কী কী দেখার আছে বন্দরনগরীর পথে-প্রন্তরে?
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : সাগর-পাহাড়ে ঘেরা চট্টগ্রাম

দেশের ২য় বৃহত্তম নগরী কিংবা বাণিজ্যিক রাজধানী, ইউনেস্কোর দ্য হেলদি সিটি অথবা এক প্রাচীন পর্তুগিজ শহর, যে নামেই ডাকুন না কেন চট্টগ্রাম শহরের মূল পরিচয় হয়তো এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাছেই থেকে যাবে। বন্দরনগরীর শুধুমাত্র রাতের আলো ঝলমলে নৌ বন্দর কিংবা অভয়মিত্রের ঘাটই যে কাউকে মুগ্ধ করে দিতে সক্ষম। কিন্তু, চট্টগ্রাম বলতেই আমাদের ধারণা আটকে যায় তিন পার্বত্য জেলা রাঙামটি, বান্দরবন কিংবা খাগড়াছড়িকে ঘিরে। অথচ বার আউলিয়ার এই চট্টলা শহর সবসময়ই তৈরি নিজের রূপে পর্যটকদের মুগ্ধ করতে। বন্দরনগরীর পথে-প্রান্তরে ছড়ানো সেসব জায়গার কথা জেনে নিন এক নজরে।
কালুরঘাট ব্রিজ
চট্টগ্রামের দক্ষিণ দিকে বহদ্দারহাট থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই কালুরঘাট ব্রিজ। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈন্য পরিচালনা করার জন্য কর্ণফুলীর ওপর একটি ব্রিজ নির্মাণ আবশ্যক হয়ে পড়ে। ১৯৩০ সালে হাওড়ার ব্রুনিক এন্ড কোম্পানি ব্রিজ বিল্ডার্সের তত্ত্বাবধানে এই ব্রিজের কাজ শুরু হয়। শুরুতে কেবলমাত্র রেলব্রিজ হলেও ২য় বিশ্বযুদ্ধে এতে ডেক বসানোর কাজ করা হয়।বন্দরনগরীর পথে-প্রন্তরে

১৯৫৮ সালে একে সব ধরণের যান চলাচলের উপযোগী করতে আবারো সংস্কার করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালুরঘাট শাখার কাছে পৌছবার ক্ষেত্রেও এই ব্রিজ ছিল ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। চট্টগ্রাম এলে কালের সাক্ষী এই ব্রিজকে দেখতে ভুল করবেন না যেন।
বাটালি হিল
নগরীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা টাইগার পাস থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে শহরের উঁচু পাহাড়ের নাম বাটালি হিল। প্যাঁচানো রাস্তার কারণে জিলাপি পাহাড় নামকরণ করা হলেও স্থানীয় মানুষের কাছে বাটালি হিল নামটিই বেশ জনপ্রিয়। এর সর্বোচ্চ চূড়া শতায়ু অঙ্গন। ২৮০ ফুট উচ্চতার এই পাহাড়ের ওপর দাঁড়ালে বন্দরনগরীর প্রাণচাঞ্চল্য এবং বঙ্গোপসাগরের পুরো সৌন্দর্য আপনার চোখে ধরা দিবে।পর্তুগিজ আমল থেকে শুরু করে দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই বাটালি হিল নৌপথে, বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীতে চলমান নৌকা ও জাহাজের জন্য বাতিঘর হিসেবে কাজ করতো। এছাড়া এর ওপর কামান স্থাপনের কথাও শোনা যায়। ২০০৩ সালে গণপূর্ত বিভাগ এর দায়িত্ব নেবার পর এতে মন্ত্রণালয়ের অফিসসহ বাংলো স্থাপন করা হয়। চট্টগ্রাম শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে বাটালি হিলের চূড়ায় আপনাকে পা রাখতেই হবে।
পারকি সমুদ্র সৈকত
বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত বলতে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, কুয়াকাটা কিংবা পতেঙ্গার নাম এলেও পারকি স্মুদ্র সৈকতের নাম কোনভাবেই বাদ দেয়া চলে না। শহর থেকে খুব বেশি দূরে না হবার কারণে এবং দূষণ কম থাকায় ধীরে ধীরে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই সমুদ্র সৈকত। পারকি সমুদ্র সৈকতের দৈর্ঘ্য ১৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৩০০ থেকে ৩৫০ ফুটের কাছাকাছি। তবে স্থানীয়রা একে পারকির চর নামেই বেশি চিনে থাকেন। এখানে পর্যটকদের জন্য স্পিডবোট বা সী বাইকের ব্যবস্থা যেমন আছে তেমনই ঘুর্ণিঝড় সিডরে আটকা পড়া একটি বিশাল জাহাজও রয়েছে। চট্টগ্রাম ভ্রমণে এসে হাতে সুযোগ থাকলে যা আপনি কোনভাবেই মিস করতে চাইবেন না। কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলে অবস্থিত পারকি সমুদ্র সৈকতের উত্তরে রয়েছে কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনা, যা আপনার চোখ জুড়িয়ে দিতে বাধ্য।বন্দরনগরীর পথে-প্রন্তরে

চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত পারকি সমুদ্র সৈকতে যেতে হলে আপনাকে শহর থেকে আনোয়ারা বাস স্ট্যাণ্ডে যেতে হবে। সেখান থেকে সহজেই অটোরিকশা বা সিএনজি নিয়ে ঘুরে আসা যাবে এই সমুদ্র সৈকতে।
বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত
বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত হবার পরেও বাঁশখালী সমুদ্র সৈকতের নাম সেভাবে কখনোই পর্যটকদের কাছে পৌঁছেনি। প্রায় ৩৭ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই সৈকতটিও যেকোনো পর্যটকের চোখ জুড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। কম পরিচিত হবার কারণে যারা নির্জনে প্রকৃতি উপভোগ করতে চান তাদের জন্য বাশখালি সমুদ্র সৈকত একটি আদর্শ জায়গা। লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ, দলবেধে সাগরের পানিতে নিজেদের মত করে আনন্দে মেতে ওঠার সুযোগ কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা থেকে অনেক এশিই রয়েছে এই সমুদ্র সৈকতে।বন্দরনগরীর পথে-প্রন্তরে
চট্টগ্রাম শহরের নতুন ব্রিজ কিংবা বহদ্দারহাট থেকে বাসে উঠে গুণাগরি বাজার নামলেই লোকাল সিএনজিতে আপনি পৌছে যাবেন বাশখালী সমুদ্র সৈকতে। হাতে সময় থাকলে এই ফাঁকে ঘুরে আসতে পারেন বাঁশখালী ইকো পার্ক।
চুনতি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য
বলা হয় চট্টগ্রামের সৌন্দর্যের একটা বড় অংশ এই চুনতি অভয়ারণ্য। কিন্তু শহর থেকে একটু দূরে হবার কারণে এটিও সহজে পর্যটকের নজরে আসেনি। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কের অবস্থিত এই অভয়ারণ্য স্থাপিত হয় ১৯৮৬ সালে। সাতকানিয়া, চকরিয়া, বাঁশখালী এবং লোহাগড়া অঞ্চলের মোৎ ১৯ হাজার ১৭৭ একর জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় চুনতি বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য কেন্দ্র। হাতি, বানর, শুকর, হনুমান, মায়া হরিণ সহ এশিয়ান হাতি প্রজনন এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের এই বিশাল ভান্ডার এই অঞ্চলটি। ৪ প্রজাতির উভচর, ৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৩ প্রজাতির পাখি এবং ১০০র অধিক প্রজাতির উদ্ভিদে পূর্ণ এই জায়গাটি। নেচার কনভেনশন টাওয়ার, বনপুকুর ফুটট্রেইল সহ সব সৌন্দর্য উপভোগ করতে আপনি ৮ জন প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইডের সাহায্যও পাবেন এখানে এসে।বন্দরনগরীর পথে-প্রন্তরে

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে চট্টগ্রাম এসে কক্সবাজারগামী বাসে উঠে লোহাগড়া নামলেই স্থানীয় যানবাহনের সহায়তায় ১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আপনি যেতে পারেন চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৬৬ সালে স্থাপিত দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, বরং দর্শনীয় স্থান হিসেবেও পর্যটকদের কাছে বেশ পছন্দের। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট জায়গা প্রায় ১,৭৫৪ একর। ১০ অনুষদে ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী বর্তমানে এখানে পড়াশোনা করছেন। ঝুলন্ত সেতু, আবাসিক হল, ক্যাফেটেরিয়া, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ছাড়াও এখানে আছে একটি জাদুঘর। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝেই আপনি পাবেন পাহাড়ি ঝর্ণার দেখা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার জন্য আছে শাটল ট্রেন।
শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যাওয়ার পথও বেশ সুবিধার। তাই এই সুযোগ কোনভাবেই হাতছাড়া করা উচিত হবেনা আপনার জন্য। এছাড়া চট্টগ্রাম শহরের মাঝেই পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, লালদীঘি, ওয়ার সেমেট্রি কিংবা মিনি বাংলাদেশ খ্যাত স্বাধীনতা কমপ্লেক্সে গিয়েও বন্দরনগরীর রূপসুধা উপভোগ করতে পারেন। আর সেই সাথে উপদেশ থাকবে চট্টগ্রামের বিখ্যাত মেজবানী মাংসের স্বাদ গ্রহণের। চট্টগ্রামের বেশ কিছু নামী রেস্তোরায় আপনি এই খাবার পেতে পারেন
জুবায়ের আহাম্মেদ এস এম
আরো পড়ুনঃ ইএমকে সেন্টার ও ট্রাভেল বাংলাদেশের আয়োজনে ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা 'বাংলাদেশ থ্রু দি লেন্স ২০২০'

