঞ্চলের বাতাসে যেন এখনও ভেসে বেড়ায় চন্দ্রাবতী রচিত দস্যু কেনারামের পালা, মলুয়া লোকপালা কিংবা রামায়ণের কাহিনী আর সেই সাথে বর্ণনা করে যায় যেন ভাটি অঞ্চলের মানুষের সুখ দুঃখ আর জীবন জীবিকার গল্প। কান পাতলেই যেন শোনা যাবে সেসব। শুনে আসতে পারেন সেই উপকথা আর এর সাথে সাথে কিশোরগঞ্জ থেকে দেখে আসতে পারেন ইটনা হাওড়, ইটনা শাহী মসজিদ, নিকলি হাওড়, জমিদার গুরুদয়াল চৌধুরীর বাসভবন ইত্যাদি।
কিভাবে যাবেন : কবি চন্দ্রাবতীর মন্দিরে যেতে হলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে যেতে হবে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে। ঢাকার গোলাপবাগ, সায়েদাবাদ এবং মহাখালী থেকে বিআরটিসি, অনন্যা, অনন্যা ক্লাসিক, জলসিড়ি, যাতায়াত ইত্যাদি পরিবহনের এসি/নন-এসি বাস কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মানভেদে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের ভাড়া ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। সময় লাগবে আড়াই থেকে ৩ ঘন্টা। কিশোরগঞ্জ নেমে ইজিবাইক অথবা রিকশা দিয়ে যেতে হবে শহীদি মসজিদের সামনে। ভাড়া ইজি বাইকে ১০ টাকা এবং রিকশায় ২৫-৩০ টাকা।
শহীদি মসজিদের সামনে থেকে নীলগঞ্জগামী অটোরিকশাতে উঠে আপনাকে নামতে হবে চেয়ারম্যান বাজারে। মূল রাস্তায়ই কবি চন্দ্রাবতীর বাড়ির সাইনবোর্ড চোখে পড়বে, ডান দিকের রাস্তা ধরে নরসুন্দা নদীর উপরে স্থাপিত ব্রিজ পার হয়ে মিনিট দশেক হাটলেই দেখা মিলবে কবি চন্দ্রাবতীর মন্দিরের। এছাড়া শহীদি মসজিদ থেকে সরাসরি অটো নিয়েও যাওয়া যাবে এই মন্দিরে। এছাড়া ট্রেনে যেতে কমলাপুর অথবা বিমানবন্দর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসে উঠে নামতে হবে কিশোরগঞ্জে। স্টেশন থেকে মাত্র ৫ টাকা অটোরিকশাভাড়া দিয়ে পৌঁছানো যায় শহরের শহীদি মসজিদ এলাকায়। এরপর উপরে উল্লেখিত উপায়ে যাওয়া যাবে কবি চন্দ্রাবতীর মন্দিরে।
তথ্যসূত্র : mailto:https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%9A%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A4%E0%A7%80_%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%B0 mailto:https://bn.wikivoyage.org/wiki/%E0%A6%9A%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A4%E0%A7%80_%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%B0 mailto:https://www.jagonews24.com/literature/news/20722