কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১১কিলোমিটার (প্রায় ৬ দশমিক ৮মাইল) দূরত্বে বৌদ্ধায় অবস্থিত নেপাল তথা সারা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বৌদ্ধ স্তূপ বৌদ্ধনাথ। ১০৮ ফুট উচুঁ বৌদ্ধনাথ স্তূপের নামকরণ করা হয়েছিলো গৌতম বুদ্ধের নামে । আনুমানিক ১৪০০ বছর আগে দ্বিসাবী বংশীয় রাজা মনদেবের আমলে তৈরি এই স্তূপটিকে ১৯৭৯ সালে বিশ্বঐতিহ্য স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। তারপর থেকেই দেশ বিদেশের পর্যটকের আনাগোনা বেড়ে যায় যায় বৌদ্ধদের পবিত্র স্থানটিতে ।
স্বম্ভুনাথের পর এটিই কাঠমান্ডু অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান।
স্তূপটির প্রথমধাপে দেখতে পাবেন নেপালী রাজা সং জান গুনবে এবং নেপালী রাণী ভিরকুরের প্রতিকৃতি। ধারণা করা হয় তিনধাপে বিন্যস্ত মন্ডলা নকাশার এই মূলবেদী পৃথিবীর প্রতীক। অনেকের মতে স্তূপের সর্বনিম্নস্তরে রয়েছে বুদ্ধের সিংহাসন, বাকীধাপগুলো তাঁর পা।
১০৮ ফুটের এই স্তুপ নেপালের সবেচেয়ে প্রাচীন ধর্মীয় উপাসনালয়। স্তূপের শীর্ষে থাকা ছাতাটি বুদ্ধের মুকুট আর তারও উপরে সূর্যসংবলিত অংশটিকে বলা হয় মহাকাশের প্রতীক। বৌদ্ধ মন্দিরের চারপাশে রংবেরংয়ের ধর্মীয় সব পতাকাগুলো টানানো অবস্থায় বাতাসে উড়তে থাকে। বিশ্বাস করা হয়, এগুলো স্বর্গের দিকে মন্ত্র আর প্রার্থনাগুলো পৌঁছে দিয়ে আসে।
পতাকা শোভিত বৌদ্ধনাথ স্তূপ। ছবি : টেক দেট ভেকেশনমূলবেদীর উপরে সাদা আকৃতির গম্বুজটির পানির প্রতীক। উচুঁ এই গম্বুজটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন আকাশ ছুঁইছুঁই করছে। গম্বুজের নীচে পাথরের তৈরি ১০৮ কুলুঙ্গি যুক্ত একটি চত্ত্বর রয়েছে। গম্বুজের উপরে পিরামিড আকারে মোট ১৩ টি ধাপ যাকে বলা হয় মানসিক পর্যায়ের প্রতীক।
স্তূপটির নীচে রয়েছে তিনটি গোলাকৃতির মাচা । কথিত আছে চন্দ্র মাসের ১০ম, ১৩তম এবং ১৫তম দিন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের দিনগুলোতে বৌদ্ধনাথে বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্ব জীবিত হন।প্রেয়ার হুইল ঘুরিয়ে, অক্ষমালা জপে বৌদ্ধনাথ স্তুপের চারপাশ ১০৮ বার ঘুরে গৌতমবুদ্ধ এবং বোধিস্বত্তের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করাকে বলা হয় 'কোরা'।
ধারণা করা হয়, 'কোরা'-এর মাধ্যমে ভক্তের সৌভাগ্য ফিরে আসে। নেপালি ছাড়াও তিব্বতি এবং সারাবিশ্বের সকল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কোরায় অংশ নিতে এখানে আসেন। স্তূপের চারপাশ জুড়ে প্রদক্ষিণের চওড়া পথ রয়েছে। সে পথের পাশ ঘেঁঘে গড়ে উঠেছে নানা ভবন। কোনটি দেবালয়, আবার কোনটিতে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
এছাড়া কিউরি শপ, খাবার দোকানও রয়েছে। প্রদক্ষিণ পথের চারপাশে দোকানগুলোতে চোখে পরবে তীব্বতি পণ্যের সমাহার। যা মনে করিয়ে দিবে নেপালের সাথে তিব্বতের বহুবছরের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা। তিব্বত থেকে কাঠমান্ডু হয়ে নেপালে প্রবেশপথটা গেছে বৌদ্ধনাথের পাশ কাটিয়ে। শতবছর পূর্বে তিব্বতি বণিকরা বাণিজ্যপথে বিশ্রাম নিতেন এই বৌদ্ধনাথে। আর সেই থেকেই তিব্বতিরা ব্যবসায়িক পসার খুলে বসেন বৌদ্ধনাথ স্তূপের আশেপাশে।
তিব্বতি বণিকরা পরবর্তীতে বৌদ্ধনাথের আশেপাশে বসতি গড়ে তোলেন। তারই ধারাবাহিকতায় এখনো এখানে তিব্বতের বাণিজ্যিক যোগাযোগ রয়েছে। বৌদ্ধনাথ এবং বৌদ্ধার আশেপাশে বর্তমানে অনেক তিব্বতি বাস করছে।
ভূমিকম্পের পর বৌদ্ধনাথ। ছবি : বিবিসিস্তূপটিকে ঘিরে অনেক মুখরোচক কাহিনী রয়েছে। 'গুরু পদ্মসম্বাভের গুপ্তধন' অনুসারে মা ঝ্যাজিমা নামে এক অতি দরিদ্র বিধবা বৌদ্ধ বৌদ্ধায় একটি উপাসনালয় গড়ার অনুরোধ করেছিলেন স্থানীয় রাজার কাছে। রাজা তাতে সম্মতি প্রদান করলে তৎকালীন ধনী ও ক্ষমতাবানদের মধ্যে প্রচণ্ড ঈর্ষার নেয়।
উপাসনালয় নির্মাণ কাজ বন্ধ করার জন্য রাজাকে অনুরোধও করা হয়েছিলো। কিন্তু রাজা বললেন, 'যেহেতু নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তাই তা আর বন্ধ করা হবে না'।
বৃদ্ধা উপাসনালয়ের কাঠামোর কাজ শেষ করার আগেই মারা গেলেন। তার চার পুত্র স্তূপটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজা এই স্তূপটি সংস্কার করেন।
বিধবার চার পুত্র একদিন স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের ইচ্ছার কথা ঈশ্বরকে বললেন। পরবর্তীতে তাদের প্রত্যেকের ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছিল। কথিত এই গল্প থেকেই ভক্তদের ধারণা বৌদ্ধনাথে গেলে মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়। দেশে বিদেশ থেকে অনেকেই তাই এখানে এসে কোরা করেন এবং ঈশ্বরের কাছে মনোবাসনা ব্যপ্ত করেন। যাদের অনেকেরই পরবর্তীতে সেই মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে।
মন্ডালা নকাশায় স্থাপিত বৌদ্ধনাথের মূলবেদী। ছবি : আওয়ার প্রজেক্ট গ্যালারী
হাতে সময় নিয়ে নেপাল ঘুরতে আসলে বৌদ্ধনাথ স্তূপ দর্শন করতে ভুলবেননা কিন্তু। এটি কাঠমান্ডুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। আর প্রথমবারের জন্য স্তুপটি দর্শন করতে আসলে ঈশ্বরের কিছু না কিছু প্রার্থনা করবেন অবশ্যই। কে জানে হয়তো ঈশ্বরের আশীর্বাদে অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ হয়েও যেতে পারে।