মথুরাপুর দেউল মঠ : চারশত বছর ধরে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে টিকে আছে

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত ফরিদপুরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মথুরাপুর দেউল মঠ


মথুরাপুর দেউল মঠ -

প্রায় ৯০ ফুট উচ্চতার দেউলটি কয়েকশ বছর পরেও ইতিহাসের অজানা অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; ছবি : কালের কন্ঠ


চারশত বছরের পুরনো নান্দনিক পুরাকীর্তি মথুরাপুর দেউল মঠ ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার গাজনা ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামে অবস্থিত। শুধুমাত্র ধর্মীয় স্থান হিসেবেই নয়, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবেও মঠটি দেখতে ভিড় জমায় অসংখ্য পর্যটক। ঠিক কোনসময়ে মঠটি নির্মাণ করা হয়েছিল তা আজ আর নির্ভুলভাবে জানা যায় না। তবে, স্থাপত্যশৈলী ও এর দেয়ালে আঁকা নমুনা থেকে মনে করা হয় সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মাণ করা হয়েছিল এই মঠটি।

অবস্থান

ফরিদপুর জেলা থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং মধুখালী উপজেলা থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার উত্তরে মথুরাপুর দেউল মঠটি অবস্থিত। নির্মাণ কালের মতোই কে এই মঠ নির্মাণ করেছে সে নিয়েও আছে সন্দেহ। বলা হয়ে থাকে, সম্রাট আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ রাজা প্রতাপাদিত্যকে হারিয়ে ১৬৩৬ সালে এই মঠের প্রতিষ্ঠা করেন। তবে, ইতিহাস বলে ঘটনাটি সঠিক নয়।

ইতিহাস

১৬১২ সালে রাজা প্রতাপাদিত্যের সাথে এনায়েত খানের যুদ্ধ হয়। এনায়েত খান ছিলেন সুবেদার ইসলাম খানের ভাই। যুদ্ধে প্রতাপাদিত্য পরাজিত হন এবং তাকে দিল্লীতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই থেকে বোঝা যায় যে, মঠটি প্রতাপাদিত্য তৈরি করেননি। অন্যদিকে মানসিংহ ১৬০৬ সালে এই স্থান ত্যাগ করেন। এর মানে তিনিও এই মঠ প্রতিষ্ঠা করেননি। মঠটি নিয়ে যশোর ও ফরিদপুরের স্থানীয়দের মতে সংগ্রাম সিংহ নামক একজন ফৌজদার মথুরাপুর দেউল নির্মাণ করেন। দেউলটি উচ্চতায় প্রায় ৯০ ফুটের কাছাকাছি।

১২ কোণবিশিষ্ট মঠটি নিজস্ব শৈল্পিক গুণে অনন্য। এতগুলো কোণ থাকায় ওপর থেকে দেখলে মনে হবে যেন দিনের আলোয় তারা ফুটে আছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মঠটি আরও উঁচু ছিল, কালের বিবর্তনে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে বর্তমান আকৃতিতে এসে দাঁড়িয়েছে। টেরাকোটার চমৎকার কারুকার্য দেখা যায় মঠটির দেয়ালে। মঠের গায়ে মাটির ফলকে তৈরি বিভিন্ন মূর্তি তীর্থযাত্রীসহ পর্যটকদের নজর কাড়ে। রামায়ণ, মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্র, বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, প্যাঁচা, হনুমান, ঘোড়াসহ আরও নানারকমের মূর্তি রয়েছে মঠের গায়ে।

মথুরাপুর দেউল মঠ -

মঠটির দেয়ালে টেরাকোটার কারুকার্যে বিভিন্ন ডিজাইন এবং প্রাণীর ছবি পরিলক্ষিত হয়; ছবি : সংগৃহীত


বিভিন্ন শিলাখন্ডের ছাপ রয়েছে মঠটিতে। মঠের ভেতরে একটি ছোট কক্ষ রয়েছে, ধারণা করা হয় এখানেই প্রার্থনা করা হতো। কক্ষটির দুটি প্রবেশমুখ রয়েছে, একটি দক্ষিণ দিকে অন্যটি পশ্চিম দিকে। প্রবেশপথটির মুখ কিছুটা নিচু ও খাঁজ কাঁটা। স্থাপনাটি মূলত চুন ও সুরকি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। দেউলটির বাইরের দেয়াল ইট দিয়ে খাড়াখাড়িভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে আলোছায়ার খেলায় দেউলটি নতুন চেহারায় হাজির হয় সকলের সামনে। মঠটিতে পুরো স্থাপনাজুড়ে টেরাকোটার নকশা ও জ্যামিতির সুনিপুণ ব্যবহার করা হয়েছে। দেউলটি বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে একটি সুরক্ষিত সম্পদ।

যেখানে থাকবেন :

ফরিদপুরে পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন হোটেলের ব্যবস্থা রয়েছে। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই রয়েছে হোটেলগুলো। ৮০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকার ভেতরে আপনার পছন্দমতো রুম পেয়ে যাবেন। তাছাড়া রয়েছে সার্কিট হাউজ। কিন্তু সার্কিট হাউজে থাকতে হলে আপনাকে আগে থেকেই অনুমতি নিয়ে নিতে হবে।

যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে বাসে করে ফরিদপুর গিয়ে সেখান থেকে আরেকটি বাসে করে মধুখালি যাওয়া যাবে। মধুখালি থেকে রিকসায় মথুরাপুর দেউল যাওয়া যায়।

ইন্দিরা বিশ্বাস   এস এম

তথ্যসূত্র https://www.kalerkantho.com/print-edition/education/2017/11/26/570172


Click Here To See More