মজাদার বিরিয়ানির যাত্রাটা যেভাবে ও যেখানে শুরু হয়েছিল
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বিরিয়ানির জন্ম নিয়ে অনেক গল্প শোনা গেলেও এর উৎপত্তি এশিয়ার পশ্চিমাংশে
জৌলুসময় চেহারার এই বিরিয়ানির সাথে ভোজনপ্রিয় বাঙালির রয়েছে আত্মার সম্পর্ক। ছবি : বর্তমান প্রতিদিন
ফারসি বিরিয়ান শব্দ থেকে আগত বিরিয়ানি মুঘল সাম্রাজ্যের রেখে যাওয়া বৈচিত্র্যময় খাবারের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয়। ফারসি'তে বিরিয়ানি অর্থ রান্নার আগে ভেজে নেয়া যা আক্ষরিক অর্থেই বিরিয়ানি রান্নার আয়োজনের ক্ষেত্রে চাল ভেজে নেয়াকেই বোঝায়। বিরিয়ানির উৎপত্তি নিয়ে বেশ কিছু জনশ্রুতি শোনা যায়, ১৩৯৮সালের দিকে তুর্কি মঙ্গোল বিজয়ী তৈমুর বিন তারাগাই বারলাসের হাত ধরে নাকি বিরিয়ানি প্রথম উপমহাদেশে আসে। মাটির হাঁড়িতে চাল, মসলামাখা মাংস, ঘি সব একত্রে মাখিয়ে ঢাকনা দিয়ে গরম গর্তে সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রেখে দেয়া হত। এই প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হত সেনাবাহিনীর খাবারের জন্য এবং এখান থেকেই বিরিয়ানির পরিচিতি। আবার তামিল সাহিত্য থেকে পাওয়া 'ওন সরু' নামে এক ধরনের খাবারের সাথে আধুনিক বিরিয়ানির মিল বেশ লক্ষণীয়। 'ওন সরু' নামে এই খাবার এসেছে তৎকালীন ভারতবর্ষে ব্যবসার কাজে আসা আরবদের হাত ধরে যাতে উপকরণ হিসেবে থাকত ভাত, ঘি, হলুদ, ধনে, মরিচ, তেজপাতা, মাংস ইত্যাদি। এছাড়াও বলা হয়ে থাকে রাজসিক চেহারা এবং অনন্য স্বাদের এই বিরিয়ানির উৎপত্তির সাথে জড়িয়ে আছে সম্রাজ্ঞী মুমতাজ মহলের নাম।
জানা যায়, মিলিটারি ব্যারাক পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে সৈনিকদের রুগ্ন স্বাস্থ্য দেখে সম্রাজ্ঞী চাল ও মাংসের সংমিশ্রণে পুষ্টিকর খাবার তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন যা পরবর্তীতে বিরিয়ানি নামে পরিচিতি পায়। মুঘল বাবুর্চিদের হাতের ছোঁয়ায় এই বিরিয়ানি রাজরাজড়াদের টেবিলে পৌঁছাতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। পরে মুঘলরা যেখানেই গিয়েছেন বিরিয়ানি সাদরে গৃহীত হয়েছে সেখানকার স্থানীয়দের মধ্যে, এর সাথে যোগ হয়েছে অঞ্চলভেদে নিজস্ব প্রক্রিয়া। তাই তো ভারত কিংবা বাংলাদেশের পুরান ঢাকা প্রতিটি জায়গার বিরিয়ানির রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্র্যময়তা এবং সম্পূর্ণ আলাদা স্বাদ। আবার আদি বিরিয়ানির স্বাদ নিতে হলে যেতে হবে সেন্ট্রাল এশিয়ার উজবেকিস্তান বা তুর্কমেনিস্তানে। তুলনামুলক কম মশলার ব্যবহারের কারণে সেন্ট্রাল এশিয়ার এই বিরিয়ানি আমাদের কাছে কিছুটা পোলাও এর মত মনে হতে পারে। অন্যদিকে ঢাকায় প্রচলিত বিভিন্ন বিরিয়ানির আদিপুরুষ ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যে প্রচলিত বিরিয়ানি। উপমহাদেশের খাবারে বিভিন্ন মশলা এবং সুগন্ধীর ব্যবহার বেশি তাই আমাদের দেশীয় কিংবা ভারতীয় বিরিয়ানি বেশ জৌলুসময়। বিভিন্ন মসলায় মাখা মাংস, সুগন্ধি চাল, ঘি, জাফরান, গোলাপজল সবকিছুর মিশেলে তৈরি এই বিরিয়ানির রেসিপি আপাতদৃষ্টিতে এক হলেও এর স্বাদ স্থানভেদে বেশ আলাদা।
গরম গরম হায়দারবাদের চিকেন বিরিয়ানি। ছবি : বিডি জার্নাল
তবে উৎপত্তি যেখানে কিংবা যেভাবেই হোক না কেন উপমহাদেশে বিরিয়ানি রান্নার প্রক্রিয়া ছড়ানোর পেছনে মুঘলদের অবদানই বেশি। ভারতের সাথে বাংলাদেশী বিরিয়ানির পার্থক্যের ক্ষেত্রে মসলার ব্যবহার এবং চালের তফাত বেশ চোখে পড়ে। সুগন্ধীযুক্ত চিনিগুড়া চালের বিরিয়ানি বাংলাদেশে বেশি প্রচলিত হলেও ভারতে বাসমতি চালই বিরিয়ানির চাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আমাদের দেশি বিরিয়ানির ঐতিহ্য নিয়ে লিখতে গেলে চোখ বন্ধ করে সামনে চলে আসবে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা পুরান ঢাকার হাজীর বিরিয়ানি। এছাড়া ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানি, নারিন্দার ঝুনুর বিরিয়ানি জনপ্রিয় হয়েছে স্বমহিমায়। এর বাইরেও সুগন্ধি চালের তৈরি কাচ্চি বিরিয়ানি ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে সমাদৃত। এছাড়া অনেকটা একইভাবে চাল এবং মাংসের মিশ্রণে তৈরি হলেও সরিষার তেলের ব্যবহার আরেকটু ঝাঁঝালো স্বাদে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ঢাকা শহরে প্রচলিত তেহারীর সাথে। এর বাইরেও লক্ষ্ণৌ বিরিয়ানি, বোম্বে বিরিয়ানি, হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি ইত্যাদি পুরান ঢাকা এবং বাংলাদেশে বেশ প্রচলিত।
তথ্যসূত্র : ১। https://roar.media/bangla/main/food/history-of-biryani ২। https://www.daily-bangladesh.com/feature/172275 ৩। http://www.bdlive24.com