কোভিড-১৯ : পর্যটন শিল্প-এ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দাবি বিশ্লেষকদের

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : চাকরি হারাতে পারে পর্যটন শিল্প-এর ৩০ শতাংশ কর্মী


পর্যটন শিল্প

ছবি : সংগৃহীত


 বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের যে শিল্পগুলো উত্তরোত্তর উন্নতি করে যাচ্ছে তার মধ্যে একটি পর্যটন শিল্প । দেশে ভ্রমণপ্রেমীদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে চলেছে এই শিল্পের পরিধি। দেশে যেমন হু হু করে বাড়ছে ভ্রমণপ্রেমী তেমনই ক্রমেই আবিস্কার হচ্ছে নতুন নতুন পর্যটন স্থান। আর দেশের সাথে সেসব স্থানে আকর্ষণ বাড়ছে বিদেশি পর্যটকদের। তবে, বিশ্বে চলমান করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এই শিল্পেও। আর্থিক ক্ষতির মুখে এর সাথে জড়িতরা, বিশ্লেষকরা ইতোমধ্যেই শিল্পটির জন্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম’ তৈরির দাবি করেছে। বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিই হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্বের প্রধান প্রধান পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্র রয়েছে বন্ধ। বিমানশিল্পসহ সব ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির। হোটেল ব্যবসায় চরম ক্ষতির মুখে। উন্নত দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে। মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে যেখানে বেগ পেতে হচ্ছে সেখানে পর্যটন শিল্প যে মহাসঙ্কটে পরতে যাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

চরম অশনি সঙ্কেত

দেশের পর্যটন খাতেও দেখা দিয়েছে চরম অশনি সঙ্কেত। ইতোমধ্যেই কমে গেছে বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশে আসার সংখ্যা। একইসঙ্গে শুধু চীনই নয়, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে বাংলাদেশিদের ভ্রমণের হারও কমেছে। বন্ধ আছে ইউরোপ-আমেরিকার সব বিমান বন্দর ও। সব দেশ  লকডাউনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, ফলে পর্যটকরা কোথাও যেতে পারছে না। তাই নতুন করে সংকটের মুখে পড়েছেন দেশের পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্টরা।


পর্যটন শিল্প

ছবি : সংগৃহীত


 পর্যটন শিল্পের সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেকেই আগে থেকে ভ্রমণের জন্য বুকিং করলেও, এখন তা বাতিল করছেন। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে চীনসহ থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর,মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার ট্যুর প্যাকেজ,এয়ার টিকিট বুকিং করলেও করোনা আতঙ্কে তা বাতিল করা হচ্ছে।


বাতিল হচ্ছে পর্যটকদের বুকিং

একে একে বাতিল হচ্ছে বিদেশি পর্যটকদের বুকিং, শুধু তাই নয়, বাতিল হচ্ছে দেশের পর্যটকদের বিদেশ ভ্রমণের যাবতীয় কর্মসূচিও। আর এর ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো। বিজকন হলিডেজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তসলিম আমিন শোভন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে বলেন, ‘করোনা ভাইরাস আতঙ্কে ভ্রমণ বাতিলের হার বেড়েছে। অনেকে বুকিং দিলেও তা বাতিল করছেন। নতুন করে কেউ ট্যুরের জন্য আসছেন না। চীন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডে ভ্রমণ বাতিলের হার সব চেয়ে বেশি। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ভ্রমণ বাতিল হচ্ছে। ফলে  ট্যুর অপারেটরদের জন্য এটি নতুন একটি সংকট।’ বর্তমানে বাংলাদেশ করোনা আক্রান্ত দেশের একটি। যার ফলে বাংলাদেশ এক অঘোষিত লকডাউনে রয়েছে। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া চলাচলের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। ফলে বিপর্যস্ত হয়েছে দেশের আন্যান্য সঙ্গে অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতও। এই ক্ষতি আর্থিকভাবে কয়েকশ' কোটি হতে পারে।


গণপরিবহন চলাচল স্থগিত

করোনা প্রাদুর্ভাবের ফলে সরকার ইতোমধ্যেই সব ধরণের গণপরিবহন চলাচল স্থগিত করেছে। বন্ধ আছে বিমান পরিবহণও। মানুষের মধ্য থেকে করোনা ভীতি দূর করতে কাজ করা উচিত বলে মত দেন প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেল লিমিটেড (পাটা) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব তৌফিক রহমান।


পর্যটন শিল্প

ছবি : সংগৃহীত


তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের আস্থা তৈরি করতে হবে। যেন পর্যটকরা বাংলাদেশ আসতে ভয় না পান। এজন্য একটি ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম’ থাকা দরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে। এই টিম সরকার, ব্যবসায়ী, এয়ারলাইন্স সবাইকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেবে। ফলে মানুষজন যখন জানবে বাংলাদেশে যথেষ্ট ভালো পরিবেশ রয়েছে-তারা এখানে আসতে ভয় পাবেন না। এখন প্রায় সবাই একই ক্রাইসিসের মধ্যে আছেন। বিদেশি পর্যটকরা  বুকিং  বাতিল করছেন। অথচ তাদের জন্য হোটেল ও গাড়িসহ অন্যান্য সার্ভিস বুকিং দেওয়া ছিল।’ এদিকে, সোমবার (১৬ মার্চ) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) এক এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাবেদ আহমেদ কোভিড-১৯-এর প্রভাবে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৩০ শতাংশ কর্মী চাকরি হারানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেন। দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়, আলোচ্য সংবাদ সম্মেলনে টোয়াব সভাপতি মো. রাফিউজ্জামান বলেন, ‘আউটবাউন্ড ও ইনবাউন্ড পর্যটনের একটি বড় বাজার চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, ভারত ও ইতালি। করোনা ভাইরাসের কারণে উভয় পর্যটনে বড় ধাক্কা লেগেছে। এতে আমাদের ট্যুর অপারেটররা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ভাইরাস আতঙ্কে নেপাল, ভুটান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও এশিয়ার প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোতে টুর প্যাকেজ টিকিট বাতিল করেছে প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশি ভ্রমণকারী। একইভাবে বাংলাদেশে আসার পূর্ব নির্ধারিত ভ্রমণ বাতিল করেছে অনেক বিদেশি পর্যটক। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছে টোয়াবের সদস্যরা।’


পর্যটন শিল্প

ছবি : বাংলা ট্রিবিউন


বাংলাদেশের দশম পর্যটন মেলা ‘শেয়ারট্রিপ বাংলাদেশ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ার-২০২০’- আগামী ৩-৫ এপ্রিল হওয়ার কথা থাকলেও করোনা ভাইরাসের কারণে সব প্রস্তুতির পরেও আয়োজন স্থগিত করা হয়েছে। আগামী ২৯-৩১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মেলার আয়োজন করা হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

পর্যটন শিল্পকে বাঁচাতে সুপারিশ

টোয়াবের পক্ষ থেকে কোভিড-১৯ এর প্রভাবে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটন শিল্পকে বাঁচাতে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সংস্থাটির সুপারিশগুলো হচ্ছে : সহজ সুবিধায় ও কম খরচে ভিসা দেওয়া; বন্দর এবং বিমানবন্দরগুলোতে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ শিথিল করা; পর্যটকদের ওপর আরোপিত ট্যাক্স কমানো; ভ্রমণ স্থানগুলোর প্রচার বরাদ্দ বাড়ানো; বিমানের টিকিটের ট্যাক্স কমানো; সরকারের পক্ষ থেকে অপারেটরদের ইনসেনটিভ প্রদান করা এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেওয়া। প্রকৃতির অকৃত্রিম, অনাবিল, অফুরন্ত, বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ। এর প্রতি পরতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পাহাড়, নদী ও হাওড়ের নির্মল উজ্জ্বলতা। নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, প্রবাল দ্বীপ, সমুদ্রসৈকত, হাওড়-বাঁওড়, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, পুরাকীর্তিসহ আরো অনেক দর্শনীয় স্থান নিয়ে আমাদের এই দেশ। হাওড়াঞ্চলে সাগরসদৃশ বিস্তীর্ণ জলরাশি এক অপরূপ মহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পর্যটনে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা। বিশ্বায়নের পরিপ্রেক্ষিতে পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সাধন করাই হলো বাংলাদেশের পর্যটনের মূলমন্ত্র।


পর্যটন শিল্প

ছবি : সংগৃহীত


অপূর্ব সৌন্দর্যের আধার বাংলাদেশ, যার প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্যের কোনো অভাব নেই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামের অকৃত্রিম সৌন্দর্য, সিলেটের সবুজ অরণ্যসহ আরো অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন : চিকিৎসা সেবায় জড়িতদের বিনামূল্যে পিপিই দেবে ইউ এস বাংলা

এই করোনা সংকট দ্রুত কেটে যাক, মুক্তি পাক মানুষ। ঘুরে বেড়াক দেশ থেকে দেশান্তরে। পাহাড়, জঙ্গল, সাগর, নদীতে ভেসে বেড়াক। পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় শিল্প। এই সংকট থেকে এই সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখতে কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে দৃঢ় পদক্ষেপ। একই সঙ্গে পর্যটকদের পরিবেশবাদী ভ্রমণে ঝুঁকতে হবে, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করার মাধ্যমেই টিকে থাকবে পর্যটন শিল্প।  

নাবিলা বুশরা   এস এম