লোকতাক লেক : পৃথিবীর একমাত্র ভাসমান লেক

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মনিপুরের অন্যতম দর্শনিয় স্থান ভাসমান লেক লোকতাক



লোকতাক লেক (Lokatak Lake) মনিপুর

মনিপুর রাজ্যের বিষ্ণুপুরে অবস্থিত পৃথিবীর একমাত্র ভাসমান লেক লোকতাক। লেকটি ছবি : স্ক্রল ড্রল ডট কম


ভারতের 'সেভেন সিস্টার্স'-এর একটি হল মণিপুর। এ রাজ্যটিতে নৃগোষ্ঠীদের বাস। রাজ্যটি তার নামের মতই চমৎকার। নীল পাহাড়, দিগন্ত বিস্তৃত সোনালি ধান ক্ষেত, সবুজ জঙ্গল, পাহাড়ি ঝর্ণা এই রাজ্যটিকে পরিণত করেছে একটি রত্নে। কল্পনার সৌন্দর্য দিয়ে আবৃত এই দেশ যেনও প্রকৃতির আশীর্বাদ প্রাপ্ত। কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড় দ্বারা ঘেরা বিশাল এই উপত্যকা যেনও সৃষ্টিকর্তার নিপুণ এক শিল্পকর্ম। পাহাড় ও বনাঞ্চলের মিতালিতে সরল শান্ত-শুভ্র পরিবেশের এই রাজ্য তাই রূপ-রঙের এক অনন্য উপাখ্যান। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য এক নিদর্শন হল লোকতাক লেক (Lokatak Lake)। পৃথিবীর একমাত্র ভাসমান এই লেকটি মণিপুরের অন্যতম একটি ভ্রমণস্থান।

অবস্থান

মনিপুর রাজ্যের বিষ্ণুপুরে এই লেকটি অবস্থিত। মনিপুরের রাজধানী ইম্ফাল থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে মৌরাং শহরে এই লেকটির অবস্থান। মিষ্টি জলের এই লেকটি প্রায় ২৮৭ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এই রাজ্যের বিভিন্ন নদীর পানি এসে মিশেছে এই লেকের পানিতে। স্বচ্ছ পানির ওপর ভাসছে টুকরো টুকরো সবুজ ঘাস ও লতার ঝোপ।

ফুমদিস

এগুলো সবুজ গোল চাকতির মতো অসংখ্য বৃত্তাকার ভাসমান জলাভূমি, যা দেখতে একেকটি দ্বীপের মতো। স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে 'ফুমদিস' বলে। এই ফুমদিসগুলোর ২০ ভাগ পানির ওপর ভেসে থাকে আর বাকি অংশ থাকে পানির নিচে। এই দ্বীপগুলোর অনেক কয়েকটিতে রয়েছে মানুষের বসবাস।

আরও পড়ুন : মেরি এন্ডারসন ভাসমান রেস্তোরা ও বার, নারায়ণগঞ্জ



লোকতাক লেক (Lokatak Lake)

সবুজ গোল চাকতির মতো অসংখ্য বৃত্তাকার ভাসমান জলাভূমিগুলো দেখতে একেকটি দ্বীপের মতো, স্থানীয় ভাষায় এগুলোকে 'ফুমদিস' বলে। ছবি : ক্লাউড ভিসুরা ডট কম



ভাসমান দ্বিপের বাড়িঘর

খড়, বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট কুটির। মজার ব্যাপার হল বাতাস লেগে এই দ্বীপ ঘরবাড়িসহ ভাসতে থাকে। পানির ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে ভেসে বাড়িগুলো বিভিন্ন জায়গায় দিক পরিবর্তন করতে থাকে। লোকতাকে চলাচলের একমাত্র বাহন হলও নৌকা। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনেই একটি করে ডিঙি নৌকা বাঁধানো আছে। লোকতাকের সবচেয়ে বড় দ্বীপটির আয়তন প্রায় ১৫ বর্গ মাইল। যা 'কেইবুল লামাজাও জাতীয় উদ্যান' নামে পরিচিত। এই উদ্যানটি বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান। এই উদ্যানে মনিপুরের জাতীয় পশু সাঙ্গাই হরিণ বা নাচুনে হরিণ দেখতে পাবেন। এখানে পর্যটকদের জন্য বাংলো এবং ওয়াচ টাওয়ার আছে । এই ওয়াচ টাওয়ার থেকে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ ভাসমান ঘাসজমি দেখতে পাবেন। এই লেকের ভাসমান দ্বীপগুলোতে প্রায় ৪২০-৪২৫টির মতো ঘর আছে। এখানে বসবাসকারীরা সবাই জেলে। এই লেকই তাদের জীবিকার প্রধান উৎস। মৌরাং হয়ে লোকতাকের মধ্যে একটি সরু ভূখণ্ড প্রবেশ করেছে।

থাঙ্গা

এই ভূখণ্ডে 'থাঙ্গা' নামে একটি গ্রাম গড়ে উঠেছে। এই গ্রামের বাড়িঘরগুলোর মধ্যে একধরনের সাদৃশ্য দেখা যায়। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আকৃ্তিই একই রকম।

আরও পড়ুন : বৈকাল হ্রদ: বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন হ্রদ



কেইবুল লামাজাও জাতীয় উদ্যান (Lokatak Lake)

লোকতাকের সবচেয়ে বড় দ্বীপটি “কেইবুল লামাজাও” জাতীয় উদ্যান নামে পরিচিত। ছবি : এসআইএ ম্যাগাজিন ডট কম


 এখানকার শিশুদের পড়াশুনার জন্য ২০০৬ সালে 'লোকতাক ফ্লোটিং এলিমেন্টারি স্কুল' প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই স্কুলটিতে প্রায় ৬০ জন ছেলে মেয়ে লেখা পড়া করে। দিনের বিভিন্ন সময়ে লোকতাক বিভিন্ন রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। ভোরের নরম আলোয় লোকতাকের পরিবেশ বড্ড বেশি নীরব ও নির্মল হয়ে ধরা পড়ে। শীতল হিমেল বাতাস শরীরে বুলিয়ে যায় ভালোলাগার পরশ। আকাশটা মেঘহীন হলে দেখতে পাবেন দূরে নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের সারি। পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে থাকে মেঘের চাঁদর মুড়ি দিয়ে।

খানকার আকাশ খুব বেশিই নীল। এখানে অসংখ্য পাখির কলরবে লোকতাকবাসীর ঘুম ভাঙ্গে। সন্ধ্যা নেমে এলে লোকতাকের কুটিরগুলোতে জ্বলে উঠে লন্ঠনের আলো। সারাদিনের কর্মযজ্ঞ শেষে সাঁঝের বেলায় এখানকার বাসিন্দারা যে যার ঘরে ফিরে আসে। প্রতিটি কুটিরের আলোয় লোকতাককে মনে হয় আকাশের আয়না। আলোর প্রতিবিম্ব মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকে জলের বুকে। রাতের বেলায় লোকতাকে নৌকায় চড়ে ঘুরতে পারেন। এই নৌকা বিহারে আপনি পাবেন অপার নীরবতার এক অনন্য অনুভূতি। বিশাল রাতের আকাশের নিচে মনে হবে অন্য জগতে হারিয়ে গেছেন। ঝুম বৃষ্টির সময় লোকতাকের সৌন্দর্য অনন্য এক মাত্রায় পৌঁছে যায়।

আরও পড়ুন : পর্যটকদের মুগ্ধ করছে ভাসমান ‘অন্তেহরি জলের গ্রাম’


লোকতাক লেক (Lokatak Lake)

লেকের ভাসমান দ্বীপগুলোতে প্রায় ৪২০-৪২৫ টির মতো ঘর আছে। ছবি : হোয়াট শট ডট ইন


 শ্রাবণের ধারায় লোকতাকে নব যৌবনের সূচনা হয়। এসময় এই লেকের পানিতে প্রচুর মাছের উপস্থিতি দেখা যায়। আবার শীত মৌসুমে লোকতাক ভরে উঠে পাখিদের মেলায়। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত পরিযায়ী পাখিদের কিচিরমিচিরে লেকটি মুখরিত হয়ে উঠে। লেকের ওপর দিয়ে পাখির ঝাঁকের উড়ে যাওয়ার দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। লোকাতাকে পর্যটকদের জন্য একটি দ্বীপে ভাসমান রেস্টুরেন্ট গড়ে তোলা হয়েছে। লেকে নৌকাবিহার শেষে এই রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া সারতে পারবেন। এছাড়া পর্যটকদের থাকার জন্য লোকতাকে রিসোর্ট আছে। লোকতাকের সৌন্দর্য পরিপূর্ণভাবে উপভোগের জন্য সেন্ডরা রিসোর্টে থাকতে পারেন। এই রিসোর্ট থেকে দারুণ এক সূর্যাস্ত আর সূর্যোদয় দেখতে পাবেন। আর জ্যোৎস্না রাতে যখন এই লেকের জলে চাঁদের রূপালি আভা এসে পড়ে তখন মনে হবে যেনও স্বর্গের সব সৌন্দর্য ভর করেছে এই লোকতাকে।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম