প্রচলিত আঞ্চলিক বাঙালি খাবার চ্যাপা শুটকি ভুনা

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : যারা শুটকি পছন্দ করেন তাদের অন্যতম প্রিয়

শুটকি প্রেমিকদের পছন্দের খাবার চ্যাপা শুটকি ভুনা। ছবি : জাগো নিউজ ২৪

 আবহমান গ্রামবাংলার রসনা বিলাসে শুটকি এক অনন্য নাম। বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগে সু-নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে এই চ্যাপা শুটকি হিদল নামে পরিচিত। দেশের কুমিল্লা অঞ্চলে এটি আবার সিধল বা সিদঈল নামেও ডাকা হয়। তবে ধারণা করা হয় যে, দেশের সমুদ্র তীরবর্তী স্থানের মানুষেরা, আদিবাসিরা, যারা সাধারনত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বসবাস করেন তারা নিত্যদিনের জীবিকা নির্বাহের জন্যে এই শুটকি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেন। চ্যাপা শুটকি আমাদের দেশের খাদ্য সংস্কৃতির সাথে একান্ত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। সিলেটের বিস্তর অঞ্চলজুড়ে সিদল বা চ্যাপা তৈরী প্রক্রিয়াটা বেশ চমকপ্রদ বটে। এই অঞ্চলের শুটকি তৈরির প্রক্রিয়ার শুরুতে পুঁটি, মলা-ঢেলা, নানা প্রজাতির ছোট মাছগুলোকে আকার অনুসারে আলাদা করে নেয়। তারপর সেই মাছগুলোর মধ্যে কাটা,পচা সকল মাছ কে আগে থেকেই বাদ দিতে হয়। বাছাইকৃত ভালো মানের মাছগুলো নিয়ে ভালো করে পরিস্কার করে ধুয়ে নিতে হয়। তারপর সেসকল মাছগুলোকে ৭/১০ দিন রোদে শুকিয়ে নিতে হয়।

চ্যাপা শুটকি তৈরির জন্যে বিশেষ রকমের মাটির বড় হাঁড়ি, কলসি, মটকা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সেই মটকা বা কলসির ভেতর বাইরের মাছের তেল মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। তারপর শুকানো মাছগুলো পরিমাণমত বড় ঝুড়ি, ছালুনে নিয়ে একবার ধুয়ে সারা রাত পানি ঝরানোর জন্য রেখে দিতে হয়। পরদিন সকালে সে পানি ঝরানো মাছগুলো আগের থেকে তৈরি বিশেষ মাটির পাত্রে ভালো করে বিছিয়ে ভরে নিতে হয়। দক্ষ শ্রমিকেরা ভালোকরে ঠেসে ঠেসে প্রতিটি পাত্র ভরে নেয়, যাতে ভেতরে কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকে। ধারানা করা হয় যে, এই চেপে চেপে  নানা প্রজাতির মাছগুলো মাটির পাত্রে ভরা প্রক্রিয়া থেকেই 'চ্যাপা' শব্দটি এসেছে।

চ্যাপা শুটকি। ছবি : আমাদের নিকলী

মাছ ভরার পর মাটির মটকার বা কলসির মুখ কলাপাতা, তেঁতুলপাতা,লাউপাতা, সিম গাছের পাতা দিয়ে ভালো করে বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর সুন্দর করে এটেল মাটি দিয়ে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়াটি করার একমাত্র কারন হল বাতাস যেন কোনোভাবেই ভেতরে ঢুকতে না পারে। এইভাবে তাদের মতে, প্রতিটি কলসীকে মাটির নিচে পুঁতে রাখতে হয় ২ মাস থেকে ৪ মাস। চ্যাপা শুটকি বা সিদল তৈরির ক্ষেত্রে এই বায়ু নিরোধক প্রক্রিয়া কি অত্যাবশ্যকীয় বলেই বিবেচিত হয় কেননা মটকার ভেতরে বাতাস ঢুকলে তাতে আধা-গাজনের পরিবর্তে মাছ পঁচে যেতো। চ্যাপা শুঁটকি তৈরির এই প্রক্রিয়ার সাথে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় খাবার সিদল তৈরির প্রক্রিয়াগত পার্থক্য আছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত আমাদের পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে অর্ধ-গাজন মাছের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে লবণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সাহিত্য জগতে একটু লক্ষ্য করলেও দেখা যাবে যে, কবি রামচন্দ্র চৌধুরী তাঁর মনসামঙ্গল কাব্যে চাঁদ সওদাগরের বিদেশে বাণিজ্যেকালে 'সিদল' (শুকনো মাছ) সঙ্গে নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তখন সিংহলের রাজার কাছে চাঁদ সওদাগর 'আশ্চর্য বস্তু' তথা 'সিদলপুড়া' তৈরির প্রণালীও বর্ণনা করেছেন—

'অগ্নিমধ্যে সিদলকে কিঞ্চিত জ্বালাইয়া

কাঁচামরিচ আদা লবণ মিশাইয়া

মিশ্রিত করিয়া যদি করহ ভক্ষণ

তবে সিদলের মর্ম জানিবা আপন।'

চ্যাপা শুটকি ভুনা রন্ধন :

উপকরণ : ৬টি বড় আকারে চ্যাপা শুটকি, ২টি মাঝারি সাইজের রসুন কুচি, ১০টি মাঝারি আকারের পিয়াজ কুচি, ৭/৮টি আস্ত কাচামরিচ, তেল পরিমানমত, আধা চা-চামচ হলুদ, ১ চা- চামচ শুকনো মরিচের গুড়ো, লবন স্বাদমতো।

রন্ধনপ্রণালী :

চ্যাপা শুটকি ভুনা। ছবি : সান নিউজ বাংলাদেশ

হালকা গরম পানিতে চ্যাপাগুলো ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এবার একটি কড়াইয়ে তেল গরম করে তাতে মাছগুলো ছেড়ে দিতে হবে। এরপর একে একে পিয়াজ কুচি, রসুন কুচি,লবন, শুকনো মরিচের গুড়ো, হলুদের গুড়ো দিয়ে দিতে হবে। ভাল করে নাড়াচাড়া করে ভেজে নিতে হবে। তারপর মিশ্রনটি ভাজা হয়ে এলে সামান্য পরিমানে পানি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ৩/৪ মিনিট পর আস্ত কাচা মরিচ দিয়ে নাড়াচাড়া করে ঢেকে দিতে হবে। পানি শুকিয়ে এলে নামিয়ে গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করুন চ্যাপা শুটকি ভুনা।  



  তথ্যসূত্র  : G. Poulter, 'Processing and storage of traditional dried and smoked fish products', Journal of Ethnic Foods, Volume 3, Issue 4, December 2016. মুকুন্দ দাস, চন্ডীমঙ্গল https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%BE_%E0%A6%B6%E0%A7%81%E0%A6%9F%E0%A6%95%E0%A6%BF