আদি গঙ্গার তীরে বিখ্যাত তীর্থস্থান কোলকাতার কালীঘাট মন্দির
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : একান্ন শক্তিপীঠে হিন্দুদের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র বলা হয়ে এই মন্দিরকে
কোলকাতার একটি প্রসিদ্ধ কালীঘাট মন্দির । ছবি : সংগৃহীত
কোলকাতা তো বটেই, সনাতন ধর্মের মানুষ মাত্রই কালীঘাট মন্দিরকে এক নামে চেনে। নাম শুনেই বোঝা যায় যে, এখানে কালী পূজা করা হয়। অনেকে আবার মনে করে যে 'কালীঘাট' নাম থেকেই 'কোলকাতা’ নামটি এসেছে। আদি গঙ্গার তীরে অবস্থিত হওয়ায় সনাতন ধর্মের মানুষ এই মন্দিরকে পূণ্যস্থান বলে মনে করে। হিন্দু ধর্মে 'একান্ন শক্তি পীঠের' ধারণা রয়েছে। শক্তি বলতে কোনো দেবীকে বোঝানো হয়, যাকে পূজা করা হয়। আর এই প্রত্যেক 'শক্তির' সাথে থাকে একজন ভৈরব অর্থাৎ ঐ দেবীর স্বামী। কালীঘাট মন্দিরের দেবীর নাম দক্ষিণাকালী এবং তার স্বামী তথা ভৈরবের নাম নকুলেশ্বর। কোলকাতার কালীঘাটে নব্বই ফুট উঁচু এই মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরটি বাংলার মন্দির স্থাপত্যের আটচালা রীতিতে তৈরি করা হয়েছে। আজ থেকে প্রায় ২১১ বছর আগে ১৮০৯ সালে বর্তমানের মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছিল। মন্দিরের নির্মাতা ছিলেন জমিদার শিবদাস চৌধুরী, তাঁর ছেলে ও ভাইয়ের ছেলে। সময়ের সাথে সাথে মন্দিরের গায়ের পোড়ামাটির নকশা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পরে সংস্কার করায় মন্দির তার রুপ ফিরে পায়।
২০০ বছরে অধিক পুরনো মন্দির। ছবি : খবর অনলাইন
তবে অনেকের মতে, মন্দিরটির বয়স আরও বেশি। ১৫ শতকের মনসা গান এমনকি ১৭ শতকের 'কবিকঙ্কণ চণ্ডী' কালীঘাট মন্দিরের নাম ধারণ করে আছে। আগের কুঁড়েঘরের জায়গায় প্রথম পাকা ঘর বানিয়েছিলেন রাজা মানসিংহ। তাও সেটা ১৬ শতকের কথা। মাত্র আট কাঠা জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মন্দিরের আশেপাশে আরও ১ বিঘার কিছুটা বেশি জমি রয়েছে। আট বছর ধরে বানানো মন্দিরে খরচ হয়েছিল ত্রিশ হাজার টাকা। মন্দিরের ভেতরে একটি কালী মূর্তি রয়েছে। মূর্তিটির বর্তমান রূপের কারিগর ছিলেন ব্রহ্মানন্দ গিরি এবং আত্মারাম ব্রহ্মাচারী। মূর্তিটি কষ্টি পাথর দিয়ে বানানো। কালী মূর্তির জিভ, দাঁত, মুকুট, হাত ও মুখ সোনা দিয়ে তৈরি। এছাড়া পাথর হয়ে যাওয়া সতীর চারটি আঙ্গুলও সংরক্ষিত আছে এমনটা জানা যায়। তবে কারও সামনে তা দেখানো হয় না। হিন্দু বিশ্বাসমতে, সত্যযুগে দক্ষ প্রজাপতি নিজের বাড়িতে এক যজ্ঞ পালন করেছিলেন। এতে অনেক সাধু মুনিকে আমন্ত্রণ করলেও নিজের মেয়ে ও জামাইকে আমন্ত্রণ করেননি। বিনা আমন্ত্রণে স্বামীসহ তার মেয়ে সতী যজ্ঞে এলে দক্ষ তার জামাতাকে অপমান করেন। স্বামীর অপমানে সতী আত্মহত্যা করেন। এদিকে স্ত্রীর মৃত্যুতে রেগে গিয়ে সতীর স্বামী শিব তাণ্ডব নৃত্য শুরু করেন। এমন অবস্থায় তাকে সামলানোর জন্য বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্রের মাধ্যমে সতীর মৃতদেহকে খণ্ডিত করে ফেলেন। ফলে, সতীর দেহের বিভিন্ন অংশ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
ছবি : সংগৃহীত
