দোহা, কাতার : আরব বিশ্বের বিস্ময় সপ্তাচার্যের একটি শহর
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : পারস্য উপসাগরের তীরে এক নয়নাভিরাম শহর দোহা
যেন সব সময়ই আলো ছড়াচ্ছে দোহা শহর। ছবি : বিজনেস ক্লাব
পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অসাধারণ শহর দোহা, কাতারের রাজধানী। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত তুলনামূলক গরীব দেশে থাকলেও নিজেদের যথাযথ কার্যক্ষমতায় এখন এটি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ। এখানকার মানুষ এত গরীব ছিল যে প্রাগৈতিহাসিক যুগে নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ ধরার অভিযানে বের হয়ে বাসিন্দারা শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো। হয়তোবা মনে হতে পারে বর্তমানের এমন মরু এলাকায় কীভাবে মানুষ মাছের অভিযানে বের হতো।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের গবেষণায় পাওয়া গিয়েছে যে, কাতারের আবহাওয়া একসময় ছিল বৃষ্টিবহুল, ছিল জলপ্রপাত এবং পরিষ্কার পানির নালা। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী এবং জনবহুল শহর দোহা। এর জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার। পারস্য উপসাগরের উপকূলঘেঁষে অবস্থিত শহরটি কাতারের অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি। দেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক শহরের প্রাণকেন্দ্র দোহায় বসবাস করে। ১৮২০ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও ১৯৭১ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে কাতারের রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়।
শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অঞ্চল হিসেবেই নয় এক অভাবনীয় নেটওয়ার্কিং এর প্রচার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাতারের রাজধানী। বিশ্বের অন্যতম গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এই শহরে অবস্থিত।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের সফল আয়োজক হিসেবে ও ক্রীড়া অনুষ্ঠান আয়োজন করে এক অদ্বিতীয় মাত্রায় পৌঁছেছে । এর মধ্যে ছিল ২০০৬ সালের এশিয়ান গেমস, ২০১১ সালে আরব গেমস, ২০১১ সালে এএফছিছিছি গেমস। শুধু তাই নয় ২০২২ সালের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের অনেক খেলার ভেন্যু হিসেবে তৈরি হচ্ছে দোহা। এমনকি উল্লেখযোগ্য জলবায়ু সম্মেলনের আয়োজক দোহা।
ছবি : বস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ
কাতার উত্তপ্ত ও সুষম এলাকা হওয়ায় এখানে নেই কোনো জলাশয় এবং নেই কোনো উল্লেখযোগ্য প্রাণীর বিচরণ। উদ্ভিদ থাকলেও তা সংখ্যায় একদমই যৎসামান্য। কিন্তু খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় মজুদ থাকার কারণে দেশটি এই ঘাটতি থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনৈতিক চাকাকে দৃঢ় করে নিজেদেরকে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ হিসেবে সু-প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। প্রকৃতপক্ষে কাতার একটি ছোট দেশ।
কিন্তু আয়তনে ছোট হলেও এর বিচিত্র আকর্ষণ পর্যটকদের কখনও দূরে সরিয়ে দেয়নি। প্রতিদিনই পর্যটকদের জন্য নিত্যনতুন সুবিধা সংযোগ করা হচ্ছে। ভ্রমণপিয়াসী মানুষদের জন্য দোহা একটি অসাধারণ জায়গা। কিন্তু তাপমাত্রা অত্যাধিক থাকার কারণে ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে যাওয়াটাই সর্বোত্তম। এসময়ের তাপমাত্রা দিনের বেলায় থাকে প্রায় ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে ১৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত থাকে।
যেহেতু মরু এলাকা, গরমকাল এখানে দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত প্রচণ্ড গরম পরে।
যারা ফটোগ্রাফি ভালোবাসেন তাদের জন্য দোহা একটি অপূর্ব জায়গা। বলা হয়, পর্যটকদের জন্য এটি পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ জায়গা। এখানকার সর্বোপরি আতিথেয়তা যেন পর্যটকদের আকর্ষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আকর্ষণীয় শহরটিতে আপনি পাবেন বৈচিত্র্যময় খাবার, সমুদ্র সৈকত, বালুময় পাহাড় এবং ভ্রমণের জন্য বিভিন্ন জায়গা।
উটের পিঠে চড়ে ভ্রমণ করতে পারবেন ইচ্ছামতো। ছবি : গেট ইউর গাইড
আপনি আপনার সকালবেলা শুরু করতে পারেন উটের পিঠে চড়ে, এরপর রাজপ্রাসাদে ভোজন করতে পারেন, ভোজন শেষে বিলাসবহুল সৈকতে রৌদ্রস্নান করতে পারবেন, বিকালে পৃথিবীর বিখ্যাত চিত্রকর্ম শিল্প গ্যালারি থেকে ক্রয় করতে পারেন এবং শেষে সন্ধ্যায় পরিশ্রান্ত মনে হোটেলে অবসর বিনোদন করতে পারবেন। দোহা এমন একটি জায়গা যেখানে আকর্ষণের কোনো কমতি নেই। ভ্রমণ করাটাও অনেকটা সহজলভ্য।
আপনি যখন প্রাণবন্ত সৌক ওয়াকিফ রাস্তায় পায়চারি করবেন সাথে সাথে নিজেকে অন্য এক কালে আবিষ্কার করবেন। সৌক ওয়াকিফ একটি পূর্ণাঙ্গ জায়গা যেখানে আপনি ব্যবসায়িদের দ্রব্যাদি উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয়, সুগন্ধির সম্ভার, অত্যাশ্চর্য পারিপার্শ্বিক আর্কিটেকচার ডিজাইনের মাধ্যমে এখানকার ঐতিহ্যের স্বাদ, গন্ধ, অভিজ্ঞতা আস্বাদন করতে পারবেন। আপনি এখানকার ছোট ছোট দোকানগুলোর কারিগরি কাজ, কাপড় ও স্মারকগ্রন্থের বিস্তীর্ণ সংগ্রহশালায় গোলক ধাঁধায় পরে যাবেন।
ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রদর্শনী, মনমুগ্ধকর সুরধ্বনি আশেপাশের অবস্থাকে আরও সমৃদ্ধশালী করেছে। এই সবকিছুর সাথে সামিল হওয়ার জন্য ব্যাপক পর্যটকদের ব্যবস্থাও করে দিয়েছে। ভ্রমণকারীদের জন্য এটি অবশ্যই একটি দেখার মত জায়গা।
পার্ল কাতার-এর একটি স্তম্ভ। ছবি : রবার্ট হার্ডিং
পার্ল কাতার একটি বিলাসবহুল জনপ্রিয় দ্বীপ যা মানুষের তৈরি। যাদের ধনবান ব্যক্তিদের জীবন নির্বাহ করা সম্পর্কে কৌতুহল রয়েছে তারা এখানে যেতে পারেন। যদিও এটি একটি বিলাসবহুল জায়গা অন্যদিকে এখানে রয়েছে জনপ্রিয় ডাইনিং স্পট, রেস্তোরাঁ এবং ক্যাফে যা কিনা পর্যটকদের সাধ্যের মধ্যেই। এই সব কিছুর পাশ দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য নদী সরোবর চলে গিয়েছে দূরের এক পথ।
আইকনিক মরুভূমির দুর্গ, জুবেরাহ দুর্গ। ছবি : উইকিপিডিয়া
কোনো ভ্রমণই সম্পূর্ণ হবে না যদি না আপনি জুবেরাহ দুর্গে না যান। কাতারের এটি একটি আইকনিক মরুভূমির দুর্গ। এখানে রয়েছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত মিউজিয়াম।
দুর্গ সম্পর্কে ছোট প্রদর্শনী এবং পারিপার্শ্বিক এলাকাগুলো না দেখে থাকার মতো নয়। এটি খুব একটা দূরে অবস্থিত নয়, দোহা থেকে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগে জুবেরাহ দুর্গে পৌঁছতে।
ঐতিহাসিক এবং ইসলামিক শিল্পসমৃদ্ধ শেখ ফয়সাল বিন কাসেম কাল থানি জাদুঘর। ছবি : উইকিমিডিয়া কমনস
শিল্প প্রেমিকরা ভেবে থাকতে পারেন যে দোহায় দেখার মতো আর কি আছে। কিন্তু যখন শিল্প প্রেমিকরা বিশেষ একটি জাদুঘরে শিল্প সংগ্রহশালা দেখবেন, তাদের মন হয়ে যাবে পরিতুষ্ট। শেখ ফয়সাল বিন কাসেম কাল থানি জাদুঘরটি তেমনই একটি জায়গা। সম্পূর্ণ জাদুঘরটির চারটি অংশে বিভক্ত : মুদ্রা ও বিনিময় পণ্য, প্রাচীন বাহন, ঐতিহাসিক এবং ইসলামিক শিল্প।
এখানকার হৃদয়স্পর্শী সংগ্রহশালাটি তৈরি করতে প্রায় বহু বছর সময় লেগেছে। জুরাসিক সময়কালের নানা সংগ্রহীত তথ্যাদি ও বিষয়বস্তু আপনাকে তাক লাগিয়ে দিতে বাধ্য।
দোহায় অবস্থিত ইসলামিক শিল্প জাদুঘর কাতারের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়েছে। ১৪০০ বছর পূর্বের ইসলামিক নানা সংগ্রহশালা আপনি দেখতে পাবেন। ইসলামিক শিল্প জাদুঘরে মধ্যপ্রাচ্যসহ তুর্কি, ইরান, ইজিপ্ট ও বিভিন্ন দেশের ইসলামিক ইতিহাসের যে সর্বজনীন সংযুক্তি তা এখানে পাওয়া যায়।
ছবি : ট্রিপ এডভাইজর
যারা দোহায় ভ্রমণ করতে আসেন নিজেদের তালিকা থেকে তারা কখনও প্লেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়া অংশটি বাদ দেন না। আপনিও অনেক উঁচু থেকে আধুনিক এই শহর যা মরুভূমিতে ঘেরা এই সুন্দর দৃশ্য দেখতে হলে অবশ্যই সহজেই এখানে তা করতে পারেন।
স্কাই ডাইভিং না করার কোনো প্রশ্নই আসে না। আর এখানকার স্কাই ডাইভিং অনেক নিরাপদ এবং যারা নির্দেশনা দিয়ে থাকেন তারাও অনেক দক্ষ।
দোহার টর্চ নামে পরিচিত এস্পায়ার টাওয়ার ছবি : আলমোসোফার ডট কম
এস্পায়ার টাওয়ারকে বলা হয় দোহার টর্চ যা ৩০০ মিটার লম্বা। এটি আরও বেশি পরিচিতি লাভ করেছে ১৫তম এশিয়ান গেমস আয়োজন করার মাধ্যমে।
পূর্বে বসবাসরত বেদুইনরা বাজপাখিদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিত শিকার করার জন্য। তারই ধারাবাহিকতায় দোহায় রয়েছে ফ্যালকন সোক যেখানে ডজন ডজন দোকান রয়েছে বাজপাখিদের ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য। আপনি যদি সৌভাগ্যবান হন তাহলে বাজপাখিদের শারীরিক ক্ষমতার ওপর নিলামে যে দর কষাকষি হয় তা দেখতে পাবেন।
ছবি : আরবান ক্যাপচার
এছাড়াও দোহায় রয়েছে অতুলনীয় বার্জান টাওয়ার, ভিলেজিও মল যেখান থেকে কেনাকাটা করতে পারবেন। এছাড়া রয়েছে ওয়েস্ট বে, অনন্য লুসাইল কাতারা হোটেলসহ মন মাতানো আরও অসংখ্য জায়গা। কাতারের এয়ারলাইন্সে আপনি খুব সহজেই মাত্র ৫ ঘণ্টা ২০ মিনিটে ঢাকা থেকে দোহায় সরাসরি পৌঁছতে পারবেন। এক্ষেত্রে আপনার খরচ পড়বে ২৪ হাজার টাকা থেকে ৬৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। দোহা ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য একটি অনন্য জায়গা।
সুস্বাদু খাবার থেকে শুরু করে এখানকার আর্কিটেক্ট ডিজাইন, আতিথিয়তা আপনাকে ভ্রমণ করতে বারবার ডাকবে। তবে মনে রাখতে হবে এখানে ড্রাগ, অ্যালকোহল, পর্নোগ্রাফি, শুকুরের মাংস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাহলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন কাতারের এই বিলাসবহুল রাজধানীতে।
দোহা সাধ্যের মধ্যে ভ্রমণের জন্য সুন্দর একটি জায়গা। সেখানে যেয়ে আপনার মন হবে পরিতুষ্ট এবং পরিবারের সাথে একটি ভালো সময় অতিবাহিত করার সুযোগ পাবেন। শুধু পরিবারই নয় বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঘোরার জন্য একটি দারুন পর্যটক স্থান।