সাধু নিকোলাস গির্জা : বাংলা ভাষার প্রথম বাইবেল অনূদিত হয় যেখানে

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : টলেন্টিনোর সাধু নিকোলাস গির্জা বা নাগরী গির্জা : গাজীপুর



সাধু নিকোলাস গির্জা Saint Nicholas Church

ছবি : সংগৃহীত


 ছোটখাটো ছুটিতে সুযোগ হলেই একটু বেড়িয়ে আসলে সারা সপ্তাহের ক্লান্তি কেটে গিয়ে মন নিমিষেই সতেজ হয়ে উঠে। সাপ্তাহিক ছুটিতে পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে চলে যেতে পারেন ঢাকার আশেপাশে। ঢাকার কাছের শহর গাজীপুর-এ দেখার মত অনেক কিছুই আছে। ঐতিহাসিক স্থান থেকে শুরু করে রিসোর্ট,পার্ক, পিকনিক স্পটসহ প্রাকৃতিক শোভায় ঘেরা নানান জায়গা রয়েছে গাজীপুরে। ঢাকা থেকে কাছে হওয়ায় একদিনের ভ্রমণের জন্য আদর্শ স্থান হল গাজীপুর। আপনার গাজীপুর ভ্রমণে অবশ্যই দেখে আসবেন দেশের দ্বিতীয় পুরনো গির্জা টলেন্টিনোর সাধু নিকোলাস গির্জা (St. Nicholas Church)।


সাধু নিকোলাস গির্জা তৈরির ইতিহাস

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী এলাকায় এই গির্জাটি অবস্থিত। বহু বছরের স্মৃতিকে বুকে ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই গির্জাটি ১৬৬৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশে যে কয়টি পুরনো গির্জা আছে তার মধ্যে এটি দ্বিতীয় প্রাচীন গির্জা। এই গির্জাটি এই উপমহাদেশেরও অন্যতম একটি প্রাচীনতম গির্জা। স্থানীয়দের অনেকেই টলেন্টিনির সাধু নিকোলাসের গির্জাকে নাগরী গির্জা নামে চেনেন। স্থানীয় ও পর্তুগীজ ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তায় সাধু নিকোলাস এই গির্জাটি নির্মাণ করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে পর্তুগিজ খ্রিষ্টানদের এদেশে আগমন ঘটে। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে পর্তুগীজরা এ দেশে আসলেও ইউরোপীয়দের মধ্যে তারাই প্রথম এদেশে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার শুরু করেন। তারা সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতিক্রমে ১৬৬৩ সালে প্রথম গির্জা স্থাপন করে। পরে ১৬৮০ সালে পাকা ইমারত এ রূপান্তরিত হয় এই নিকোলাস গির্জা। এই পুরাতন গির্জাটির পাশেই বিশাল এলাকা জুড়ে আধুনিকভাবে নতুন গির্জা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এর সামনে হস্ত প্রসারিত যিশুর দণ্ডায়মান চমৎকার একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এই গির্জার পুরনো ভবনটি আসলেই ১৬৬৩ সালে নির্মিত হয়েছে কিনা তা নিয়ে নানা মত পার্থক্য রয়েছে। তবে বেশির ভাগেরই ধারণা এই ভবনটির স্থানে পূর্বে কাঠ-খড় দিয়ে নির্মিত একটি গির্জা ছিল। সেই গির্জাটিতে আগুন লাগার কারণে পুরো গির্জা ধ্বংস হয়ে গেলে বর্তমান ভবনটি নির্মাণ করা হয়। ধারণা করা হয়, বর্তমান ভবনটি ১৮০০ সালের মাঝামাঝি কোনও এক সময় নির্মাণ করা হয়েছে।


সাধু নিকোলাস গির্জা Saint Nicholas Church

ছবি : সংগৃহীত



সাধু নিকোলাস গির্জা অব্যহন্তর

নতুন করে নির্মিত এই গির্জাটি দেখতে দারুণ সুদৃশ্য। এতো আগের এই গির্জাটি দেখে যে কেউ অবাক হবে এর নির্মাণশৈলীতে। যেনো বর্তমান সময়ের আধুনিক স্থাপত্য শিল্প। পর্তুগিজদের স্থাপত্য নিদর্শনের অনন্য এই স্থাপনাটি একতলা হলুদ রঙের একটি ভবন। এই ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে বিরাট মোটা হলুদ থামে। এখানে থাম আছে পাঁচটি। এর ছাদ সামনের দিকে। গির্জার সামনে আছে বড় বাঁধানো বারান্দা। বারান্দা দিয়ে তিনটি দরজা রয়েছে। প্রতিটি দিয়েই হলঘরে যাওয়া সম্ভব। এর ভেতরে আছে একসঙ্গে প্রার্থনার জন্য প্রার্থনাঘর, ফাদারের স্থান এবং একান্তভাবে প্রার্থনার জন্য আলাদা কক্ষ আছে। ইউরোপীয় গির্জা স্থাপত্যশৈলী ও দেশি ধাঁচের মিশ্রণও দেখা যায় এর নির্মাণশৈলীতে।


সাধু নিকোলাস গির্জার কিছু ইতিহাস

ইতিহাসের কিছু ঘটনাও জড়িয়ে আছে এই গির্জাকে ঘিরে। এই গির্জা থেকে আঃঞ্চলিক বাংলা ভাষার প্রথম বাইবেল অনূদিত হয়। পর্তুগীজ ভাষায় বাংলা ভাষার প্রথম যে ব্যাকরণ ও অভিধান রচনাকারী পাদ্রী ম্যানুয়েল দ্যা অ্যাসুম্পসাও এই গির্জারই পাদ্রী ছিলেন। এ গির্জাতেই তিনি এই গ্রন্থগুলো রচনার কাজ করেছিলেন। এই গির্জাকে কেন্দ্র করে ১৯১০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করা হয়। পর্তুগিজ পুরোহিত ও তৎকালীন জেলা বোর্ডের অনুদানে এই বিদ্যালয় চালু হয়। এরপর ১৯২০ সালে ১ সেপ্টেম্বর এই বিদ্যালয়কে নিম্ন মাধ্যমিক ইংরেজি বিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়। এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ। এখনো এই গির্জাতে খ্রিস্টানরা নিয়মিত প্রতি রবিবারে প্রার্থনা করেন। এই গির্জার পাশে বিশাল দুইটি সমাধি এলাকা রয়েছে। নান্দনিক এই গির্জাটি দেখতে এখানে অসংখ্য পর্যটকদের আগমন ঘটে।


যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে এই গির্জায় যেতে আগে ৩০০ ফিট-এ যাবেন। সেখান থেকে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত ২০ মিনিট। তারপর বাইপাসে উঠে গাজীপুর মীরের বাজার দিকে ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে পানজোড়া মোড়ে যাবেন। সেখান থেকে ১০ মিনিট হাঁটলেই সাধু নিকোলাসের গির্জা পেয়ে যাবেন।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম