বাঙালি জাতির বৈচিত্র্যময় পোশাকের ইতিহাস

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : এককালে হিন্দুু ও মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষ ধুতি পরিধান করত

গুপ্ত যুগে বাংলার নারীদের পোশাক। ছবি : সংগৃহীত

একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং বৈশিষ্ট্য তার পোশাকের মাধ্যমে ফুটে উঠে। শুধু ব্যক্তিত্ব প্রকাশের ক্ষেত্রেই নয়, পোশাকের ক্ষেত্রে মানুষের সংস্কৃতি এবং আবহাওয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পোশাকের সাথে বাংলার মানুষের সম্পর্ক বহু আগের। প্রাচীন গুহাবাসী মানুষ থেকে আজকের আধুনিক মানুষ সবার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পোশাক। আবহাওয়া এবং সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে এদেশের মানুষের পোশাকের সাথে এসেছে নানা পরিবর্তন। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর এসেছে তাদের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য। শাসকদের রুচিবোধ এবং ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে পোশাকের সাথে সবসময় জড়িত ছিল। পূর্বের মানুষের পোশাকের সাথে বর্তমান সময়ের মানুষের পোশাকের মধ্যে রয়েছে বিশাল পার্থক্য। প্রাচীনকালের যেসকল ভাস্কর্য এবং মূর্তি পাওয়া গিয়েছে, সেই সাথে যেসব পোড়ামাটির ফলক পাওয়া গেছে তা থেকে বুঝতে পারা যায় এদেশের মানুষ আগে শুধুমাত্র লজ্জা নিবারণের জন্য পোশাক ব্যবহার করত। তখনকার সময়ে নারী এবং পুরুষের পোশাকের মধ্যে তেমন বেশি কোনো পার্থক্য ছিল না।

বর্তমান সময়ে পাঞ্জাবি এবং শাড়ি পরিহিত পুরুষ এবং নারী। ছবি : সংগৃহীত

 নারীদের ক্ষেত্রে যে পোশাক সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হতো তা হচ্ছে শাড়ি এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে যে পোশাকটি সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হতো তা হলো ধুতি। নারীরা শাড়ি পড়তেন পায়ের কব্জি পর্যন্ত। অভিজাত শ্রেণীর পুরুষরা অনেকটা নিচ পর্যন্ত ধুতি পড়তেন কিন্তু সাধারণ মানুষেরা অনেকটা খাটো করেই ধুতি পরিধান করতেন। বিভিন্ন উৎসব এবং আয়োজনে নারীরা কখনও কখনও অলংকার পরিধান করতেন এবং সাথে ওড়না পরতেন। বাংলায় সেন বংশের শাসনামলে অলংকার পরার বিষয়টি বেশি দেখা যায়। ইন্দো-মুসলিম শাসনামলে পোশাকের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তখন একপ্রস্থ কাপড়ের বদলে উপরে এবং নিচে তিনটি কাপড় পরিধান করার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়।

কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে এত কাপড় ক্রয় করা সম্ভব ছিল না তাই তারা আগের ধুতি কাপড় ব্যবহার করত। এছাড়া তখন পাগড়ি পরার প্রচলন শুরু হয়েছিল। মুসলমানদের শাসনামলের পর যখন ইংরেজরা বাংলা শাসনের করতে আসলো তখন বাঙালিরা সাথে সাথে ইংরেজদের পোশাক গ্রহণ করতে পারেনি। বলা চলে, প্রথমদিকে কেউই তা গ্রহণ করতে পারেনি। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে অভিজাত শ্রেণীদের মধ্যে ইংরেজদের পোশাক গ্রহণ করার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। ইংরেজরা আসার পরও বহু বছর যাবত হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মাবলম্বীরা মোঘলদের পোশাক পরিধান করতেন। পরবর্তীকালে নবাবী আমলে নতুন করে ঘড়ি এবং চেইন পরিধান করার বিষয়টি দেখতে পাওয়া যায়। তখন বিভিন্ন কলেজে ইংরেজদের পোশাক পরার বিষয়টি আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে। তবে ইংরেজদের পোশাকের বিষয়টি শুধুমাত্র কলেজে এবং অভিজাত শ্রেণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, সাধারণ মানুষের মধ্যে নয়। সাধারণ মানুষেরা তখনও ধুতি-পাঞ্জাবি, চাদর, লুঙ্গি ইত্যাদি পরিধান করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। হিন্দু ও মুসলমানের তখন কোনও আলাদাভাবে পোশাক ছিল না।

ধুতি পরিহিত বিভিন্ন পুরুষ। ছবি : সংগৃহীত

অভিজাতদের পোশাকে যতটা প্রবলভাবে ব্রিটিশদের ছোঁয়া লেগেছিল, সাধারণ মানুষদের মধ্যে কিন্তু ততটা প্রবলভাবে লাগেনি। সাধারণ মানুষেরা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে তখনও ধুতি, পাঞ্জাবি, চাদর, লুঙ্গি ইত্যাদি পোশাক পরতেন। হিন্দু-মুসলমান সবাই ধুতি পরতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কিছু কট্টরপন্থীদের প্রভাবে ধুতিকে 'হিন্দুয়ানী পোশাক' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর দেশভাগের পর ব্যাপকভাবে লুঙ্গির প্রচলন দেখতে পাওয়া যায়। আস্তে আস্তে ধুতি লোপ পেতে থাকে এবং লুঙ্গি পরার প্রচলন বৃদ্ধি পায়। আরেকটি হাস্যকর বিষয় হলো, প্রাচীনকালে বাংলার মানুষেরা সেলাই করা কাপড় পরিধান করাকে অপবিত্র মনে করত। মুসলমান শাসকেরা এ দেশে আসার আগে কেউই সেলাই করা কাপড় পরিধান করতেন না। কিন্তু পরবর্তীতে মুসলমান শাসনামলে 'দর্জি'র বিষয়টি আস্তে আস্তে প্রভাব বিস্তার লাভ করে। তখন মানুষ সেলাই করা কাপড় পরা শুরু করে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, ১০০ বছর আগে নারীরা কেউই শাড়ির সাথে পেটিকোট বা ব্লাউজ পরিধান করতেন না।

মুঘল আমলের পোশাক। ছবি : সংগৃহীত

পরবর্তীকালে অভিজাত শ্রেণীদের মধ্যে আস্তে আস্তে পেটিকোট পরার বিষয়টি চলে আসে। ব্রিটিশ শাসনামলে নারীদের ফুলহাতা এবং গলাবন্ধ ব্লাউজ পরিধান করতে দেখা যায়। এছাড়া পুরুষেরা ব্রিটিশদের সাথে নিজেদের সহধর্মিনীকে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য আলাদা আলাদা পোশাক পরিধান করাতেন। উর্দুভাষী নারীদের মধ্যে যারা অভিজাত শ্রেণীর ছিলেন তারা সালোয়ার-কামিজ পরতেন। কিন্তু তখনও বাঙালি নারীরা সালোয়ার-কামিজ পরিধান করার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়নি। পরবর্তীতে শুধুমাত্র মুসলমানদের মধ্যেই নয়, হিন্দুদের মধ্যেও সালোয়ার-কামিজ পরার বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। আরেকটি বিষয় হলো তখন হিন্দু-মুসলমান উভয় শ্রেণীর নারীদের ক্ষেত্রে পর্দার সাথে চলাফেরা বিষয়টি বেশি প্রাধান্য ছিল।

আদিবাসি নারী ও পুরুষ। ছবি : সংগৃহীত

বর্তমানে যেই ধরনের পোশাক বেশি দেখা যায় তা হচ্ছে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত শ্রেণির পুরুষদের বেলায় জিন্স, গ্যাবার্ডিন বা ফরমাল প্যান্টের সঙ্গে পাঞ্জাবি, কিংবা স্যুটের মতো পোশাক। নারীদের পোশাকের ক্ষেত্রে এসেছে ভিন্নতা, যেমন : নারীদের বেলায় কামিজ, শাড়ি, টপস কিংবা কুর্তির মতো পোশাক। শুধু তাই নয় ইদানীং আধুনিকতার ছোঁয়ায় মেয়েদের প্যান্ট, শার্ট পরতে দেখা যায়। অবশ্য পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসিদের নিজস্ব পোশাক সব সময় পরতে দেখা যায়। আর সব কিছুকে ছাঁপিয়ে নিম্নবিত্ত শ্রেণীর ক্ষেত্রে এক ধরনের পোশাকই বেশি পরিলক্ষিত হয়, তা হলো মেয়েদের ক্ষেত্রে শাড়ি এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে লুঙ্গি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের পোশাকের ক্ষেত্রে বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের পোশাক বেশি প্রভাব ফেলেছে। তবে যেকোনো অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে কিংবা বিশেষ দিনগুলোতে নারীরা শাড়িকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন আর পুরুষেরা পাঞ্জাবিকে।