স্থপতির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপত্য দেখতে মহিষখোলা গ্রামে একদিন
মহিষখোলা গ্রাম মুক্তিযুদ্ধের সময় এই অঞ্চলটি ছিল ১১ নং সেক্টরের ১ নম্বর সাব-সেক্টর

স্যার এর বেশ কিছু স্থাপত্য কর্ম বেশ প্রশংসা অর্জন করেছে। অনেক দিন ধরে প্ল্যান করছি স্যারকে নিয়েই বের হবো তার স্থাপত্য কর্মগুলো দেখতে। কিন্তু স্যার সব সময় ব্যস্ত থাকায় ব্যাটে-বলে মিলছিলো না। অনেক দিন স্যার-এর পেছনে ঘ্যান ঘ্যান করতে করতে স্যার একদিন বিকেলে ফোন দিলেন। স্যারের সাথে বের হবার জন্য দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললাম। স্যারের কথা মতো সকাল সকাল রওনা হতে হবে তাই এর প্রস্তুতি হিসেবে আগের দিন রাতে ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখলাম। পর্দার ফাঁক দিয়ে তির্যকভাবে আলো প্রবেশ করছে। আলোকিত করছে পুরো ঘর। এর মাঝেই ঘড়ি ডেকে উঠলো, সময় হয়েছে এবার ঘুম থেকে উঠার।
রওনা
ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছা করছিল না, শীতের সকালে কাঁথামুড়ি দিয়ে শোবার মজাই আলাদা। তাই আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কি হবে মা আবার কানের সামনে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করলেন। তাড়াতাড়ি ওঠ তুই বুঝি ঘুরতে বের হবি, দেরি করে বের হলে তো কিছুই দেখতে পারবি না । না পারতে ঘুম থেকে উঠতেই হলো আমাকে। উঠে দেখি এর মধ্যে রাজন স্যার কয়েক বার ফোন দিয়ে দিয়েছেন। দ্রুত প্রস্তুতি পর্ব শেষ করে তৈরি হয়ে নিলাম। এদিকে পাইলট মহোদয় ও এসে উপস্থিত বেড়িয়ে পড়লাম আমরা। রাজান স্যার কে তার বাসার থেকে তুললাম। এক স্নিগ্ধ সকালে আমরা এগিয়ে চললাম। জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা , আম্বরখানা পেড়িয়ে এগিয়ে চলছি আমরা। মহাসড়কে সূর্যদেবের আভা পড়েছে তির্যকভাবে। আমরা যাচ্ছি সুনামগঞ্জ জেলার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ভারত-সীমান্ত লাগোয়া ধর্মপাশা উপজেলায় মহিষখোলা গ্রামে সেখানে ঘুমিয়ে আছেন একাত্তরের বীর শহীদেরা।নাস্তা
প্রকৃতির পালা বদলে শীতকাল আসি আসি তাই প্রকৃতির মাঝে চলেছে নতুন ঋতুকে বরণ করে নেবার পালা। আমরা চলছি নতুন গন্তব্যের পানে কিন্তু সেই সকালে বের হয়েছি তাই পেটে দানাপানি পরে নাই। পাগলা বাজারে এসে আমরা নামলাম। ঢুকে পড়লাম দয়াল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। গরম গরম পরটা আর ভাজি দেয়া হলো আমাদের। পেটে অনেক আগেই খিদে লেগেছে তাই পরোটা আর ভাজি খেতে অমৃত লাগছিল। এক নিমিষে সাবাড় করে নিলাম অসাধারণ স্বাদ। পেট পূজা শেষ করে আমরা এগিয়ে চললাম গন্তব্য পানে। ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা এসে পৌঁছলাম সুনামগঞ্জ শহরে। সেখান থেকে আমাদের যেতে হবে তাহিরপুর। প্রায় আড়াইঘন্টা যাত্রা শেষে পেটে চলছে রাম-রাবণের যুদ্ধ, শেষ পর্যন্ত হাজির হলাম সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে অবস্থিত রোজ গার্ডেনে।প্রবেশ করতেই ওয়েটার টেবিলের সামনে এসে হাজির, কি লাগবে? বললাম, পেটে দানাপানি দ্রুত দিতে হবে তাই দ্রুত যা দিতে পারবে তাই দেও। আমাদের অবস্থা দেখে কয়েক মিনিটের ভেতরেই সাদা রুটি আর সবজি নিয়ে হাজির হলো ওয়েটার। আমরাও কালক্ষেপণ না করে শুরু করে দিলাম পেট-পূজা।
টাঙ্গুয়ার হাওর
আমি রাজন স্যারকে বললাম, আর কত পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে। স্যার বললেন, এবার আমাদের পাড়ি দিতে হবে টাঙ্গুয়ার হাওরকে, সময় প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগবে। আমি মনে মনে খুশিই হলাম, টাঙ্গুয়ার হাওরের রূপ অবলোকন করতে পারব। যদিও প্রায় চার ঘণ্টা ধরে যাত্রা পথে আছি। এর পরেও নতুন গন্তব্য পথের যাবার আনন্দে সব কিছু তুচ্ছ মনে হলো। রাজন স্যার বললেন, কীভাবে পাড়ি দিবে টাঙ্গুয়ার হাওর? ইঞ্জিন নৌকায় নাকি স্পিডবোটে। আমি ভাবলাম স্পিডবোটে গেলেতো টাঙ্গুয়ার রূপ ভালোভাবে দেখতে পারবো না, তারচেয়ে ইঞ্জিন নৌকা করে যাওয়া ভালো। যেই ভাবা সেই কাজ আমরা চেপে বসলাম ইঞ্জিন নৌকায়। টাঙ্গুয়ার ঢেউ-এর তালে তালে আমরা এগিয়ে চলছি। নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন ধারা আমাদের মোহিত করছে। আমি এই সুযোগে প্রাণভরে ছবি তুলতে লাগলাম।মহিষখোলা গ্রাম
দেখতে দেখতে কীভাবে যে আড়াইঘন্টা পেড়িয়ে গেলো টেরি পেলাম না। আমরা এসে পৌঁছলাম ধর্মপাশা উপজেলার মধ্য নগর গ্রামে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল রাজন স্যার-এর সহচর সোহাগ আর মুনিম। আমরা চেপে বসলাম দুই চাকার বাহনে। এখান থেকে মহিষখোলা গ্রামের দূরত্ব দশ মিনিটের রাস্তা। তবে গন্তব্যে পৌছার একমাত্র বাহন দুই চাকার যান্ত্রিক বাহন। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে মহিষখোলা গ্রামে।মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
শান্ত নীরব পরিবেশ যেখানে ঘাস ফড়িং মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায় এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আমরা এগিয়ে চললাম মহিষখোলা নদীর পূর্বপাড় ঘেঁষে একখানা প্রায় নিশ্চিহ্ন টিনের ঘর যার অস্তিত্ব সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেও কল্পনায় তার পূর্ণরূপ দেখা কল্পনাবিলাসীদের জন্যও হয়তো দুরূহ হবে এবং তার আশপাশখানা ৪২ বছর ধরে মনুষ্য-স্পর্শহীন হওয়ায় প্রকৃতির লীলাক্ষেত্র অর্থাৎ জঙ্গলাকীর্ণ। সেই ঘরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নিতেন। পাক হানাদারদের মাঝেসাঝে ধরে নিয়ে বন্দী করেও রাখতেন। মুক্তিযুদ্ধেও সময় এই অঞ্চলটি ছিল ১১ নং সেক্টরের ১ নম্বর সাব-সেক্টর। পশ্চিমে গা ঘেঁষে মহিষখোলা নদী, উত্তরে ২০০ গজের মধ্যেই ভারত সীমান্তে মেঘালয়ের পর্বতমালা, পূর্বে সংখ্যাতীত খাল-বিল আর সুবিশাল টাঙ্গুয়ার হাওড়। এই হাওড়ের সঙ্গে রাগে-অনুরাগে জড়িয়ে আছে আরেকটি স্নিগ্ধ নদী জাদুকাটা।
একাত্তরের শহীদ
এখানেই শায়িত আছেন একাত্তরের শহীদ হওয়া বীর প্রাণ। পূর্ব-পশ্চিম অক্ষ বরাবর সমান্তরাল দুটি সুউচ্চ দেয়াল ন'ফুট বেদীর উপর এসে দাঁড়ায়, তার ওপর ছায়া হয়ে ছাদ এসে বসে। সিঁড়ি ভেঙ্গে পূর্বদিকের প্রবেশ বিন্দুতে চোখ রাখলে পশ্চিমের নদী আর তার গায়ে-এসে-পড়া আকাশ দেখা যায়। পূর্ব-পশ্চিম উন্মুক্ত হওয়ায় দুই দেয়ালের ঘর রচিত হয়ে যায়। উত্তর-দক্ষিণের ২৭ ফুট উঁচু দেয়ালে (দেড় ফুট পুরু) ব্যাকরণ ভেঙ্গে অনেকগুলো ছোট-বড় জানালা আড়াল খুলে আলোর উৎস হয়ে উঠে। ঠিক চোখ-মেলে-তাকানোর মতো। 'যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ' , তারা তো বদ্ধ ঘরে থাকে না, যে ঘরে দোর-জানালায় অর্গল টানা, যে ঘরে আলোর ঝলক নেই, দোলা নেই, সে ঘরে স্বাধীনতা প্রবেশ করে না।সেই ঘর অন্ধকারের অধীন। তাই 'সব কয়টা জানালা'ই খুলে আছে। জানালা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য অংশ, যার ব্যবহারিক ও মনস্তাত্ত্বিক মূল্য অতুলনীয়। এটি আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়ের মতো। চোখ দিয়ে যেমন আমাদের দেহ-ঘরে আলো প্রবেশ করে, আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতা চোখ দিয়ে হয় ('জ্ঞান চক্ষু'), তেমনই দেয়ালকে মুক্তি দেয় জানালা। তবেই দেয়ালের চোখ ফুটে আলো-বাতাস প্রবেশ করে গৃহে প্রাণের সঞ্চার হয়। এজন্যই 'খোলা জানালা' আর 'স্বাধীনতার চেতনা' সমার্থক হয়ে উঠেছে।
বেদীর তিন দিক ঘিরে রয়েছে পানির আধার যা পশ্চিমে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। প্রতি বর্ষাতেই মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল নামলে নদী উপচে বেদীর তলায় কিছুক্ষণের জন্য হাঁটু জল জমে যায়। এটা হাওড় অঞ্চলের চেনা দৃশ্য। এভাবেই হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে
'সব ক’টা জানালা’ খুলে আমাদের ডাকছে ওরা, ‘যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ'।
যাবেন যেভাবে :
ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ যাবার সরাসরি বাস রয়েছে। এনা, হানিফ, শ্যামলী, ইউনিকসহ অনেক বাস এই পথে চলে। তবে অবশ্যই অগ্রিম টিকিট কেটে রাখুন। তাহলে ঝামেলা পোহাতে হবে না। সুনামগঞ্জ শহরে এসে এম এ খান সেতুর থেকে পাবেন মোটরবাইক অথবা গাড়ি নিয়ে চলে যান তাহিরপুর বাজার। সেখান থেকে নৌকা করে চলে যান মধ্যনগর গ্রামে। মধ্যনগর থেকে মহিষখোলা গ্রাম দশ মিনিটের রাস্তা। দলবেঁধে ঘুরতে গেলেই বেশি আনন্দ করতে পারবেন।সুমন্ত গুপ্ত এস এম