ভুটানের আইকনিক মন্দির : দা টাইগার'স নেস্ট

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : উঁচু পাহাড়ি ধারের বুকে পবিত্র মন্দির

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ভুটানের অন্যতম আকর্ষণীয় মন্দির দা টাইগার'স নেস্ট। ছবি : কালচারাল অবসকিউরা 

ট্যাক্টস্যাঙ্গ লহাখাঙ্গ ভুটানের অন্যতম আকর্ষণীয় মন্দির এবং ধর্মীয় স্থান। আইকনিক এই মন্দিরটি ভুটানে আগত পর্যটকদের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ট্যাক্টস্যাঙ্গ লহাখাঙ্গ নামটি অনুবাদ করলে এর নাম দাঁড়ায় 'দা টাইগার'স নেস্ট'। ভুটানের এই মন্দিরকে অন্যতম পবিত্র জায়গায় বিবেচনা করা হয়। এটি পারো উপত্যকা হতে ৭০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত।

ট্যাক্টস্যাঙ্গ লহাখাঙ্গ বা দা টাইগার'স নেস্ট ১৯৬২  সালে প্রথম তৈরি করা হয়েছিল। এখানে একটি গুহা রয়েছে যেখানে গুরু রিমপোচে উপাসনা করেছিলেন সপ্তম শতকে। কিংবদন্তীদের ভাষ্যমতে গুরু রিমপোচে এখানে বাঘিনীর পিঠে চড়ে এসেছিলেন উপাসনা করার জন্য। বলা হয়ে থাকে, কথিত রাজার একজন সাবেক স্ত্রী মানুষ থেকে বাঘিনীতে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং সেই রূপান্তরিত বাঘিনী তিব্বত থেকে গুরুকে ট্যাক্টসাঙ্গে নিয়ে এসেছিল।

গুরু রিমপোচে এখানে ৩ বছর, ৩ মাস, ৩ দিন, ৩ ঘণ্টা উপাসনা করছিলেন অপদেবতাদের দমন করার জন্য। এখানে গুহাটিকে অনেক পবিত্র জায়গা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা উপসনার জন্য এখানে আসেন। বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের উপাসনার জন্য আদর্শ স্থান ট্যাক্টস্যাঙ্গ লহাখাঙ্গ। ছবি : সোয়ান ট্যুর

ট্যাক্টস্যাঙ্গ লহাখাঙ্গ পারো উপত্যকা হতে ১০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। এটি প্রায় ৩ দশমিক ১২০ মিটার খাড়া। ভুটানে আসলে  টাইগার নেস্টে ভ্রমণ না করলে কোনো ভ্রমণই পূর্ণ হবে না। ট্যাক্টস্যাঙ্গ লহাখাঙ্গ মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন সোনাম গিয়াল্ট সেন যিনি একজন বৌদ্ধ গুরু।

১৬৪৪ কিংবা ১৬৪৬ সালে তিব্বতিয়ান যুদ্ধের সময় টাইগার'স নেস্টে প্রথম প্রার্থনা ও দেবতাদের প্রতি পূজা অর্চনা করা হয় নিজেদের প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এখানে যে ভাস্কর্যগুলো রয়েছে সেগুলোর কাজ করেছিলেন পেন্টসা ডিভা। এই ভাস্কর্যগুলো পুনাখা ডিজং-এ তৈরি করা হয়েছিল এবং পরে টাইগার'স নেস্টে নেয়া হয়েছিল।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, পবিত্র প্রবেশমুখে এই ভাস্কর্য প্রবেশের সাথে সাথে কথা বলেছিল, 'চিন্তা করোনা, আমাকে নিতে কেউ না কেউ আসবে'। এরপর ভাস্কর্যটি নিজে নিজে ট্যাক্টস্যাঙ্গ-এ পৌঁছে গেল। এরপর থেকে ভাস্কর্যটি 'স্ববক্তা ভাস্কর' হিসেবে পরিচিত। ছবি : স্যান্ডেলস্যান্ড

এখানে ঐতিহাসিক চমৎকার চিত্রকর্মের উদাহরণ পাওয়া যায়। গুরুর আটটি অভিব্যক্তিকে এবং পাঁচটি প্রধান নীতিকে সুন্দরভাবে মন্দিরে অঙ্কন করা হয়েছে। আরও রয়েছে গিয়ালসে তেনজিন রাবগিয়ের সিংহাসন। টাইগার'স নেসটে হাইকিং করতে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা এসে থাকে। হাইকিং করার জন্য এই জায়গাটি সত্যিই অতুলনীয়। তবে হাইকিং করার ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয়।

আপনার জন্য ভালো হয় রাতের বেলা পারো উপত্যকায় অবস্থান করা এবং সকাল-সকাল টাইগারস নেস্ট হাইকিংয়ের জন্য বের হয়ে যাওয়া। কেননা বেশি দেরী করলে পরে অনেক ভিড় পাওয়া যায়। আপনি সকালে ভ্রমণের জন্য বের হয়ে দুপুর বা বিকালের মধ্যে চলে আসতে পারবেন। দীর্ঘ সময় হাইকিং করার পর শরীরে খুবই ব্যথা অনুভূত হয়।

শরীরে আরামের অনুভূতি তৈরির জন্য রয়েছে গরম পানিতে গোসল করার ব্যবস্থাও। এখানে আপনাকে প্রায় তিন ঘন্টা হাইকিং করতে হবে। তবে যারা সবসময় হাইকিং করে অভ্যস্ত এবং জিম করে থাকেন তাদের জন্য ২ ঘন্টা সময় লাগে। আর তাছাড়াও এখানে বাচ্চারাই হাইকিং করতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে যে সকল বাচ্চারা সব সময় হাইকিং করে অভ্যস্ত  তাদের জন্য সুবিধা বেশি হয়। পতাকাবাহীত টাইগারস নেস্ট-এর পথ। ছবি : ট্রিপোটো

এই হেঁটে চলার সম্পূর্ণ পথের দূরত্ব প্রায় ৪ কিলোমিটার। পৌঁছনোর পর এখানে রয়েছে রেস্টুরেন্ট সেখান থেকে আপনাকে দেয়া হবে সুস্বাদু খাবার। আরও পাবেন ভূটানের স্থানীয় খাবারের সংগ্রহশালা। হাইকিং করার পর যখন উপরে পৌঁছবেন মন্দিরে প্রবেশের সাথে সাথে আপনার মন এক অনাবিল আনন্দে ও পরম শান্তিতে ভরে উঠবে। যেন স্নিগ্ধ অনুভূতিতে সবকিছু  ছুঁয়ে  গিয়েছে।

কীভাবে যাবেন :

বাংলাদেশ থেকে যেতে হলে প্রথমত আপনাকে ভুটানের পারো বিমানবন্দরে যেতে হবে। এক্ষেত্রে বিমানে আপনার সময় লাগবে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট এবং খরচ পরবে প্রায় ২০ হাজার টাকা। বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর একটি ট্যাক্সিতে করে আপনি ২৫ মিনিটের ব্যবধানে পারো উপত্যকায় পৌঁছতে পারবেন। এরপর সেখান থেকে সহজেই যেতে পারবেন টাইগারস নেস্ট এ।

কোথায় থাকবেন :

এখানে থাকার জন্য রয়েছে টাইগার নেস্ট রিসোর্ট। প্রতি রাতের জন্য আপনার খরচ পরবে প্রায় ২,৫০০ টাকার মতো।  তবে এখানে কোনো প্রকার পোষা প্রাণী নিয়ে প্রবেশ করা নিষেধ। রিসোর্টটিতে সকালের নাস্তা ফ্রিতে দেয়া হয়। এছাড়া এই রিসোর্ট থেকেও আরও কিছু সৌন্দর্য দেখা যায়। যেমন : কাইয়েচু লহাখাঙ্গ, ড্রাকজিয়েল ডিজং। রিসোর্টে আরও রয়েছে ফ্রি পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও।  


জান্নাতুল ফেরদৌস  


এস এম