সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ দেশ তুরস্কের দর্শনীয় ইসলামিক স্থাপত্য

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল# অটোমান শাসনামলে নির্মিত স্থাপত্যগুলো মুসলিম বিশ্বের ঐতিহ্যস্বরূপ বিবেচিত

চমৎকার সব ইসলামিক স্থাপত্যের একটি এই মেভলানা মসজিদ, যেখানে শায়িত আছেন বিখ্যাত কবি ও সুফিসাধক জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি

চমৎকার সব ইসলামিক স্থাপত্যের একটি এখন মেভলানা জাদুঘর, যেখানে শায়িত আছেন বিখ্যাত কবি ও সুফিসাধক জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি। ছবি : টার্কিশ এয়ারলাইন্স


 বাণিজ্য ও সংস্কৃতিসমৃদ্ধ এক বৈচিত্র্যময় দেশ তুরষ্ক। ইউরোপ ও এশিয়া দুই মহাদেশদ্বয়ের মিলনস্থল হওয়ায় তুরষ্কের সংস্কৃতিতেই রয়েছে দুইমহাদেশের প্রভাব। এখানে যেমন গ্রিকদের তৈরি স্থাপনা এবং দেব-দেবীর জন্য নির্মিত মন্দির আছে, তেমনই আছে রোমানদের তৈরি করা খৃষ্টান ধর্মের নানা নিদর্শন। এছাড়া আনুমানিক ১৩-১৪ শতকে তুরস্কে বিখ্যাত অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে তাদের তৈরি করা ইসলামি স্থাপত্য তো আছেই। এত কিছুর ফলশ্রুতিতে তুরস্কের রন্ধনশৈলী, ধর্মীয় স্থাপনা, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান গুলোর মধ্যে রয়েছে চোখে পড়ার মত বৈচিত্র্য। পর্যটকদের কাছে একারণেই তুরষ্ক এক মোহনীয় স্থান। বিশ্বের ষষ্ঠ পর্যটন গন্তব্যের স্থানটিও তাই দখল করেছে দেশটি।


ইস্তানবুলের কার্কুতানে অবস্থিত 'সেরাগ্লিও ছবি: সংগৃহীত



 ইস্তানবুলের কার্কুতানে অবস্থিত 'সেরাগ্লিও' ছিল অটোমান গৃহস্থদের স্ত্রীদের বিশ্রামাগার। পরবর্তীতে যা যাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। এই জাদুঘরে অটোমান সাম্রাজ্যের বহু অজানা বিষয় প্রদর্শিত রয়েছে। প্রাসাদটিতে প্রায় হাজারখানেক ঘর রয়েছে। প্রতিটি ঘর নীল রঙের দেয়ালে আড়ম্বরভাবে সু-সজ্জিত। রাজকীয় এই প্রাসাদটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে গৌরব অর্জন করছে । জাদুঘরে রয়েছে সুলতানদের ব্যবহৃত পুরাকীর্তি, পোশাক, ভালুকের শিলালিপি, অস্ত্র, রান্নাঘরের তৈজসপত্র এবং কয়েকটি লাইব্রেরি রয়েছে। ১১ শতাব্দীর পূর্ববর্তী পৃথিবীর প্রাচীনতম মানচিত্রও রয়েছে এখানে। তুরস্কের অন্যতম স্থানের একটি হলো রানী মাদারের আবাসস্থল। 


তুরষ্কের ঐতিহাসিক স্থাপনা হায়া সোফিয়া। ছবি : সংগৃহীত




 তুরষ্কের এক চোখ ধাঁধানো নিদর্শন 'হায়া সোফিয়া'। এটি খ্রিস্টান এবং মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র স্থান। ইতিহাসের পালাবদলের সাথে যার বদলেছে পরিচয় এবং ব্যবহার। টি মূলত ৫৩২ খ্রিস্টাব্দের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। তৎকালীন রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান কনস্ট্যান্টিনোপল অধিবাসিদের জন্য একটি গির্জা নির্মাণ করেন। যা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছিল প্রায় ১৫০ টন স্বর্ণ। সম্প্রতি তুর্কি সরকারের এক সিদ্ধান্তে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয় এই স্থাপত্য। এ ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনদের পতনের পর বর্তমান ইস্তানবুলে অটোমানদের রাজত্ব শুরু হয়। তখন 'হায়া সোফিয়া'কে মসজিদে রূপান্তর করেন তিনি। ১৯৩৪ সালে এ স্থাপনাকে জাদুঘরে পরিবর্তন করেন আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আতাতুর্ক। মসজিদটির গম্বুজে রয়েছে ৪০টি জানালা। দীর্ঘদিন এখানে ধর্মীয় উপাসনা বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি হায়া সোফিয়াকে আবার মসজিদে পরিণত করেছে দেশটির এরদোয়ান সরকার।
চোখ ধাঁধানো নীল মসজিদ। ছবি :

