ইটনা শাহী মসজিদ : মোঘল স্থাপত্যরীতির এক অনুপম নিদর্শন

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : হাওর অঞ্চল কিশোরগঞ্জের অনন্য নিদর্শন এই মসজিদ

কারুকার্যখচিত মসজিদের প্রবেশ পথ। ছবি : মাইলস্ টু গো বিফোর আই স্লিপ[

বিস্তীর্ণ এই অংশ বেশ অনেকটা সময়জুড়ে মোঘল সম্রাজ্যের শাসনাধীন ছিল। বিভিন্ন মোঘল বাদশাগণ হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকা শাসন করে গেছেন। তাদের সেই শাসনামলে এই পুরা অঞ্চলজুড়ে নির্মিত হয়েছে মোঘল স্থাপত্যরীতির অসংখ্য মসজিদ, দুর্গ, কেল্লা এবং প্রাসাদ। মোঘলদের হারিয়ে যাওয়া আধিপত্যের সাথে সাথে সেইসব স্থাপনার অনেকগুলোও হারিয়ে গিয়েছে। তারপরও সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কিছু স্থাপনাটিকে আছে আমাদেরকে সেই সময়ের গল্পগুলো বলার জন্যে। সেগুলোর মধ্যেই একটা স্থাপনার কথা বলা হবে আজ। বিস্তীর্ণ হাওড় পরিবেষ্টিত এক এলাকা কিশোরগঞ্জ। চারিদিকে পানিবেষ্টিত এই কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার বড়হাটি সদরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক প্রাচীন মসজিদ।

পর্যটকদের নিকট এটি 'ইটনা শাহী মসজিদ' নামে পরিচিত হলেও স্থানীয়দের মধ্যে এর নাম নিয়ে রয়েছে দ্বিমত। কারও মতে 'তিন গম্বুজ মসজিদ' আবার কারও মতে এর নাম 'গায়েবী মসজিদ'। আনুমানিক ১৬ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই অঞ্চলে মোঘল আধিপত্য বিনষ্ট হওয়ার পরে মজলিশ দেলোয়ার এই হাওড় অঞ্চলে তার প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মজলিশ দেলোয়ার ছিলেন বার ভুইয়াদের মধ্যে অন্যতম ঈসা খাঁর একজন সভাসদ। সেই আমলে একই সাথে এটি মসজিদ এবং তার জমিদারির  প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যাবহার করা হত। itna-shahi-mosjid ইটনা শাহী মসজিদ, কিশোরগঞ্জ। ছবি : ভ্রমণ গাইড


 পরবর্তীতে ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা পুনরায় মোঘল সম্রাজ্যের অধীনে চলে গেলে মজলিশ দেলোয়ারের জমিদারি এবং সেই সাথে মসজিদ হাতছাড়া হয়ে যায়। দীর্ঘকাল পরে মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে মজলিশ দেলোয়ারের দুই দৌহিত্র ফতেহ খান এবং জালাল খান ১৯ কোষা নজরানার বিনিময়ে শাহী ফরমান অনুযায়ী তৎকালীন জয়নশাহী পরগণা তথা বর্তমান ইটনার দেওয়ানী লাভ করেন এবং একই সাথে মসজিদের দখলও ফিরে পান। বংশানুক্রমে উনিশ শতকের শেষ অবধি এই দেওয়ানী টিকে ছিল। বর্তমানে তাদের বংশধরেরা থাকলেও মসজিদটির সংরক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের উপরে। মসজিদটি নির্মিত হয়েছে অনুপম মোঘল স্থাপত্যরীতিকে অনুসরণ করে।

তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি একটি বেদির উপরে অবস্থিত। মসজিদে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ, যার মধ্যে মাঝেরটি প্রধান, এবং ভেতরে রয়েছে তিনটি মেহরাব। মসজিদটি দৈর্ঘ্যে ২৪ মিটার লম্বা, প্রস্থ্যে সাড়ে ৯ মিটার প্রশস্ত এবং কার্নিশ পর্যন্ত এর উচ্চতা ৬ মিটার। মসজিদের দেওয়াল গলি প্রায় ২ মিটার সমান চওড়া। মূল মসজিদের সামনে রয়েছে ১৩ মিটার প্রশস্ত একটি খোলা বারান্দা। বারান্দা এবং মসজিদের প্রবেশের জন্যে রয়েছে দুটি তোরণ। মসজিদের সাথেই রয়েছে এক বিশাল দীঘি। মূল কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে মসজিদটিতে বেশ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদটির পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে মোঘল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ যা এটিকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। মোটা থাম, প্রশস্ত খিলান আর গোলাকার গম্বুজ যেন সেই আমলের ই প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে যুগের পর যুগ ধরে।

itna shahi mosque মসজিদের সামনে অবস্থিত প্রশস্ত বারান্দা। ছবি : ভি ওয়াই ম্যাপস্

কালের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকা এই মসজিদ এখনও মুখরিত হয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের পদচারণায়। জুম্মা কিংবা ঈদের সময় এখনও মানুষে গমগম করে এই এলাকা। মুয়াজ্জিনের আজানের সুর এখনও ভেসে যায় বিস্তীর্ণ হাওরের উপর দিয়ে, মানুষকে বলে নামাজের দিকে আসতে, বলে কল্যাণের দিকে আসতে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে আপনিও দেখে আসতে পারেন এই গায়েবী মসজিদ, যে ধর্মেরই হোন না কেন, সৃষ্টিকর্তার দরজা সবসময়েই খোলা তার সৃষ্টির জন্যে। আর এই মসজিদের সাথে সাথে ঘুরে আসতে পারবেন ইটনা হাওড়, জমিদার গুরুদয়াল সরকারের বাসভবন, বিখ্যাত আনন্দমোহন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আনন্দমোহন বসুর বাসভবন ইত্যাদি স্থাপনা।

কিভাবে যাবেন : ইটনা শাহী মসজিদে যেতে হলে আপনাকে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে আসতে হবে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে। ঢাকার গোলাপবাগ, সায়েদাবাদ এবং মহাখালী থেকে বিআরটিসি, অনন্যা, অনন্যা ক্লাসিক, জলসিড়ি, যাতায়াত ইত্যাদি পরিবহনের এসি/নন-এসি বাস কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মানভেদে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের ভাড়া ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। সময় লাগবে আড়াই থেকে ৩ ঘন্টা। বাস থেকে নেমে আপনাকে ইজিবাইক অথবা রিকশায় আসতে হবে শহরের একরামপুর মোড়ে। একরামপুর মোড় থেকে সিএনজি অথবা মাহিন্দ্রাতে করে আপনাকে যেতে হবে চামটাঘাট। একরামপুর থেকে চামটাঘাটের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার, ভাড়া নিবে ৪০-৫০ টাকা। চামটাঘাট থেকে ইটনাগামী ট্রলারে উঠতে পারবেন। সময় লাগবে ২ ঘন্টা, লোকাল ভাড়া জনপ্রতি ৫০ টাকা। ইটনা ঘাট থেকে মসজিদে পায়ে হেটে অথবা রিকশায় করে পৌঁছাতে পারবেন। এছাড়া ঢাকা থেকে ট্রেনেও আসতে পারবেন কিশোরগঞ্জ। কমলাপুর অথবা বিমানবন্দর রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসে উঠে নামতে পারবেন কিশোরগঞ্জে। স্টেশন থেকে মাত্র ৫ টাকা অটোরিকশাভাড়া দিয়ে পৌঁছাতে পারবেন শহরের একরামপুর মোড়ে। এরপর উপরোল্লেখিত উপায়ে যেতে পারবেন ইটনা শাহী মসজিদে।   


তথ্যসূত্র : mailto:https://blog.gobanglaholidays.com.bd/2020/04/28/%E0%A6%87%E0%A6%9F%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%B9%E0%A7%80-%E0%A6%AE%E0%A6%B8%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A6%A6-%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%B6%E0%A7%8B%E0%A6%B0%E0%A6%97%E0%A6%9E%E0%A7%8D/ mailto:https://www.youtube.com/watch?v=yadlTXRP5bE