ষাটগম্বুজ মসজিদ : ঐতিহ্যের খোঁজে

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ষাটগম্বুজ মসজিদ



ষাটগম্বুজ মসজিদ

ষাটগম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট। ছবি : সুমন্ত গুপ্ত


প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত৷ বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, জাতিসত্তা বিকাশের সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমা উদঘাটনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো অনন্য ভূমিকা পালন করছে৷ আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্য-বৌদ্ধবিহার, মন্দির, মসজিদ, সাধারণ বসতি, আবাসিক গৃহ, নহবতখানা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জমিদার প্রাসাদ অথবা রাজপ্রাসাদ, অসংখ্য প্রাচীন পুকুর ও দীঘি শানবাঁধানো ঘাট, পানীয় জলের কুয়া, প্রস্তরলিপি, তাম্রলিপি, মুদ্রা, প্রাচীন পুঁথি-তুলট বা তালপাতায় লেখা, পোড়ামাটির ফলক-চিত্র, পোড়ামাটি ও পাথরের ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র ইত্যাদি৷

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার এই দেশের ইতিহাস বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা সমূহে ভ্রমণে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। অনেক দিনের পরিকল্পনা আজ বাস্তবায়নে পথে। আমি আর আমার ভ্রমণ সঙ্গী মা আছি সায়দাবাদ বাস স্ট্যান্ডে। দিবা প্রথম প্রহরেই আমরা রওনা নিলাম যাত্রা পথে। ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা চলে এলাম মাওয়া ফেরী ঘাঁটে। ফেরী পার করে আমাদের কাণ্ডারি আমাদের নিয়ে চললেন আমাদের গন্তব্য পথে। আমারা পৌঁছলাম বাগেরহাট শহরে। সেই সকালে পেটে দানা পানি পড়েছে, এরপর থেকে পেট একদম খালি বললেই চলে আর তাই কোনো কিছু না ভেবেই ঢুকে পড়লাম খাবারের দোকানে।

হাসিমুখে এগিয়ে এসে একজন জিজ্ঞেস করলেন, কি লাগবে। আমি বললাম যা আছে তাই দেন তবে দ্রুত খাবার দিতে হবে। অল্প সময়ের মাঝে খাবার উপস্থিত। ডাল, সবজি আর চিংড়ি মাছ দেয়া হলো আমাদের। বলে রাখা ভালো নারকেল দিয়ে বিভিন্ন সুস্বাদু তরকারী প্রস্তুত হয় বাগেরহাটে, সেগুলো স্বাদের জন্য বিখ্যাত। এছাড়া বাগেরহাট চিংড়ির জন্যেও বিখ্যাত। পেট পূজা শেষ করে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম।


ষাটগম্বুজ মসজিদ

আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। মূল রাস্তার সাথেই ষাটগম্বুজ মসজিদের অবস্থান। আমরা টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। লাল ইটে বাঁধানো পরিচ্ছন্ন যাত্রাপথের দু-পাশে নানা সাইনবোর্ড লাগানো। সেগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলো বাগেরহাটের ঐতিহ্য সংস্কৃতিসহ আরো বহুবিধ তথ্য। সবকিছুর সাথে মিশে থাকা একটি সুপ্রাচীন গাম্ভীর্য আমাদের স্বাগতম জানালো বহু প্রাচীন এক মসজিদ প্রাঙ্গণে। আমরা পদব্রজে এগিয়ে চললাম মসজিদে প্রবেশের আগেই ডানদিকে দেখা পেলাম জাদুঘরের। খান জাহান আলীর বসত ভিটা খননে পাওয়া তার তলোয়ার, প্রকাণ্ড মাটির মাত্র, থালাবাসন, নকশা করা ইটের দেখা পেলাম সেখানে। খান জাহান আলীর মসজিদের বিখ্যাত কুমির কালাপাহাড়ের মৃতদেহকে স্টাফ করে রাখা হয়েছে সেখানে।

আমাদের পদযাত্রায় দেখা পেলাম ঐ এলাকার স্থানীয় বাবুল ভাই এর সাথে। এই ঐতিহাসিক মসজিদটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ষাট গম্বুজ মসজিদের গায়ে কোনও শিলালিপি পাওয়া যায়নি। তবে স্থাপত্য রীতি এবং ইতিহাস থেকে ইতিহাসবিদগণ নিশ্চিত হয়েছেন যে খান জাহান আলিই এর নির্মাতা। খুব যত্ন করে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এতে ব্যবহৃত পাথরগুলো আনা হয়েছিলো রাজমহল থেকে। নির্মাণ কৌশলীতে তুঘলকি আর জৈনপুরী ছাপ স্পষ্ট।

ষাটগম্বুজ মসজিদের নির্মাণশৈলী

বাবুল ভাই এর কথা চলছে আর আমরা এগিয়ে চলছি। মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে অর্থাৎ লম্বায় বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা। আর পূর্ব-পশ্চিমে অর্থাৎ চওড়ায়ও মানানসই, বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট। আর দেয়ালগুলো প্রায় ৮ দশমিক ৫ ফুট পুরু। মসজিদটির পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাব দেখতে পেলাম । মাঝের মিহরাবটি আকারে বড় এবং এতে সুন্দর কারুকাজ রয়েছে। মূল মিহরাবের দক্ষিণে ৫টি ও উত্তরে ৪টি মিহরাব আছে। শুধু মাঝের মিহরাবের ঠিক পরের জায়গাটিতে উত্তর পাশে মিহরাবটি একটি ছোট দরজা দিয়ে প্রতিস্থাপিত। এটি যে একটি দরবার ভবন ছিল দরজাটি তারই প্রমাণ।


ষাটগম্বুজ মসজিদ

ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রবেশ পথ। ছবি : সুমন্ত গুপ্ত


এই দরজা দিয়ে খান জাহান আলী দরবার ভবনে প্রবেশ করতেন। এখানেই দরবার কাজ পরিচালনা করতেন। আবার নামাজের সময় হলে সবাই এখানেই নামাজ সেরে নিতেন। মসজিদের বাকি তিন দিকের দেয়ালে অনেকগুলো করে দরজা রয়েছে। মসজিদটির পূর্ব দেয়ালে রয়েছে ১১টি বিরাট আকারের দরজা। প্রত্যেকটি দরজাই খিলানবিশিষ্ট। এদের মধ্যে মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে বড়। উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে আছে ৭টি করে দরজা। মসজিদের ৪ কোণে ৪টি মিনার আছে। সামনের দুটি মিনারে প্যাঁচানো সিঁড়ি আছে। এই দুটি মিনারের আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। এদের একটির নাম রওশন কোঠা, অপরটির নাম আন্ধার কোঠা। এখান থেকে আজান দেবার ব্যবস্থা ছিল।

আরো পড়ুন : পরিযায়ী পাখির সাথে একটি বিকেল


মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলার আছে। এই পিলারগুলো ধরে রেখেছে মসজিদের ছাদকে। বিশ্ববিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন হারিয়ে যাওয়া যে ১৫টি শহরের তালিকা করেছে তাতে রয়েছে এই শহরের নাম। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর হিসাবে ষাট গম্বুজ মসজিদসহ খানজাহানের স্থাপত্যগুলোকে তালিকাভুক্ত করে।

কিভাবে যাবেন ষাটগম্বুজ মসজিদ :

ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ১০টা এবং সন্ধ্যা ৭ টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত মেঘনা, বনফুল, ফাল্গুনী, আরা, পর্যটক, বলেশ্বর, হামিম ও দোলা পরিবহণের বেশ কিছু বাস ছেড়ে যায়। গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে সোহাগ, সাকুরা, হানিফ ও ঈগল পরিবহণের গাড়ি ছাড়ে। এই বাসগুলোতে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ভাড়া লাগে। বাগেরহাট বাস স্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকা রিকশা ভাড়ায় ষাটগম্বুজ মসজিদে যাওয়া যায়। এছাড়া ঢাকা থেকে খুলনা-গামী আন্তঃনগর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেসে খুলনা এসে সেখান থেকে বাসে বা সিএনজি তে করে করে ষাট গম্বুজ মসজিদ যেতে পারবেন। খুলনা থেকে সময় লাগবে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মত।  

সুমন্ত গুপ্ত    এস এম