রসনামৃত : সিরাজগঞ্জের রসে টইটম্বুর পানতোয়া মিষ্টি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : পানতোয়া মিষ্টির আরেকনাম পানি তোয়া



পানতোয়া মিষ্টি

সিরাজগঞ্জে বিভিন্ন উৎসব আয়োজনে পানতোয়া মিষ্টি থাকেই; ছবি : সংগৃহীত


 সিরাজগঞ্জে কেও এসেছেন কিন্তু সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত পানতোয়া মিষ্টির খোঁজ করেননি, এমন কী কখনও হয়েছে? অবশ্যই না, কেননা সিরাজগঞ্জের এই বিখ্যাত খাবারটির স্বাদ এবং পরিচিতি দেশ ব্যাপী। তবুও আজকে আপনাদের সামনে নিয়ে হাজির হচ্ছি আমার এলাকা সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত এবং রসে টইটম্বুর মিষ্টি পানতোয়া। মিষ্টি খাওয়ার সকল অতীত অভিজ্ঞতাকে হার মানাবে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পানতোয়া মিষ্টি। সারা বাংলাদেশের মধ্যে স্বাদে এবং গুণে অদ্বিতীয় এই মিষ্টি মূলত সিরাজগঞ্জেই পাওয়া যায়।

সিরাজগঞ্জের বাহিরে কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও তা স্বাদে এলাকার সেই স্বাদটি অনেক ক্ষেত্রেই ধরে রাখতে পারে না। এজন্যই এটি সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত খাবার। স্থানীয়দের কাছে পানতোয়া বা পানি তোয়া নামে অধিক পরিচিত এই মিষ্টি। স্বাদের ক্ষেত্রে অতুলনীয় এই মিষ্টি পাওয়া যায় সিরাজগঞ্জের প্রায় সব মিষ্টির দোকানেই। স্থান ভেদে কেজি প্রতি ৩০০-৩৫০ টাকা দরেই পেয়ে যাবেন এই ঐতিহ্যবাহী বিখ্যাত মিষ্টিটি। খুব বেশি কোয়ালিটি সম্পন্ন পেতে খোঁজ করতে পারেন ঘোষ দইঘর বা মুসলিমে।

যেহেতু এটি সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত তাই এলাকার বিয়েতে বা অতিথি আপ্যায়নেও সিরাজগঞ্জের মানুষ এই মিষ্টি খাবার আইটেমে রেখে থাকে। পাশাপাশি তেমনই এলাকার বাইরে বা ভেতরে কোনও বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেলে বা ঘুরতে গেলেও সৌজন্যতা সূচক হাতে মিষ্টির প্যাকেটে পানতোয়া মিষ্টি দেখা গেলে তা অবাক করার মতো কিছু নয়। চলুন এবার এর ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

পানতোয়া মিষ্টির ইতিহাস

দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গ থেকে এপারে কাটোয়ায় এসে বসবাস শুরু করেন সুরেন্দ্রলাল কুণ্ডু। তিনি তার ছেলে প্রাণকৃষ্ণকে (ডাকনাম পরান) নিয়ে ছোট একটি দোকানে কলাইয়ের ডালের অমৃতি এবং মুরুলি ভাজা বিক্রি করে সংসার চালাতে শুরু করেন। সেই দোকানেই প্রাণকৃষ্ণবাবু তৈরি করেন ক্ষীরের পুর দেয়া পানতোয়া। লোকমুখে নাম হয় পরানের পানতোয়া এবং সেই পানতোয়াই আজকের সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত পানতোয়া হিসেবে তার স্বাদে মুগ্ধ করছে শিশু, যুবক-বৃদ্ধকে, এমনকি তা মুগ্ধ করবে আপনাকেও।


সিরাজগঞ্জের পানতোয়া মিষ্টি

একসময় লোকমুখে এই মিষ্টির নাম হয় পরানের পানতোয়া; ছবি : সংগৃহীত


সেই যুগ থেকেই পানতোয়ার নামডাক রয়েছে। সিরাজগঞ্জের কবি রজনীকান্ত সেন ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত কল্যাণী কাব্যগ্রন্থের ঔদারিক গানে বাংলার বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্নের উল্লেখ করেছেন। সেখানে পানতোয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় :

'যদি, কুমড়োর মত, চালে ধরে রত, পানতোয়া শত শত আর সরষের মত, হত মিহিদানা বুঁদিয়া বুটের মতো!'

পানতোয়ার প্রশংসা করে কাটয়ার মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী তপন বাবু ও সমরেশ বাবু বলেন, 'এই মিষ্টি খেয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে গায়িকা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিনেতা শক্তি ঠাকুর, রবি ঘোষেরাও প্রশংসা করে গিয়েছেন'। অর্থাৎ সেই যুগ থেকে এই যুগ পাল্টালেও পানতোয়ার খ্যাতি কমেনি একেবারেই। এবার জানিয়ে দিচ্ছি কিভাবে এই মিষ্টি তৈরি করা হয়।

উপকরণ

চিনি, মাওয়া গুঁড়া, এলাচ গুঁড়া, পানি, ঘি, ছানা, তেল।

রেসিপি

প্রথমে চিনি, মাওয়া ও এলাচ গুঁড়া একত্রে মিশিয়ে পরিমানমতো পানিতে চিনির সিরা করে নেয় ময়রারা। এরপর মাওয়া গুঁড়া করে ময়দায় ঘিয়ের ময়ান দেয়া হয়, তাতে মিশানো হয় চিনি। ছানা হাতের তালু দিয়ে মসৃণ করে মাওয়ার মিশ্রণ মিশিয়ে মাখানো হয়। ছানা ভাগ করা হয় এবং একভাগ ছানার ভেতর কয়েকদানা মাওয়া-চিনির মিশানো পুর দিয়ে ৩ সেন্টিমিটার লম্বা পানতোয়া তৈরি করে কড়ায়ে ভাজা হয় লাল রং আসা অবধি। ভাজা শেষে পানতোয়া ছাড়া হয় সেই গরম সিরায়। পরে ৬-৮ মিনিট জবাল দেয়া হয়।

চুলা থেকে নামিয়ে ৭-৮ ঘন্টা সিরায় রাখার পর তোলা হয় দোকানে বিক্রির জন্য। সিরায় বা রসে ডুবে থাকা এই পানতোয়া দেখতেও যেমন সুন্দর খেতে তেমনই অতুলনীয়। সত্যি কথা বলতে এর স্বাদ কখনোই শব্দ দ্বারা প্রকাশ করার মতো নয়, এটি অনুভব করার বিষয়। কি? এবার জিবে জল এলো, তাই না? তাই চলে আসুন সিরাজগঞ্জ, আর নিজেও স্বাদ গ্রহণ করুন এই ঐতিহ্যবাহী, অতুলনীয় স্বাদের মিষ্টিটির।

সুমাইয়া জান্নাত   এস এম