ক্ষীরাই : রঙিন ফুলের সুশোভিত মায়া উপত্যকা

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : পশ্চিমবঙ্গের ভূ-স্বর্গ ও ফুলের রাজ্য ক্ষীরাই



View of Flower Garden Named Khirai (ক্ষীরাই) ar East Medinipur in India

ভারতের পূর্ব মেদিনীপুরে কাঁসাই ও ক্ষীরাই নদীর দু-পাশজুড়ে এই ফুলের রাজ্যের দেখা মেলে। ছবি : সংগৃহীত


ফুল ভালোবাসেন না এমন মানুষ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। রঙ-বেরঙের ফুলের শোভা নিমিষেই মানব মনকে করে তোলে প্রফুল্ল। অত্যন্ত কঠিন মনকেও ফুলের সৌন্দর্য গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে। সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি ফুলের আবেদন তাই চিরন্তন। বিশাল অঞ্চল জুড়ে যদি ফুল আর ফুল চোখে পড়ে তবে তো মন ভালো না হয়ে আর উপায় নেই। এমনই এক ফুলের বাগানের সাথে আজ পরিচয় করিয়ে দেব যেখানে গেলে আপনার মন ছুঁয়ে যাবে ভালো লাগার পরশে আর নিবিড় সখ্যতায় আপনি হারিয়ে যাবেন অপার সৌন্দর্যের জগতে। এই ফুলের রাজ্যের নাম ক্ষীরাই (khirai)।

অবস্থান

ভারতের পূর্ব মেদিনীপুরে ক্ষীরাই ফুলের উপত্যকাটি অবস্থিত। ফুলের এই স্বর্গরাজ্য ছোট একটি স্টেশনের পাশে। ক্ষীরাই আসলে একটি নদীর নাম আর এই নদীর নামেই গ্রামটির নামকরণ করা হয়েছে। কাঁসাই ও ক্ষীরাই নদীর ডান ও বাম দিকে মাইলের পর মাইলজুড়ে এই বাগানটি বিস্তৃত। পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ার পরের স্টেশনই ক্ষীরাই। এই স্টেশনে নেমে রেললাইন ধরে পাঁশকুড়ার দিকে এগিয়ে যান এক কিলোমিটার।

লাল, নীল, সাদা, হলুদ ফুলের রঙ-বেরঙের চাদর

চলার পথে চোখে পড়বে লাল, নীল, সাদা, হলুদ ফুলের রঙ-বেরঙের চাদর। প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের চাদর বিছিয়ে রেখেছে এখানে। রেললাইনের দু’পাশে এমন নজরকাড়া দৃশ্য উপভোগ করতে করতে কখন যে এক কিলোমিটার পথ হেঁটে ফেলবেন তা বুঝতেই পারবেন না।

আরও পড়ুন : দেশের সবচেয়ে বড় ফুলের রাজ্য যশোরের গদখালি


Valley of flower, khirai (ক্ষীরাই)

ক্ষীরাই রেল ষ্টেশনে আসা যাওয়া করা ট্রেন থেকেই এমন মন মাতানো ফুলের উপত্যকা চোখে পড়বে। ছবি : সংগৃহীত


রঙধনুর রঙের মতো বিভিন্ন বর্ণের অনিন্দ্যসুন্দর ফুলের শোভায় ঘেরা বিঘার পর বিঘা জমি। এ যেন একটুকরো ফুলের স্বর্গরাজ্য। যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই রঙিন ফুলের সমাহার।

চিরায়ত বাংলার মনোরম দৃশ্য

ফুলের এই উপত্যকায় কোথাও বিভিন্ন রঙের এষ্টার, কোথাও হলুদ গাঁদা, কমলা গাঁদা আবার কোথাও বা চেরি, সরিষা, মোরগঝুঁটি, চন্দ্রমল্লিকা, মুলো ফুলের মতো নানা রকম শীতকালীন বিভিন্ন ফুলসহ নাম না জানা অনেক ফুল চোখে পড়বে। এখানে গোলাপও দেখতে পাবেন। এতো এতো গোলাপের জগতে হারিয়ে যেতে মন চাইবে। বাগানের পাশ দিয়েই আপন মনে বয়ে চলেছে ক্ষীরাই নদী। মাঠের পরে মাঠ ফুল শোভিত এই গালিচার সৌন্দর্যে বিমোহিত না হয়ে পারবেন না। রঙিন ফুলেরা তো নজর কাড়েই, তাছাড়াও এখানে আছে নানা পাখি, প্রজাপতি, ফড়িং আর পোকামাকড়। ফুলের লোভে ভিড় করে মধুকরের দল। মৌমাছির গুনগুনানি আর রঙ ছড়ানো প্রজাপতির উড়া উড়িতে এই ফুলের স্বর্গ যেনও সৌন্দর্যের আসর নিয়ে হাজির হয়। ফুলগুলোর সৌরভে মন হয়ে উঠে প্রফুল্ল। প্রকৃতি তার সব রূপ-রস-সুবাস ঢেলে সাজিয়েছে এই উপত্যকাতে। এখানে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে চোখে পড়ে চিরায়ত বাংলার মনোরম দৃশ্য। এখানে দেখতে পাবেন চাষিরা ফুল গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত।কেউ কেউ তুলছেন ফুল, কেউবা ছাঁটছেন পাতা। আবার তাদের কাজে সাহায্য করছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্য-সদস্যারা।

আরও পড়ুন : সাবদি : যে গ্রামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে ফুলের গাছ


Valley of flower, khirai

এষ্টার, হলুদ গাঁদা, কমলা গাঁদা, চেরি, সরিষা, মোরগঝুঁটি, চন্দ্রমল্লিকা সহ নানান জাতের রঙ বেরঙের ফুল চোখে পড়বে এখানে। ছবি : সংগৃহীত


 দিগন্তজোড়া এই ফুলের বাগানের ঠিক কাছেই দেখতে পাবেন ট্রেন পেরোনোর জন্য ছোট একটি সেতু। একপাশে ছুটে চলা ট্রেন আর আরেকপাশে বিস্তৃত রঙিন ফুলের গালিচা এই ক্ষীরাইকে করেছে এক স্বপ্নের জগত। ট্রেনের ঝিক ঝিক শব্দের সাথে বাগানের ফুলগুলো যেন হাওয়ার ছন্দে তাল মিলিয়ে নেচে ওঠে। এই মন ভোলানো সৌন্দর্য দেখতে দেখতে কিভাবে যে সময় কেটে যাবে তা টেরই পাবেন না। এই এলাকায় কাঁচা রাস্তার দুপাশে গ্রামীণ বসতবাড়ি। এছাড়া জিনিসপত্রের দোকানও খুবই কম। তাই বেড়াতে আসলে খাবারদাবার সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। আর পিকনিক করতে আসলে প্লেট, প্লাস্টিক ইত্যাদি ফেলে আসবেন না। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির পর্যন্ত এই বাগান নানা রঙের ফুলের শোভায় পরিপূর্ণ থাকে। তাই এসময়ের ভেতরে এখানে আসবেন।

যেভাবে যাবেন :

হাওড়া থেকে খড়গপুর বা মেদিনীপুর গামী ট্রেন ধরে পাঁশকুড়ার পরের স্টেশন ক্ষীরাইতে নেমে পড়বেন। সময় লাগবে প্রায় দু' ঘণ্টার মতো।ক্ষীরাই স্টেশনে নেমে তিন নম্বর লাইন ধরে পাঁশকুড়ার দিকে প্রায় ২০ মিনিটের মতো হেঁটে সরু মাটির রাস্তা বরাবর কিছুক্ষণ যাওয়ার পরই কাঁসাই নদী দেখতে পাবেন। এই নদীর দু-পাশেই এই বাগান।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম