ছৌ নাচ : পুরুলিয়ার বৈচিত্র্যময় যুদ্ধ নৃত্য

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধ নৃত্য ছৌ

Chaou ছৌ নাচ

অভিনব পোশাক ও মুখশের আড়ালে শিল্পিরা শারীরিক কসরতের ছৌ নৃত্য পরিবেশন করা হয় ; ছবি : উইকিপিডিয়া

ছৌ নাচ মূলত বীররসের নাচ। ভারতীয় একপ্রকার যুদ্ধ নৃত্য হলো ছৌ নাচ। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া হলো ছৌ নাচের জন্মস্থান। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ছৌ নাচের জন্য বিখ্যাত হলেও বর্তমানে ছৌ নাচের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। ছৌ নাচের বিশেষত্ব হলো এর অভিনব পোশাক। এই সাজের প্রধান উপকরণ হলো মুখোশ৷ বিভিন্ন মুখোশ পরে শিল্পীরা মঞ্চে হাজির হন৷ ছৌ নাচ তো বটেই, তবে মুখোশের জন্য বিখ্যাত হলো চড়িদা গ্রাম।

ছৌ নাচের পোশাক ও মুখোশ তৈরি করা হয় বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী ও চরিত্রের ওপর নির্ভর করে। ছৌ নাচের মাধ্যমে উঠে আসে, মহিষাসুরমর্দিনী, রামায়ণ, মহাভারত এমনকি শিব-পার্বতীর গল্প- কাহিনী। পুরুলিয়া ছাড়াও ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশায় ছৌ নাচ দেখা যায়। তবে ছৌ নাচ ও এর বিশেষ মুখোশের জন্য বিশিষ্টতা অর্জন করেছে পুরুলিয়া। অযোধ্যার একটি শান্ত গ্রাম চড়িদা। গ্রামে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়বে রাস্তার দুই পাশে সারি সারি অসংখ্য রঙ-বেরঙের মুখোশের দোকান।
Chaou ছৌ নাচ

ছৌ নৃত্য বা নাচ এখানকার সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য একটি অংশ; ছবি : সংগৃহীত

কেউ হয়তো মুখোশ তৈরি করছেন, কেউ হয়তো মুখোশে রং দিচ্ছেন আবার কেউবা হয়ত রোদের তাপে সেসব মুখোশ শুকিয়ে নিচ্ছেন। চটিদা গ্রামে তৈরি হওয়া এসব মুখোশ যে শুধুমাত্র ছৌ নাচের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে তা নয়, গৃহসজ্জাতেও জায়গা করে নিয়েছে ছৌ নাচের এসব রঙিন মুখোশগুলো। একশ পরিবারের প্রায় চার শতাধিক শিল্পী এসব ছৌ নাচের মুখোশ তৈরির কাজের সাথে যুক্ত। গ্রামের মূল জীবিকাই হলো ছৌ নাচের মুখোশ তৈরি করা।

শুরুর দিকে শুধুমাত্র ছৌ নাচের শিল্পীদের জন্যেই মুখোশ তৈরি করতেন তারা, ছৌ নাচের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে চাহিদা বেড়ে যায় মুখোশেরও। ফলে চড়িদার অনেক দোকানে এখন ঘর সাজানোর জন্যেও মুখোশ কিনতে পাওয়া যায়। ছৌ শিল্পীরা সারা চৈত্র মাস ধরে অনুশীলন করে থাকেন। বৈশাখ মাসজুড়ে ও জ্যৈষ্ঠ মাসের তেরো তারিখে অনুষ্ঠিত রহিন উৎসব পর্যন্ত ছৌ নাচ নাচা হয়ে থাকে। পুরুলিয়া জেলায় শিবের গাজন উপলক্ষে ছৌ নাচের আসর বসে।
Chaou ছৌ নাচ

বিভিন্ন উৎসবে ছৌ নৃত্য থাকে অন্যতম আকর্ষণ; ছবি : উইকিপিডিয়া
ছৌ নাচের বিশেষত্ব হলো শারীরিক কসরত। মাটিতে শারীরিক কসরতের মাধ্যমে নৃত্য পরিবেশন করা হয় বলে দ্রুতই নষ্ট হয়ে যায় মুখোশগুলো৷ মুখোশের দাম চার-ছয় হাজারের মধ্যে থাকে। একটা সময় মাওবাদীদের উপদ্রবের কারণে ছৌ নাচের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ফলে অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখে পড়ে যায় ছৌ নাচের মুখোশ তৈরির শিল্পীরা। এখন এই পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। চাহিদা বেড়েছে ছৌ নাচ ও এর নৃত্যকলার প্রতি।

পর্যটকেরাও আকৃষ্ট হচ্ছে পুরুলিয়ার ছৌ নাচ দেখতে। শীতের মৌসুমে মূলত ছৌ নাচ দেখতে পর্যটকদের ভিড় জমে বেশি। ২০১৪ সাল থেকে চড়িদায় ছৌ নাচের পোশাক ও মুখোশের মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো শিল্প ও শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখা। শুধু শিল্পের প্রচার হলেই শিল্পী বাঁচে না৷ গ্রাম, শিল্পী ও শিল্প এই তিনটের একটি ইউনিট হিসেবে প্রচার ও প্রসার করাই এই মেলার উদ্দেশ্য। 

তথ্যসূত্র: https://www.bongodorshon.com/ https://m.dw.com/bn/