চোখ ধাঁধানো নীল মসজিদ। ছবি : সংগৃহীত


সুলতান আহমেদ মসজিদ, যার আরেক নাম নীল মসজিদ। সপ্তদশ শতকে স্থাপিত নীল মসজিদটি অটোমান সাম্রাজ্যের নির্দশন স্বরূপ। অটোমানদের নির্মিত মসজিদের মধ্যে এটি অন্যতম। পারস্যের সাথে যুদ্ধে হেরে সুলতান আহমেদ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। সুলতান আহমেদ মসজিদটি সুলতান প্রথমের শাসনাকালে ১৬০৯ থেকে ১৬১৬-এর মধ্যে নির্মিত। নীল রংয়ের টাইলস দিয়ে মসজিদটি সজ্জিত বলে এর নাম দেয়া হয়েছে নীল মসজিদ। এই মসজিদের ভেতরে রয়েছে সুলতান আহমেদের কবর, মাদ্রাসা ও এতিমখানা। গম্বুজগুলোতে গ্ল্যাজড সিরামিকের ওপর সজ্জিত আছে। হাতে আঁকা হাজারো টিউলিপ ফুলের নিদর্শন। মসজিদটির নীচতলায় ছিলো কয়েকশ কাঁচের জানালা। একটি বিশাল ঝরনা মসজিদে ঢুকতেই আপনার নজর কাড়বে। তাছাড়া প্রবেশপথের ঠিক সামনে রয়েছে ঝুলন্ত লোহার শিকল।
মেভলানা জাদুঘর, কোনিয়া। ছবি :

মেভলানা জাদুঘর, কোনিয়া। ছবি : মেভলানা


সর্বশ্রেষ্ঠ সুফিবাদী, দার্শনিক, কবি জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ ওরফে রুমি'কে ১লা ডিসেম্বর ১২৭৩ সালে মেভলানা জাদুঘরে সমাধিস্থ করা হয়। সেলজুকের সুলতান রুমি'কে তার প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর গোলাপ উদ্যান রুমিকে উপহার হিসেবে প্রস্তাব দেন। এই স্থানে বসে রুমি কয়েকশ' কবিতার জন্ম দিয়েছেন। পরবর্তী এটি রুমি সমাধিস্থল হয়ে ওঠে। যে জাদুঘরে রুমি'কে সমাধিস্থ করা হয়েছে তার আকৃতি একটি চার পায়ে দাঁড়ানো হাতির ন্যায়। রয়েছে রৌপ্য খচিত দরজা। জাদুঘরটি কারুশিল্পের প্রতিমূর্তি, কাঠের কারুশিল্পকে রত্ন দিয়ে সজ্জিত করা হয়। রুমির শ্রেষ্ঠ কিছু কর্ম ধাতুর তৈরি ছোট ছোট বাতির গায়ে খোদাই করা রয়েছে। সুফিপ্রেমী সেই সাথে তুরস্কের ঘুরতে আসা যেকোনো পর্যটকের জন্য মেভলানা জাদুঘর একটি দুর্দান্ত স্থান।


বায়েজিদ কামি মসজিদ। ছবি : হাক্কিন্ডা


 কনস্টান্টিনোপল পতনের পরে, বায়োজিদ কামি অটোমান সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। রাজদায়িত্ব গ্রহণ করে সূচনা করেন অটোমানদের শাসনাকাল। ১৫০৬ সালে সুলতান বায়োজিদ দ্বিতীয় মসজিদটি স্থাপন করেন। তাঁর গ্রিক বংশোদ্ভূত ভাতিজার তৈরি নকশায় নির্মাণ করা বায়োজিদ কামি মসজিদটি। সেই কারণেই এই মসজিদটিতে আপনি পাবেন গ্রীক ও ইসলামী স্থাপত্যের একটি মিশ্রণ। মসজিদের রান্নাঘরগুলো বর্তমানে লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে রয়েছে ষোলশো শতকের হাজার হাজার মূল্যবান দূর্লভ পুঁথি। পর্যটকদের কাছে এই মসজিদটি ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। যার প্রধান কারণ বৈচিত্র্যময় স্থাপত্য এবং আসাধারণ কারিগরি।
কারুকার্য করা আর্কষণীয় রুস্তম পাশা মসজিদ। ছবি :

কারুকার্য করা আর্কষণীয় রুস্তম পাশা মসজিদ। ছবি : সংগৃহীত


 রুস্তম পাশা ছিলেন সুলতান আহমেদের উজিরে আজম এবং একমাত্র কন্যাসন্তানের স্বামী। রাজজামাতা এবং উজিরে আজম হওয়ার কারণে অর্থ এবং ক্ষমতা কোনোটারই অভাব ছিল না রুস্তম পাশার। অঢেল সম্পত্তি তিনি মহৎ কাজে ব্যয় করতেন। তারই নিদর্শন এই মসজিদ। ১৫৬৩ সালে নিজ নামে তৈরি করেন এই মসজিদটি। ইস্তানবুলের সব মসজিদের মধ্যে এই মসজিদটির কারুকার্য অন্যতম। ইজনিক টাইলসে তৈরি এই মসজিদটা তাই পর্যটকদের কাছে বেশ আর্কষণীয় স্থান। গম্বুজাকৃতির খিলানগুলোতে লাল ও নীলের হাতে আঁকা ফুল আর জ্যামিতিক কারুকার্য মসজিদটির সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে এখানে একটি ধর্মীয় স্কুল রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীদের ধর্মগ্রন্থ পড়ার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

  ঐশ্বর্য মীম   এস এম