জীব বৈচিত্র্যে পূর্ণ সিংড়া জাতীয় উদ্যান : দিনাজপুর

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : সিংড়া জাতীয় উদ্যান


সিংড়া জাতীয় উদ্যান Singra National Park

ছবি : সংগৃহীত


 নির্জন প্রকৃতির সান্নিধ্যের মতো এতো প্রশান্তিময় অনুভূতি হয়তো আর কিছুতেই পাওয়া যায় না। দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততায় যখন প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে তখন প্রকৃতির মায়া স্পর্শই মন-প্রাণ করে তোলে সতেজ। প্রকৃতির মাঝে নিজেকে খুঁজে পেতে যদি ভাবছেন কোথাও যাবেন, তাহলে ঘুরে আসতে পারেন সিংড়া জাতীয় উদ্যান (Singra National Park)-থেকে। সবুজে ছাওয়া বনের ভেতরে এলোমেলো পথে খুঁজে পাবেন অপার নিসর্গের নিরিবিলি পরিবেশ। শাল-সেগুনের এই বনে প্রকৃতি এখানে বড্ড মায়াবী। ঘন বরষায় স্নান সেরে গাছপালাগুলো আকাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে এখানে। সূর্যের সোনালি আলো ঠিকরে পড়ে বনের মাঝে সৃষ্টি করে আলোর রূপের খেলা। অপার নীরবতা আর বুনো সৌন্দর্য।

এ যেন আরেক সুন্দরবন। দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলা থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে ভোগনগর ইউনিয়নে এই জাতীয় উদ্যানটি অবস্থিত। জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৪০ কিলোমিটার। ঢাকা-পঞ্চগড় মহাসড়ক থেকে নেমে মাত্র দুই কিলোমিটার উত্তরেই পেয়ে যাবেন এই বন। সিংড়া জাতীয় উদ্যান বা সিংড়া ফরেস্ট একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। স্থানীয়রা এটিকে সিংড়া শালবন নামে ডাকে। এই জাতীয় উদ্যানটির আয়তন ৩০৫ দশমিক ৬৯ হেক্টর। মোট ৪টি মৌজা নিয়ে সিংড়া জাতীয় উদ্যান বিস্তৃত। প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ এবং পর্যটন সুবিধার জন্য ২০১০ সালে বনবিভাগ কর্তৃক এটি জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা হয়। সারি সারি আকাশছোঁয়া দীর্ঘকায় শাল, সেগুন আর লতাগুল্ম, শান্ত শীতল সবুজাভ প্রকৃতি এখানে হাতছানি দিয়ে ডাকে।


কি কি উপভোগ করবেন

শাল-সেগুন ছাড়াও এখানে বিভিন্ন ধরনের নাম না জানা উদ্ভিদ ও লতা-গুল্ম রয়েছে।আরও দেখতে পাওয়া যায় জারুল, তরুল, শিলকড়ই, শিমুল, মিনজিরি, সেগুন, গামার, আকাশমণি, ঘোড়ানিম, সোনালু, গুটিজাম, হরতকি, বয়রা এবং আমলকী। লোকমুখে শোনা যায়, একসময় এই বনে বাঘ ও নীল গাইও ছিল। এই উদ্যানে পশুপাখির মধ্যে রয়েছে খরগোশ, শেয়াল, সাপ, বেজিসহ নানান জাতের পাখির। পাখির মধ্যে রয়েছে, দেশী শুমচা, হাঁড়িচাচা, ব্রঞ্জ ফিঙ্গে, নীল গলা বসন্ত বৌরি, বড় তিত, খুরুলে পেঁচা, মেঘ হও মাছরাঙা, ইউরেশীয়-কণ্ঠী ঘুঘু, তিলা ঘুঘু, রাজ ঘুঘু, বাংলা কাঠ-ঠোকরা, বেনে বউ, বুলবুলি, টুনটুনি, লম্বা লেজ রাতচরা ইত্যাদি। পুরো বন এই পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকে সারাদিন। যেন পাখিদের হাঁট লেগে থাকে। এখানে আরও রয়েছে শকুন পাখি। শীতপ্রধান এলাকা থেকে আসা এসব শকুনের জন্য বাঁশ দিয়ে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। শীত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শকুনগুলোকে আবার ছেড়ে দেয়া হয়।


সিংড়া জাতীয় উদ্যান Singra National Park

ছবি : সংগৃহীত


 এই বনের মধ্যে দেখা মিলবে হাজার হাজার উইয়ের ঢিবি। একেকটির উচ্চতা ছয় থেকে সাত ফুট পর্যন্ত। দূর থেকে দেখে মনে হয় ঝড়ে ভেঙে পড়া কোনো গাছের গোড়া। কি দারুণ নিখুঁতভাবে বানানো উই পোকার বাসা।


নর্ত নদ

সিংড়া শালবনের সৌন্দর্যকে পর্যটকদের কাছে আরো মোহনীয় করেছে বনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা নর্ত নদ। ঠাকুরগাঁও জেলার টাঙ্গন নদ থেকে উৎপত্তি লাভ করা এই নদ সিংড়া বনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বীরগঞ্জের ঢেপা নদীতে গিয়ে মিশেছে। ভরা শ্রাবণে এই নদটি হয়ে উঠে চির যৌবনা। বনের অন্য প্রান্তে যেতে এই নদের ওপরে আছে ছোট একটি সেতু। এই সেতুর উপর দাঁড়িয়ে নদের স্বচ্ছ জল দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। সারি সারি আকাশছোঁয়া দীর্ঘ শাল গাছের সবুজ আবরণ যেকোনো পর্যটককেই বিমোহিত করবে। বনের মধ্যদিয়ে মেঠো পথে একাকী হাঁটতে হাঁটতে মন চাইবে প্রকৃতির আলিঙ্গনে হারিয়ে যেতে। শালবনের ভিতরের আগর ও বাঁশ-বেত বাগানও মুগ্ধ করবে আপানকে। নর্ত নদের তীর ধরে বনের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে কিছু দূর গেলেই দেখতে পাবেন আদিবাসী সাঁওতালদের ছোট ছোট মাটির ঘর। আরো দেখতে পাবেন তাদের নদে ছোট ছোট মাছ ধরার দারুণ দৃশ্য।


পিকনিক স্পট

পর্যটকদের জন্য এখানে একটি রেস্ট হাউজ ও দুটি পিকনিক স্পট গড়ে তোলা হয়েছে। পিকনিকের রান্নাবান্না করার জন্য রয়েছে আলাদা শেড। পিকনিকের জন্য যদি আসতে চান তাহলে আসতে হবে শীতকালে। আর যদি বনের সবুজময় সৌন্দর্য ও নর্ত নদের প্রবাহমান উচ্ছলতা দেখতে চান তাহলে ভরা বর্ষাকালে আসতে হবে।


যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে সড়কপথে দিনাজপুর আসতে পারেন। দিনাজপুর-গামী বাসগুলো ছাড়ে গাবতলি ও কল্যাণপুর থেকে। এদের মধ্যে রয়েছে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এস আর ট্রাভেলস,কেয়া পরিবহন, এস এ পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, নাবিল পরিবহনের এসি, নন-এসি বাস। এছাড়াও আসাদগেট, কলেজগেট, শ্যামলী, টেকনিক্যাল মোড় হতে নাবিল বা বাবলু এন্টারপ্রাইজের চেয়ার কোচে করে সরাসরি দিনাজপুর পৌঁছাতে পারেন। আর ট্রেনে আসতে চাইলে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন দ্রুতযান এক্সপ্রেস অথবা একতা এক্সপ্রেসে চড়ে দিনাজপুর যেতে পারেন। বাসে আসলে বীরগঞ্জ শহরে নেমে সেখান থেকে বাসে করে এই বনে যেতে পারবেন। আর ট্রেনে আসলে সেক্ষেত্রে সৈয়দপুর অথবা দিনাজপুরে নেমে তারপর বাসে করে বনে যেতে পারেন।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম