রসনামৃত : পুরান ঢাকার বাকরখানি ও ইতিহাস বৃত্তান্ত
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মির্জা আগা মুহাম্মদের নাম অনুসারেই 'বাকরখানি'র নামকরণ হয়

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের পুরানো সে গান ইঙ্গিত দেয় এক সময়ের বাকরখানির জনপ্রিয়তা। এক সময় আলু, ছোলার মতো নিত্য খাবার ছিল এই বাকরখানি। এই ময়দা জাতীয় রুটি এক সময় ছিল পুরান ঢাকাবাসীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নাস্তা। আদিকাল থেকেই ঢাকাবাসী খাদ্য রসিক ও ভোজন বিলাসী। পুরান ঢাকাবাসীদের মতো ভোজন বিলাসী বাঙ্গালির জুড়ি মেলা ভার। এ খাবার ছিল সর্বজনবিদিত। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর মাঝে বাকরখানি অন্যতম। লালবাগে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বাকরখানি বিক্রয় শুরু হলেও এর বিস্তার হয় সারা দেশে।'আলু বেচো,ছোলা বেচো, বেচো বাকরখানি, বেচোনা, বোচোনা বন্ধু তোমার চোখের মনি।'
আরও পড়ুন : পুরান ঢাকা : মজাদার সব খাবারের সম্ভার
বাকরখানি নামের ইতিহাস
বাকরখানি নামকরণ নিয়ে যে জনশ্রুতি প্রচলিত আছে তা এক করুন ইতিহাস। আঠার শতকের মাঝামাঝি সময়, তখন ভারতবর্ষেজুড়ে মুঘলদের প্রচণ্ড আধিপত্য। মুঘলদের দাপট বিস্তৃত হয়েছিল এই বাংলাতেও। তৎকালে বাংলাদেশের বরিশাল জেলার প্রধান পরগনার জমিদার ছিলেন-মির্জা আগা মুহাম্মদ বাকের। জনশ্রুতি মতে, এই মির্জা আগা মুহাম্মদের নাম অনুসারেই 'বাকরখানি'র নামকরণ হয়েছে। এই আগা বাকের ছিলেন বিখ্যাত নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর দত্তক পুত্র।
তিনি একদিকে ছিলেন যুদ্ধ বিদ্যায় বেশ পারদর্শী অন্যদিকে প্রচণ্ড মেধাবীও। যুবক বয়সে তিনি মুর্শিদাবাদের খনি বেগম নামে এক নর্তকীর নাচ দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়েন। খনি বেগমও আগা খার মেধা ও যোগ্যতা দেখে দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু এ প্রেমের বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় উজির পুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খান। সেও ভালোবাসতো খনি বেগম নামের সুন্দরী নর্তকীকে। খনি বেগম তাকে প্রত্যাখ্যান করায় সে অপমানিত বোধ করল। অপমানের প্রতিশোধ হিসেবে ক্ষতি করার চেষ্টা করল খনি বেগমকে। আর সে খবর আসলো আগা বাকেরের কানে। কাল বিলম্ব না করে তলোয়ার উঁচিয়ে যাত্রা করল খনি বেগমকে বাঁচাতে। আগা বাকেরকে বাঁধা দেয় জয়নাল খান, সেও প্রস্তুত তলোয়ারের যুদ্ধের জন্য।

কিন্তু সাহসী আগা বাকের উল্টো বাঘটিকে হত্যা করে পালিয়ে অবাক করে দেয় সবাইকে। ইতোমধ্যে জয়নাল খানের মিথ্যা নাটক ফাঁস হয়ে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে ধূর্ত জয়নাল খাঁ নতুন কৌশল করে, সে খনি বেগমকে আটক করে নিয়ে যায় দক্ষিণ বাংলায়। সে খবরও আসে আগা বাকেরের কানে।কাল বিলম্ব না করে তিনি যাত্রা করে দক্ষিণ বাংলায় খনি বেগমকে উদ্ধার করতে। আগা বাকরকে অনুসরণ করে পিছু পিছু যাত্রা করে উজির জাহান্দার খান স্বয়ং।
আরও পড়ুন : পুরান ঢাকায় নিরামিষ খাবারের রেস্তোরাঁ
যুদ্ধ শুরু হয় আগা বাকের ও জয়নাল খানের মধ্যে। ছেলে জয়নাল খান যখন আগা বাকেরকে হত্যার চেষ্টা করছে ঠিক তখন উজির নিজে আঘাত করেন তরবারি দিয়ে সন্তানকে হত্যার উদ্দেশ্যে। আহত জয়নাল খান উপায়ন্তর না দেখে জীবনের শেষ হিংস্রতম অপরাধটি করে-হত্যা করে খানি বেগমকে তার পর পর মারা যায় সে নিজেও। পরবর্তীতে বাকেরগঞ্জে সমাহিত করা হয় খনি বেগমকে। আগা বাকের প্রচণ্ড কষ্টে সব কিছু ছেড়ে চলে আসেন দক্ষিণ বঙ্গে-প্রিয়তমার সমাধির কাছে।
বাকি জীবন তিনি সেখানেই কাটান। আগা বাকেরের নামানুসারে বাকর-চন্দ্রদ্বীপ (পটুয়াখালী -বরিশাল) অঞ্চলের নাম রাখা হয় বাকেরগঞ্জ। ঐতিহ্যবাহী বাকরখানির রুটি নামের পেছনেও রয়েছে বাকের-খনির প্রেমের ইতিহাস। খনি এবং বাকেরকে যাতে মানুষ যুগ যুগ ধরে মনে রাখে তার জন্য নতুন এক রুটির নাম করন করেন আর তার নাম দেন- 'বাকের-খনি',যা পরবর্তীতে পরিবর্তন হয়ে হয়-'বাকরখানি'।

প্রকারভেদ ঊনিশশত চল্লিশ সালে প্রকাশিত 'হাকিম হাবিবুর রহমান' তার 'Dhaka Pachash Barsh Pahley' গ্রন্থে বাকরখানি সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি প্রধানত তিন ধরনের বাকরখানির কথা বলেন- গও জোবান, শুকি এবং নিম শুকি। চিনশুখি রুটিও এক প্রকার বাকরখানি যা বিশেষত চিনি দ্বারা তৈরি। কাইচারুটি এবং মুলামও এক ধরনের বাকরখানি। হালুয়া দ্বারা তৈরি আরেকটি বাকরখানি হলো-পনির বাকর, এর বিশেষত হলো এতে ঘি ও গম বা সুজির পরিবর্তে হালুয়া ব্যবহার করা হয়। বাকরখানি পুরানো ঢাকার প্রথাতে মিশে আছে। বিবাহের উৎসবে কনের বাড়ি থেকে কিচমিচ,কাঠ বাদাম, দুধ দিয়ে তৈরি ডানার করে পাঠানো হয় ভিনারুটি নামের এক বাকরখানি।
আরও পড়ুন : পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং : সুমন্ত গুপ্তের ভ্রমণ গল্প
বাকর খনির প্রসিদ্ধ দোকান পুরান ঢাকার বাকরখানিতে পাওয়া পুরান ঢাকাতেই। পুরান ঢাকার চাঁনখারপুল পার হয়ে নাজিমুদ্দিন রোডের দু-পাশে পার পর অনেকগুলো দোকান আছে।তাছাড়া লক্ষ্মীবাজার, লালবাগ, তাঁতিবাজার রয়েছে বাকরখানির দোকানগুলো।
রেসিপি বহু পুরানো খাবার হওয়ায় এর রেসিপিও ভিন্ন ভিন্ন। নানা ভাবে তৈরি করা যায় বলে উপাদানে যেমন ভিন্নতা রয়েছে আবার রন্ধন প্রণালীতেও আছে বৈচিত্র্যতা।
উপকরণ : ময়দা - এক কাপ। লবণ - আধা চা চামচ কিংবা স্বাদ মতো সয়াবিন তেল - প্রয়োজন মতো ডালডা/ভেজিটেবল সর্টেনিং/ঘি - ১/৪ কাপ

এভাবে আরও এক লেয়ারে তেলের মিশ্রণ ও ময়দা ছড়িয়ে দিন। এবার রুটি মাঝ বরাবর ভাঁজ করুন। এক কোনার সঙ্গে আরেক কোনা মিশিয়ে মাঝ বরাবর ভেঙ্গে ভাঁজ করতে হবে। ভাঁজ করার পর অর্ধেক চাঁদের মতো দেখতে হবে রুটিটি। আগের মতো প্রথমে তেল ও ময়দা ছিটিয়ে নিন ভাঁজ করা রুটির উপর।দুই লেয়ারের ময়দা ও তেল দিতে হবে। এবার নিচ থেকে দুই কোনা টেনে মাঝে নিয়ে আসুন। মাঝের ফাঁকা অংশটি টেলে লাগিয়ে দিন, আবারো তেলের মিশ্রণ ও ময়দা দিন দুই লেয়ারে। শেষ ভাঁজটি করুন তিনটি দিক থেকে কোনা টেনে মাঝে নিয়ে এসে। উপরের অংশ থেকে ভাঁজ করে রোল করে নিন।
আরও পড়ুন : পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী হাজির বিরিয়ানি
এবার ছোট ছোট করে লেচি কেটে নিন রোল থেকে। লেচি কাটাট পর চারপাশ থেকে অগোছালো অংশগুলো টেনে ভিতরে নিয়ে আসুন। একদিকে আনবেন। খেয়াল রাখবেন একটি অংশ যেন মসৃণ হয় লেচি সামান্য বেলে নিন। খুব বেশি মোটা বা পাতলা করবেন না। ছুরির সাহায্যে কয়েকটি দাগ কেটপ নিন উপরে। বেকিল ট্রেতে একটি একটি করে বাকর খানি রাখুন। সামান্য ফাঁক করবেন যেন একটির সাথে আরেকটি না লাগে। ৩৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে প্রি হিট করুন ও ওভেনে ৩০ মিনিট বেক করুন।
চুলায় তৈরি করতে চাইলে একটি হাড়িতে পর্যাপ্ত পরিমাণ বালি কিংবা লবণ মিশিয়ে মাঝে স্ট্যান্ড দিয়ে বসিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে দশ মিনিট ঢেকে হাড়ি গরম করুন। গরম হাড়ির মধ্যে বাকরখানি দিয়ে দিন একটি পাত্রে। একদম কম আঁচে ৩৫ মিনিট রেখে দিন। তৈরি হয়ে যাবে মজাদার খাবার বাকর খনি। বাকরখানি মিশে আছে পুরানো ঢাকা ঐতিহ্যের পরতে পরতে। এ বাকরখানিই হয়ে উঠেছিলো একসময় বিয়ে, উৎসব আর সকালের নাস্তার এক অপরিহার্য জনপ্রিয় খাবার আর নানা প্রথার অংশ। বাকরখানির সে কদর আর জনপ্রিয়তা কালের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন আধুনিক ও বিদেশি খাবারের আড়ালে।
সজীব মাহমুদ এস এম
(তথ্যসূত্র : কালের কণ্ঠ ( ১৭মে,২০১৭),উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া,প্রিয় ডট কম (১১ আগস্ট, ২০১৪),জাগো নিউজ২৪ ডটকম (৭জুন,২০১৫),দৈনিক অধিকার(৭মে,২০১৯), লেখক ইতিহাসবিদ মুসতাসীর মামুনের বই-ঢাকাঃস্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী(২০০৬),লেখক হাবিবুর রহমানের গ্রন্থ-Dhaka Pachash Barsh Paheley)।