ডচুলা পাস, ভুটান : অভূতপূর্ব শৈল্পিক সৃষ্টির জন্ম
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : হিমালয়ের রাজ্যে ভক্তি, বিশ্বাস ও স্মৃতিস্তম্ভের এক নাম ডচুলা পাস
ছবি : ভুটান ট্রাভেল কোঅর্ডিনেটর
ভুটান সবার কাছে পরিচিত এর সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ পাহাড় সাম্রাজ্য এবং পৃথিবীর মধ্যে সুখী ও শান্ত প্রকৃতির মানুষদের বসবাসের জন্য। সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের সাথে মানবসৃষ্ট অনন্য বিষয়গুলো আরও উদ্ভাসিত করে তুলেছে ভূটানের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে। তেমনই একটি জায়গার নাম ভুটানের ডচুলা পাস। অপরূপ জায়গায় মধ্যে ডচুলা পাস তৈরি হয়েছিল ভুটানের সামরিক কাজে নিয়োজিত শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে।
ডচুলা পাসের সাথে ১০৮টি স্মৃতি মন্দির রয়েছে যেগুলোকে বলা হয় 'ড্রাক ওয়াঙ্গুয়াল চরটেন'। এই মন্দিরগুলো নির্মিত হয়েছে প্রত্যেক শহীদ সেনাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য। এখানে জায়গাগুলো পাঁচটি রং বিশিষ্ট এক বিশেষ ধর্মীয় পতাকা দিয়ে সজ্জিত হয়েছে। এটি মূলত প্রাকৃতিক উপাদানকে উপস্থাপন করে। নীল রঙ্গের মাধ্যমে আকাশ বোঝানো হয়, লাল রং দিয়ে আগুন, সবুজ রং দিয়ে পানি, সাদা রং দিয়ে মেঘ এবং হলুদ রং দিয়ে পৃথিবীকে বোঝানো হয়।
স্থানীয় লোকদের কাছে এই পতাকাগুলো ভক্তি প্রদর্শনের এক মাধ্যম। এ পতাকাগুলো যেন ভুটানের শান্তি এবং উন্নতিকে তুলে ধরে।
ডচুলা পাস-এ ভ্রমণ পর্যটকদের মাঝে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এখানে এসে আপনি আপনার সামনেই দেখতে পাবেন বরফে ঢাকা হিমালয়। আপনি হেঁটে বা গাড়িতে করে যেভাবেই ভ্রমণ করুন না কেন চারপাশের অপরূপ সৌন্দর্য আপনার মনে এক গভীর অনুভূতি সৃষ্টি করবে।
ডচুলা পাস থেকে মুক্ত আকাশ। ছবি : ওয়ার্ল্ড ট্যুর প্ল্যান
চরটেন্স বলতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভকে বোঝায়। এখানে নির্মিত বৌদ্ধ মন্দিরগুলো ২০০৩ সালে ভারতের অসমীয় জনগণের সাথে শহীদ হওয়া সৈন্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মিত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভূটানের রাজাই বিজয়ী হয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে ২৩ই ডিসেম্বর ২০০৩ সালে এই স্মৃতিস্তম্ভের জায়গাটি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৪ সালে সম্পূর্ণ হয়। সেই একই মাসে পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয়েছিল।
ডচুলার চরটেনগুলো তিনটি স্তরে তৈরি করা হয়েছিল। প্রথম স্তরে আছে ৪৫টি চরটেন, দ্বিতীয় স্তরে আছে ৩৬টি চরটেন এবং তৃতীয় স্তরে আছে ২৭টি চরটেন। এই সবগুলোই প্রধান কাঠামোর চারপাশে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি চরটেন যথাযথ ধর্মীয় নীতিমালা অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে।
চতুর্ভুজ আঁকার নির্মিত কাষ্ঠ দন্ড প্রতিটি চরটেনে পাওয়া যায়। এটিকে বলা হয় সকসিং এবং বিশ্বাস করা হয় এটি পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে থাকে।
সম্পূর্ণ ডচুলার চরটেনগুলো। ছবি : থ্রিলিং ট্রাভেল
