বাংলা সনের গোঁড়ার কথা

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বাংলা সন কেবল সম্রাট আকবর নয়, নেপথ্যের কারিগর ছিল আরও অনেকে



বাংলা সন

ছবি : সংগৃহীত


আচমকা যদি জানতে চাওয়া হয় আজকে বাংলা কত তারিখ, প্রায় সবাই একবার অন্তত চমকে উঠবেন। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ কিংবা ১৩ ফেব্রুয়ারি পহেলা ফাল্গুনের বাইরে খুব কম সময়ই নিজেদের এই বর্ষপঞ্জিকার দিকে খেয়াল করি আমরা। কিন্তু আমাদের একান্ত নিজস্ব এই বাংলা বছরের পেছনেও আছে বর্ণিল এক ইতিহাস। প্রচলিত তথ্য অনুসারে, বাংলা সন এর একক কারিগর হিসেবে আমরা মুঘল সম্রাট আকবরকে চিনলেও এর আগে এবং পরে বেশ কিছু নাম সবসময়ই অনুচ্চারিত ছিল আমাদের মাঝে।

সম্রাট আকবরের সময় মুঘল সাম্রাজ্য ছড়িয়ে পড়তে থাকে ব্যাপক আকারে। মোটামুটি পুরো ভারতই নিজের রাজ্যে ভেরাতে সক্ষম হন সম্রাট আকবর। বিপুল এই সম্রাজ্যকে সম্রাট শাসন এবং রাজস্বের ভিত্তিতে ভাগ শুরু করেন। সেসময়ে আকবরের কাজকে এগিয়ে আনেন টোডরমল। তার দশসালা বন্দোবস্তের মাধ্যমে নতুন এক ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা শুরু হয়। প্রায় সাথে সাথেই আকবর নিজের মতের ওপর ভিত্তি করেন চালু করেন নতুন এক ধর্ম দ্বীন-ই-ইলাহী। নতুন ধর্মের রীতি এবং রাজস্ব আদায় দুই মিলে আকবরের প্রয়োজন হলো নতুন একটি সনের। এর পেছনে আরও একটি কারণ ছিল, ভারতের ঋতু বৈচিত্র্য। হিজরি সন হিসাব করা হয় চাঁদের হিসেবে। খাজনা আদায়ের মৌসুম বিবেচনায় ভারতের সাপেক্ষে যা খুবই অসুবিধাজনক ছিল।


জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহ উল্লাহ খান সিরাজী

আকবরের বিশ্বস্ত জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহ উল্লাহ খান সিরাজী এই সময় সমাধান এনে দেন। তিনি মাসকে হিজরি সনের মত চন্দ্রনির্ভর করে বছরকে সৌর সনের সাথে ঋতুভিত্তিক করে নতুন বর্ষপঞ্জিকা তৈরি করেন। যা থেকে জন্ম নেয় নতুন বাংলা সন। যদিও ফরাসি ভাষার সাথে মিলিয়ে তার নাম করা হয় ইলাহি সন। এবং খ্রিস্টীয় সাল তখন ১৫৮৪।


মুর্শিদকুলী খান

যদিও ১৫৮৪ সালে সালে জন্ম তবুও সেই ইলাহি সাল ধরা হয় ১৫৫৬ থেকে। কিন্তু ইলাহী সাল কি করে বাংলা সাল হলো সেটা আরেক ইতিহাস। যার পুরো কৃতিত্ব মুর্শিদকুলী খানের কাছে। আকবর জীবিত অবস্থায় বাংলার পুরো কৃতিত্ব নিতে পারেননি। সেসময় তাই বাংলা সনের প্রচলনের প্রশ্নও আসেনা। বাংলায় মুঘল শাসন আসে তার পুত্র জাহাঙ্গীরের মাধ্যমে। তখনই বাংলায় আসেন মুর্শিদকুলী খান। তিনি বারদুয়েক বদলি হয়ে যখন স্থায়ীভাবে থিতু হন তখন দিল্লীর মুঘল সাম্রাজ্য টালমাটাল। আর বাংলা কেবল নামেই দিল্লীর অধীনে। তবে রাজস্ব আদায় তো আর থেমে থাকে না। মুর্শিদকুলী খানের তাই প্রয়োজন হলো আকবরের করে দেয়া ইলাহী সনের। তিনি আয়োজন করলেন পূণ্যাহ উৎসবের।

এতে করে মানুষ নবাবের বাড়িতে যেমন আতিথ্য পেত, তেমনই করে রাজস্বও পরিশোধ করার সুযোগ পেয়ে যেতো। মুর্শিদকুলী খান এসময়েই বাংলা সন এবং ইলাহী সনের একটি সমঝোতা করেন  এবং স্থানীয় লোকের সুবিধার জন্য বার এবং মাসের নামে পরিবর্তন নিয়ে আসেন। এখানে বেশ কিছু বিষয়ের উল্লেখ করা প্রয়োজন। হিজরি ৯৬৩ সালে আকবরের ইলাহী সনের শুরু। আর পুরো ব্যাপারটি যেহেতু হিজরি সনের সাথে মিলিয়ে করা তাই মহররম মাসের শুরু হিসেবেই ইলাহী সনের শুরু হয়। তবে চন্দ্রমাস এবং সৌর মাসের হিসেবের গরমিলের কারণে গত ৪০০ বছরে বাংলা এবং হিজরি সনের পার্থক্য আরও ১৪ বছর বেড়েছে। কিন্তু সৌর সনের সাথে মিলিয়ে রাখার কারণে প্রতিবছর একইভাবে পহেলা বৈশাখ হাজির হচ্ছে ১৪ই এপ্রিলে।


জ্যোতির্বিদ মেঘনাদ সাহা

প্রশ্ন আসে, তাহলে লিপ ইয়ারের হিসেব কীভাবে করা হয়। এর মিমাংসা হয় এশ অনেকদিন পরে। তখন ইংরেজ শাসনেরও অবসান ঘটেছে। ১৯৫২ সাল। বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ মেঘনাদ সাহা ভারতে অন্যান্য সালের সাথে বাংলা সালকেও দাপ্তরিক স্বীকৃতি দেয়ার আবেদন করেন। ভারত সরকার তা গ্রহণ করেন ১৯৫৭ সালে। তার ঠিক ৬ বছর পর, ১৯৬৬ সালে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কার কাজের দায়িত্ব পান। তিনি এবং তার কমিটি বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস ৩১ দিনে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস ৩০ দিনে হিসেব করার প্রস্তাবনা পেশ করেন। আর চার বছর পরপর লিপ ইয়ারের বাড়তি একদিন যুক্ত হতে থাকে চৈত্র মাসের সাথে। পথচলার শেষ ধাপে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলা সনের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে থাকে আর ১৯৮৭ সাল থেকে তা ব্যবহার হতে থাকে দাপ্তরিক কাজের ক্ষেত্রেও।  

জুবায়ের আহম্মেদ   এস এম