হিন্দু পুরাণমতে, সতীর দেহের এসব অঙ্গ পৃথিবীতে পড়ার সাথে সাথে পাথরে পরিণত হয়ে গেছে। হিন্দুদের পীঠমালা অনুযায়ী, কালীঘাটে সতীর যে অঙ্গ পড়েছিল তা হল ডান পায়ের চারটি আঙুল। কালীঘাটের মূল মন্দিরের পাশে আরও বেশ কয়েকটি মন্দির রয়েছে। এছাড়া রয়েছে শ্মশানঘাট। মন্দিরের সাথে একটি বড় পুকুরও আছে যার নাম 'কুণ্ডু পুকুর'। অনেকের বিশ্বাস, এই পুকুর থেকেই সতীর খণ্ড অঙ্গ উদ্ধার করা হয়েছিল। সনাতন ধর্মের মানুষ মনে করেন যে এই মন্দিরটি একটি জাগ্রত মন্দির। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গা থেকে সনাতন ধর্মের মানুষ এখানে পূজো দিতে আসেন। বিভিন্ন উৎসব যেমন : পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজা ও কালী পূজার দিন ভক্তদের আনাগোনা থাকে আরও বেশি।
কিভাবে যাবেন : মন্দিরে আসতে হলে আপনাকে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে কোলকাতায় যেতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ভিসাসহ পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশ থেকে বাস, ট্রেন এবং বিমানে চড়ে যেতে পারবেন প্রমোদ নগরী কোলকাতায়। বাসে চড়ে কোলকাতায় আসতে হলে শ্যামলী এনআর পরিবহন, গ্রিন লাইন, সোহাগ পরিবহণ, সৌহার্দ্য পরিবহন ইত্যাদি বাসে সরাসরি ঢাকা-কোলকাতা যেতে পারবেন। নন-এসি বাসে ভাড়া ৮০০-১,০০০ টাকা এবং এসি বাসে ১,৫০০-২,০০০ টাকা। এছাড়া ঢাকা থেকে বাসে করে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাসে কোলকাতায় যেতে পারবেন। ট্রেনে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সুবিধাজনক উপায় হল মৈত্রী এক্সপ্রেস। সপ্তাহে চারদিন ( শুক্র, শনি, রবি, বুধ) মৈত্রী এক্সপ্রেসের ট্রেন ঢাকা-কোলকাতা যায়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সকাল আটটা দশ মিনিটে ট্রেন ছাড়ে। তবে কোলকাতা খুব সহজে এবং কম সহজে যেতে চাইলে বিমানে যেতে পারেন। বাংলাদেশ বিমান, রিজেন্ট এয়ারলাইনস, নভো এয়ার, এয়ার ইন্ডিয়া, জেট এয়ারওয়েজের বিমানে আসতে পারবেন কোলকাতা শহরে। এরপর কলকাতা শহর থেকে মেট্রো রেলে চড়ে কালীঘাট স্টেশনে নামতে হবে। এখান থেকে হাঁটাপথে কালীঘাট মন্দিরে যেতে পারবেন।
যেখানে থাকবেন : কালীঘাটের কাছাকাছি বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। যেমন : বাবল বেডস-ব্যাকপ্যাকারস হোটেল, ট্রিবো ট্রিপ, কৃষ্ণ গেস্ট হাউজ, মার্বেল প্যালেস গেস্ট হাউজ, হোটেল সুদেশ টাওয়ার, নীলিমা’স ইন, হোটেল আশা, হোটেল প্যানাসিয়া ইন্টারন্যাশনাল, মেট্রো দা গেস্ট হাউজ, হোটেল স্বাগত, দ্য ওপাস, মালিক গেস্ট হাঠ, হোটেল তারা ও হোটেল সিদ্ধার্থ অন্যতম।
খাবার : কালীঘাটের আশেপাশের খাবার হোটেলগুলোর মধ্যে ভজহরি মান্না, কলাপাতা, পিঠে বিলাসী, উৎসব রেস্টুরেন্ট, হোটেল তরুণ নিকেতন, ঘরে বাইরে রেস্টুরেন্ট, বিরিয়ানি কর্নার, সপ্তপদী এবং তেরো পার্বণ অন্যতম।
তথ্যসূত্র : https://ebela.in/state/10-facts-about-kalighat-dgtl-1.401316 https://bn.vikaspedia.in/education/9b69bf9b69c1-9859999cd9979a8/9aa9b69cd99a9bf9ae9ac9999cd9979c7-9ac9c79be9a89b0-99c9be9979be/9a49c09b09cd9a59