সকসিং জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে তৈরি করা হয়েছে। খুবই উজ্জ্বল লাল রং দিয়ে এর ওপর অঙ্কন করা হয়েছে। এর পাশেই রয়েছে ভুটানের প্রথম রাজকীয় বোটানিক পার্ক। ডচুলা পাসের উচ্চতা বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন রকম। তবে সব মিলিয়ে এর গড় উচ্চতা ধরা হয় ১০ হাজার ২০০ ফুট থেকে ১০ হাজার ৩০০ ফুট পর্যন্ত। এটি ভুটানের সবচেয়ে উঁচু চূড়া।
ভুটানের সবচেয়ে উঁচু চূড়া এমটি মাছাঙজ্ঞ্যাং ( ২৩ হাজার ফুট)- এর নিকটে অবস্থিত এটা। ডচুলা পাস এবং শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভের নিকটে অবস্থিত রয়েছে একটি সন্ন্যাসীদের আশ্রম যার নাম ড্রাক ওয়াঙ্গলাঙ্গ লহাখাঙ্গ। এটি তৈরি করা হয়েছিল রাজা জিগমে সিংগিয়া'র প্রতি সম্মান জানিয়ে। ডচুলা পাস নির্মাণের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা হয়েছিল এমন জায়গায় তৈরি করা যেখান থেকে একই সাথে তুষার এবং হিমালয় পর্বত দেখা যাবে। আর আশ্রমে স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রতিদিন প্রার্থনা করতে দেখা যায়।
এই আশ্রমটি নির্মানে অনেক বছর সময় লেগেছিল। প্রায় ১০০ বছর সময় লেগেছিল। সব মিলিয়ে এর কাজ সম্পন্ন হয়েছে ২০০৮ সালের জুন মাসে। এখানে দেয়ালগুলো ভুটানের মানুষের জীবনযাপনের ওপর ভিত্তি করে অঙ্কন করা হয়েছে। এই দেয়ালে একই সাথে শত বছরের পুরনো শিল্পীদের ও বর্তমান যুগের শিল্পীদের চিত্রকর্ম দেখতে পাওয়া যায়। অতীত এবং বর্তমান একসাথে মিলেমিশে এক অভূতপূর্ব শৈল্পিক সৃষ্টির জন্ম দিয়েছে।
ডচুলা উৎসব । ছবি : ড্রাক ট্রেইল
প্রতি বছর আশ্রমের খোলা আঙ্গিনায় ডচুলা উৎসব পালন করা হয়। এটি সাধারণত ১৩ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠান উদযাপন যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১১ সাল থেকে। অনুষ্ঠানে আসলে আপনি ভুটানের সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে পারবেন। ভুটানের আবহাওয়া খুবই চমৎকার। তাই বছরের যেকোনো সময় পর্যটকরা ঘুরতে যায়। তবে আপনি যদি ভাল সময় খুঁজতে চান ঘোরার জন্য সেক্ষেত্রে এখানে সব থেকে ভালো সময়ে ভ্রমণ উপযোগী সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত।
কীভাবে যাবেন :
বাংলাদেশ থেকে যেতে হলে প্রথমত বিমানবন্দর থেকে আপনাকে ভুটানের পারো বিমানবন্দরে যেতে হবে। আপনার সময় লাগবে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট এবং খরচ পরবে প্রায় ২০ হাজার টাকা। পারো বিমানবন্দর থেকে একটি ট্যাক্সিতে করে আপনি ১ ঘন্টা ৪০ মিনিটে যেতে পারবেন ডচুলা পাসে।
খাওয়া-দাওয়া এবং থাকার ব্যবস্থা :
ডচুলা পাসের নিকটে নামকরা বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট রয়েছে। যেমন : পিউর ভেজ রেস্টুরেন্ট, প্রজেট জেট জেট এ, জুমবালা। সুস্বাদু খাবার খেতে পারেন এখানে। এছাড়া ডচুলা পাসের আশেপাশে অসংখ্য হোটেল রয়েছে। জনপ্রিয় কয়েকটি হোটেলের নাম হলো : থরি রিসোর্ট, যেখানে প্রতি রাতের জন্য খরচ পরবে প্রায় ৪ হাজার টাকা। হোটেল ভুটান, যেখানে প্রতি রাতের জন্য খরচ পরবে ৩,৬০০ টাকা। আমাস সুইটস, যেখানে প্রতি রাতের জন্য খরচ পরবে প্রায় ৪,০০০ টাকা।
জান্নাতুল ফেরদৌস
এস এম