হিমালয়ের বুকে বিস্তীর্ণ রূপের নিদর্শনসমূহ নাগারকোটে

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : নেপালের আসল সৌন্দর্য দেখতে মেঘের রাজ্য নাগারকোট ভ্রমণ

মেঘেদের আনাগোনা দেখা মিলে নাগারকোট ভ্রমণ।  ছবি : অ্যাগোডা

 সাঁই করে বাতাসে শিস কেটে পাহাড়ি উপত্যকায় ল্যান্ড করা প্লেনের ভিতর থেকে না নেমে আসা পর্যন্ত নেপালের আসল সৌন্দর্য সম্পর্কে আন্দাজ করা যায় না। পাহাড় আর পর্বতে ঘেরা এই দেশের পরতে পরতে রয়েছে অজানা সৌন্দর্য আর মায়ার হাতছানি। নাগারকোট নেপালে পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। নেপাল ভ্রমণে পর্যটকরা রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরে নাগারকোটে যাবেন না, এমনটা যেন হতেই পারে না। নেপাল ভ্রমণ প্ল্যানের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ নাগারকোট, মেঘেদের রাজ্য। ধীরে ধীরে জমতে থাকা মেঘেদের আনাগোনা দেখা, পাহাড়ে চড়া কিংবা পাহাড়ি কটেজের জানালার পাশে বসে জানালার বাইরে দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘ দেখা বা ছোট্ট কটেজের বারান্দায় কফি হাতে দাঁড়িয়ে মেঘে হাত ভেজানোর মতো নাটকীয় অনুভূতির জন্য নাগারকোট এক অনন্য ভ্রমণ স্পট।

সূর্যোদয়ের অপরুপ দৃশ্য, নাগারকোট । ছবি : ভায়েটর

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে নাগারকোট যাবার জন্য বাস ও ট্যাক্সিক্যাব পাওয়া যায়। এসি ও নন-এসি উভয় রকমের বাসই পাওয়া যায়। বাসের চেয়ে ট্যাক্সি অনেকসময় নতুন অভিজ্ঞতা দিতে পারে। নাগারকোটের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ও তীক্ষ্ণ বাঁকগুলোতে ট্যাক্সিতে বসেই অনুভব করা যায় চরম থ্রিল। যেন প্রতিটা কাজেই নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। নাগারকোট থেকে সূর্যোদয় দেখা যেন হিমালয়ের একেবারে কোল থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখার মতোন। নেপালের ভক্তপুর জেলায় অবস্থিত নাগারকোট থেকে হিমালয়ের ভিউ সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। মেঘ এবং আবহাওয়ার জন্য হিমালয়ের দেখা মেলা যদিও মাঝে মাঝে ভার কিন্তু বড় কথা হলো নাগারকোট থেকে কাঠমান্ডু শহরটিকেও দারুণভাবে দেখা যায়।

হিমালয়ের মোট ১৩টি পর্বতশৃঙ্গের মধ্যে ৮টিই নাগারকোট থেকে দেখা যায়। আর যেহেতু নাগারকোট নিজেই মেঘের ওপরে তাই আকাশে খুব বেশি মেঘ থাকলে হিমালয়ের দেখা নাও মিলতে পারে। নাগারকোট কাঠমান্ডুর পূর্ব দিকে অবস্থিত আর কাঠমান্ডুর পশ্চিম দিকে ২০৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পোখরা। মূলত নেপাল ভ্রমণ প্ল্যান পোখরাকে মাথায় রেখেই করা হয়। আর নাগারকোট ও পোখরা দুটোই কাঠমান্ডুর দু-দিকে হওয়ায় টাইম ম্যানেজ করতে নাগারকোটকে ট্যুর প্লান থেকে বাদ দেয়া হয়। কিন্তু নাগারকোট তার স্বমহিমায় অনন্য, অন্য কোনও জায়গা দিয়ে এর অনুভূতি পাওয়া যাবে না। হিন্দুপ্রধান দেশ নেপালে প্রায় সবখানেই প্রচুর মন্দিরের দেখা মেলে। পাহাড়ের অনেক উপরেও খোঁজ পাওয়া যায় পুরনো মন্দিরের।

প্রকৃতির মায়াবী রূপ। ছবি : নেপাল এসেন্ট ট্রেক

 পাহাড় আর মেঘেদের রাজ্য নাগারকোট পর্যটকদের ভিন্ন স্বাদ দেয়। হাইকিং করতে ভালোবাসেন এমন পর্যটকের জন্য নাগারকোট যেন স্বর্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ হাজার ফুট উপরে নাগারকোটের অবস্থান। এর ফলে মেঘও থাকে পর্যটকদের অনেক নিচে। এমনও হতে পারে থাকার কটেজের জানালা দিয়ে এক চিলতে মেঘ ঢুকে হয়তো খানিকটা ভিজিয়ে দিয়ে গেলো। নাগারকোট থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখার জন্য খুব ভোরেই বেরিয়ে পড়তে হয়। সকালের নাস্তার প্লেটের খাবার তুলে চিবুতে চিবুতে কিংবা ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে দূরের হিমালয় পাহাড়শৃঙ্গে চিকচিকে সূর্যের প্রতিফলিত আলোতে মুগ্ধ হয়ে অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকেন পর্যটকেরা। কিংবা হাইকিং করতে যেয়ে যখন পাহাড়ে পাহাড়ে যখন হেঁটে বেড়ায় তখন নতুন নতুন আবিষ্কারের মুগ্ধতা আচ্ছন্ন করে রাখে পর্যটকের মনকে।

ট্রেকিং-এর জন্য আদর্শ স্থান নাগারকোট। ছবি : ভায়েটর

 পাহাড়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনও উপরে উঠা আবার নিচে নামার বেলায় নানা রকমের পাহাড়ি ফুল-ফলের দেখা পাবেন। পাহাড়ের গায়ে দূর থেকে খানিকটা গজিয়ে উঠা ব্যঙের ছাতার মতোন দেখতে ছোট বাড়িঘর বা চলতে যেয়ে পাহাড়ি মানুষদের সঙ্গে ভাব জমানো অনেকটাই যেন থ্রিলার গল্পের একেকটা চরিত্রে চিত্রায়িত করে ভ্রমনপিয়াসুর মনকে। নেপালিরা নেপালি ভাষা ছাড়াও হিন্দিতে পারদর্শী, তাই হিন্দিতে টুকটাক কথা বলতে ও বুঝতে পারা বাঙালিদের জন্য নেপাল ঘোরাটা কঠিন কিছু হবে না বরং স্থানীয়দের সাথে মসৃণ যোগাযোগ ভ্রমণটিকে আরও আনন্দময় করে তুলবে। মেঘের দেশ নাগারকোটে সারা বছরই বেশ ঠান্ডা থাকে। বলা হয়ে থাকে নেপালের রাজপরিবার গরমকালে নাগারকোটে অবকাশ যাপন করতেন। নাগারকোটে বেশিরভাগ হোটেলে এসি এমনকি কোনও ফ্যান নাও থাকতে পারে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কেননা নাগারকোটে সারা বছরই শীত থাকে। তাই  নাগারকোটে যাওয়ার আগে অবশ্যই গরম কাপড় সাথে নিতে হবে। আর টেকনলোজি ব্যবহার করে আগে থেকেই নাগারকোটের আবহাওয়া কেমন আছে সেটি দেখে নেয়া ভালো।

ছবি : ট্রিপএডভাইজর

পর্যটন নির্ভর দেশ নেপালে পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার জন্য অসংখ্য ভালো মানের হোটেল রয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে হোটেল-কটেজ খুঁজে পাওয়া আরও সহজতর হয়েছে। নাগারকোটে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের ভালো ভালো হোটেল আছে।  শীতকালে বা পিক সিজনে সব টুরিস্ট স্পটেই দাম বেশি থাকে, তাই একটু জেনেশুনে ট্যুর প্ল্যান করে নিলে সুন্দর একটা সময় কাটানো যায়। আবার নাগারকোটে খাবার-দাবারের দাম আমাদের দেশের তুলনায় বেশি। এক্ষেত্রেও খরচ যেন আনন্দের বাধা হতে না পারে তাই আগে থেকেই পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নেয়া ভালো। স্বর্গীয় সৌন্দর্যেঘেরা এমন পাহাড়ি জায়গায় বেড়াতে যেয়ে কোনো ব্যক্তিরই উচিত না সেখানকার পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কিছু করা। পর্যটকেরা যে এই বিষয়ে খুব সচেতন হচ্ছেন তা ইতিবাচক। নাগারকোটেও ঘুরে বেড়ানোর সময় নির্দিষ্ট স্থানব্যাতীত যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে সেখানকার পরিবেশ নষ্ট করবেন না।