ঘুঘুডাঙ্গার ঐতিহাসিক ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ি, দিনাজপুর

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ি-টি নির্মাণ করেন ফুল মোহাম্মদ



ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ি Ghughudanga Jomidar Bari

ছবি : সংগৃহীত


কালের স্রোতে হারিয়ে গেছে রাজ-রাজড়ার দল, রাজপ্রথার জৌলুস আর ক্ষমতা। যেমনটা হারিয়ে গেছে আমাদের দেশের জমিদারি প্রথা। জমিদারদের সেই প্রভাব-প্রতিপত্তি কালের গর্ভে বিলীন হলেও তাদের জমিদার বাড়িগুলো আজও রয়ে গেছে শৈল্পিক স্থাপত্যের চিহ্ন হয়ে। ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্মৃতিমাখা এই প্রাচীন নিদর্শনগুলো ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য হয়ে উঠেছে আকর্ষণের জায়গা। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের আজ জানাবো তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ির কথা। জমিদার বাড়িটির নাম ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ি (Ghughudanga Jomidar Bari) । দিনাজপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পূর্ণভবা নদীর কোলঘেঁষে ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামে এই জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। কোলাহল থেকে দূরে নিরিবিলি পরিবেশে সবুজ গাছ-গাছালির মাঝে এই জমিদার বাড়িটি কালের সাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে।


ইতিহাস

প্রায় দুই'শ বছর আগে ইট-সুরকি দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এই বাড়িটি। জমিদার বাড়ির প্রবেশ পথেই রয়েছে বিশাল প্রবেশদ্বার। সু-দৃশ্য এ প্রবেশদ্বারে চমৎকার পোড়ামাটির কারুকাজ। যা এখন লতাপাতায় ছেয়ে আছে। জমিদার বাড়ির একতলা ও দোতলা ভবন জমিদারি আমলে বাহারি ফুলে সজ্জিত ছিলও। পুরো বাড়িজুড়ে ছিল জৌলুস আর চাকচিক্য। জমিদার বাড়ির হাতিশালে হাতি ও ঘোড়াশালে ঘোড়ায় ভরপুর ছিলও। জমিদারদের বাবুর্চি, খামারি, পাইক-পেয়াদা-সিপাই-লস্করের ছিলও বিশাল বহর। এখানে ছিল বিশাল মেহমানখানা। এই জমিদাররা এখানে বসবাসরত প্রজাদের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রেখে জমিদারী চালাতেন। জমিদার বাড়িটি প্রজাদের আনাগোনায় মুখরিত থাকতো। এই ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের প্রাচীন নাম ছিল 'একবারপুর'।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বংশের আদি পুরুষ ছিলেন নবীর মোহাম্মদ। ব্রিটিশ শাসনের সময় তিনি তৎকালীন ভারতের জলপাইগুড়ির অধিবাসী ছিলেন এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এই একবারপুরে এসেছিলেন। একবারপুরের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি এখানে স্থায়ীভাবে রয়ে গিয়েছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন, এই জায়গাটি তার ব্যবসায়ের জন্য সুবিধাজনক ছিল বলে তিনি এখানে থেকে গিয়েছিলেন। এই ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারীর গোড়াপত্তন করেন মূলত নবীর মোহাম্মদের একমাত্র ছেলে ফুল মোহাম্মদ। ফুল মোহাম্মদ তৎকালীন ১১টি থানা নিয়ে এখানে জমিদারি শুরু করেন। ১১ থানায় ১৮টি কাচারি ও ৪১টি তহসিল কার্যালয়ের মাধ্যমে এই জমিদারি চলত। জমিদার হিসেবে ইংরেজ সরকার কর্তৃক ফুল মোহাম্মদকে চৌধুরী উপাধি লাভ করে। তিনি ধীরে ধীরে জমিদারীতে অনেক অগ্রগতি লাভ করেন।



ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ি Ghughudanga Jomidar Bari

ছবি : সংগৃহীত



ফুল মোহাম্মদের শাসনকাল

জমিদারী শুরুর ফুল মোহাম্মদ একবারপুরের নাম বদলে ঘুঘুডাঙ্গা রেখেছিলেন। আর তার জমিদারি সত্ত্বের নাম হয় 'ঘুঘুডাঙ্গা এস্টেট'। আর সেই সাথে এই এই জমিদাররা 'ঘুঘুডাঙ্গার জমিদার' হিসেবে পরিচিত হন। ফুল মোহাম্মদই এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন। ব্রিটিশ আমলে দিনাজপুরের সব জমিদারদের মধ্যে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার ছিলেন অন্যতম একজন প্রভাবশালী জমিদার। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারির স্থায়িত্ব ছিল ৮০ বছরের অধিক।

১৯৫৬ সালে জমিদারি প্রথা বাতিল হলেও এই জমিদার স্থানীয়দের সুখ-দুঃখের ভাগীদার ছিল। গ্রাম প্রধানসহ স্থানীয়দের নিয়ে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার এখানকার নানা সমস্যার সমাধান করতেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সাথেও এই জমিদার বাড়িটি জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ এ মুক্তিযোদ্ধারা এই জমিদার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। পাক বাহিনীরা এই সংবাদ জানতে পেরে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। সেই বোমা হামলায় এই জমিদার বাড়ির অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। এছাড়াও পাক বাহিনী এই জমিদার বাড়ি থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট চালিয়ে নিয়ে যায়।


যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে সড়কপথে দিনাজপুরে যেতে পারেন। দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে গাবতলি ও কল্যাণপুর হতে বাস ছেড়ে যায়। নাবিল পরিবহনের এসি বাসও রয়েছে। এসি নন এসি ভেদে বাস ভাড়া ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা। এছাড়া যেতে পারেন ট্রেনেও। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন দ্রুত-যান ও একতা এক্সপ্রেসে করে যেতে পারেন দিনাজপুর। এরপর দিনাজপুর শহর থেকে সিএনজি চড়ে যেতে পারেন ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামে।


যেখানে থাকবেন :

দিনাজপুরে শহরে থাকার জন্য নানা ধরনের হোটেল রয়েছে। শহরে থাকার জন্য ভালো মানের হোটেল হচ্ছে পর্যটন মোটেল। ফোন : ৯৮৯৯২৮৮–৯১ । খরচ পড়বে ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা। অন্যান্য সাধারণ মানের হোটেল ডায়মন্ড , মালদহ পট্টি, ফোন: ০৫৩১–৬৪৬২৯, হোটেল আল রশিদ- নিমতলা, ফোন: ০৫৩১–৬৪২৫১। এসকল হোটেলে ১০০–১২০০ টাকায় থাকতে পারবেন।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম