রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শান্তিনিকেতন

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন চোখে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের ছোট্ট শহর শান্তিনিকেতনে


শান্তিনিকেতন Shantiniketon

শান্তিনিকেতন ভবন; ছবি : উইকিপিডিয়া


বীরভূমের একটি ছোট শহর শান্তিনিকেতনজুড়ে রয়েছে বিশ্বকবির ছায়া। সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন পশ্চিমবঙ্গের এই রোমান্টিক শহরটিতে। এসব কারণেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের যুগে যুগে আকর্ষণ করে আসছে শান্তিনিকেতন। সময়-সুযোগ মিললে একটা ইন্টেলেকচুয়াল ট্যুর হতেই পারে রবি ঠাকুরের এই স্মৃতিবিজড়িত স্থানে। তবে, শান্তিনিকেতন ভ্রমণের উৎকৃষ্ট সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস। শান্তিনিকেতনের পূর্ব নাম ছিল ভুবনডাঙ্গা।

১৮৬২ সালের দিকে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন নিজের আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য জায়গা খুঁজছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৬৩ সালের দিকে রায়পুরের জমিদারের সহায়তায় এই জায়গায় আশ্রম স্থাপন করেন যার নাম দেয়া হয় শান্তিনিকেতন। পরবর্তীতে ১৯০১ সালের দিকে মাত্র পাঁচজন শিক্ষক এবং পাঁচজন শিক্ষার্থী নিয়ে এখানে পাঠভবন স্থাপন করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যা তৎকালীন প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ধারণাকে ভেঙ্গে দেয়। শান্তিনিকেতনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ক্লাসরুমকে খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে আসা।

শান্তিনিকেতন ভবন

১৮৬৪ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের তৈরি 'শান্তিনিকেতন ভবন' এখানকার সবচেয়ে পুরনো বাড়ি। বাড়ির উপরিভাগে খোদাই করা আছে 'সত্যাত্ম প্রাণারামং মন আনন্দং মহর্ষির প্রিয়' উপনিষদের এই উক্তিটি। শুরুর দিকে এই বাড়ির একতলা তিনি ধ্যানঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন। পরবর্তীতে বিশ্বকবি নিজেও কিছুদিন এই ঘর সপরিবারে থাকার জন্য ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। বাড়িটির সামনে রামকিঙ্কর বেইজ নির্মিত একটি বিমূর্ত ভাস্কর্য রয়েছে। শান্তিনিকেতন ভবনের অদূরে একটি টিলার আকারের মাটির ঢিবি আছে। শোনা যায়, মহর্ষি এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতেন। একসময় এই টিলার নিচে একটি পুকুরও ছিল।
শান্তিনিকেতন Shantiniketon

দেহালি (উপরে বামে) , নতুন বাড়ি (বামে নিচে) এবং উপসনা গৃহ (ডানপাশে), শান্তিনিকেতন; ছবি : উইকিপিডিয়া


উপাসনা মন্দির

১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই উপাসনা মন্দিরে ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসাবে প্রতি বুধবার সকালে উপাসনা হয়। মন্দির গৃহটি রঙ্গিন কাঁচ দিয়ে তৈরি তাই স্থানীয়দের কাছে এটা কাঁচের মন্দির নামেও পরিচিত।

ছাতিমতলা

শোনা যায়, শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার আগে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ছাতিমতলায় কিছুক্ষণ এর জন্য বিশ্রাম করেন এবং এখানে তিনি 'প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি' পেয়েছিলেন। আগের ছাতিম গাছ দুটি মরে যাবার পরে এখানে নতুন আরও দুটি গাছ লাগানো হলেও সেই ছাতিম তলায় এখন জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। যদিও এখনও ৭ই পৌষ সকাল ৭.৩০ ঘটিকায় এখানে উপাসনা হয় ছাতিমতলায়। এছাড়া উদয়ন, কোনার্ক,শ্যামলী, পুনশ্চ এবং উদীচী নামক কয়েকটি ভবন নিয়ে গঠিত হয়েছে উত্তরায়ণ কমপ্লেক্স, যা কালজয়ী বিভিন্ন উপন্যাসের আঁতুড়ঘর।

আরও রয়েছে তালধ্বজ, তিনপাহাড়, শালবীথি, আম্রকুঞ্জ, সন্তোষালয়, ঘণ্টাতলা, শমীন্দ্র পাঠাগার, গৌরপ্রাঙ্গন, সিংহসদন, পূর্ব ও পশ্চিম তোরণ, চৈত্য, দিনান্তিকা, দ্বিজবিরাম, কালোবাড়ি ইত্যাদি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেহালি, যেখানে রবীন্দ্রনাথ মৃনালিনী দেবীর সাথে বাস করতেন; নতুন বাড়ি-রামকিঙ্কর বেইজ ও প্রভাস সেনের শিল্পকীর্তি সম্বলিত মাটির বাড়ি ও  বিচিত্রা-কবিগুরুর ব্যবহৃত পোশাক আসবাবপত্র, বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য ছবির সংগ্রহশালা।

শান্তিনিকেতন Shantiniketon

ঘণ্টা তলা (বামে উপরে), ছাতিম তলা (বামে নিচে)এবং রবিন্দ্রনাথের ভাস্কর্য (ডানে), শান্তিনিকেতন; ছবি : উইকিপিডিয়া


পৌষ উৎসব

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাক্ষ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ স্মরণে এই উৎসব পালন করা হলেও এই অঞ্চলে এটাই প্রধান উৎসব বলে বিবেচিত। উৎসব ও মেলা প্রতি বছর ৭পৌষ থেকে শুরু হয়ে তিনদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

বসন্ত উৎসব

১৯২৫ সালে রবীন্দ্রনাথের সময়েই শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসবের প্রচলন হয়েছিল। সকাল থেকেই যেন উৎসবের আমেজে বেজে ওঠে সেই চেনা গান-‌ 'ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল' অথবা একেবারে শেষ মুহূর্তে–'রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো'। শুরু থেকেই দেশ-‌বিদেশের নানা অতিথির পাশাপাশি উৎসবে সামিল করা হতো আদিবাসীদেরও। সেই প্রথা আজও চলেছে।

খোয়াই

শান্তিনিকেতনের লাল ইটের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে দেখা মিলবে খোয়াইয়ের। যদিও এখানকার কোপাই নদীতে বর্ষা ছাড়া ঠিক নদীর স্বরূপ দেখা যায় না তাও আশেপাশের নাম না জানা সাঁওতালী গ্রামগুলোও কম সুন্দর না।

যেভাবে যাওয়া যাবে

কোলকাতা বা হাওড়ার শিয়ালদা স্টেশন থেকে গণদেবতা এক্সপ্রেস, শিয়ালদা- রামপুরহাট এক্সপ্রেস, শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস বা কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে সরাসরি বোলপুর। সেখান থেকে রিক্সায় শান্তিনিকেতনে যেতে সময় লাগে ১৫-২০ মিনিট।

যেখানে থাকবেন

পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের শান্তিনিকেতন টুরিস্ট লজে ডাবল বেড রুমের ভাড়া ৯০০-২,৫০০ টাকা। আরও কম খরচে থাকতে চাইলে বোলপুর লজে ৩০০-৫০০ টাকায় রুম পাওয়া যায়। তবে উৎসবের মৌসুমে আসতে চাইলে অন্তত তিন মাস আগে থেকে বুকিং করে আসা উচিত। সবশেষে, শান্তিনিকেতন প্রকৃতির সান্নিধ্যে স্থাপিত জায়গা। তাই ঘুরতে এসে এখানকার পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কাজ করা থেকে দূরে থাকতে হবে।

জোহরা মহসীন   এস এম 


Click Here To See More