তাব্রিজ : প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী ও ইতিহাস ঐতিহ্যের শহর
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ইরানের পঞ্চম বৃহত্তম শহর তাব্রিজ
শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে সমৃদ্ধ এক শহরে পরিণত হয় তাব্রিজ; ছবি : উইকিপিডিয়া
ইরানের উত্তর আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী তাব্রিজ শহরটির রয়েছে নানান পরিচয়। এটি ছিল প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী আর বর্তমান ইরানের প্রাদেশিক রাজধানী। তাব্রিজ ইরানের পঞ্চম বৃহত্তম শহর। ইস্পাহানের মাশহাদ এবং তেহরানের পর ইরানের চতুর্থ জনবহুল শহর এটি। তবে মূলত ঐতিহ্যের শহর হিসেবেই সারা বিশ্বে এই শহরের পরিচিতি রয়েছে।
ইতিহাস
প্রাচীন ঐতিহ্য আর ইতিহাসের অসংখ্য নিদর্শন ছড়িয়ে আছে পুরো তাব্রিজ শহর জুড়ে। চলুন জেনে নেয়া যাক ইতিহাসে আর ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই শহর সম্পর্কে। যিশু খ্রিস্টের জন্মেরও শত বছর আগে ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় এই শহরের অস্তিত্ব। বিশ্ব বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী 'ব্লু মস্ক'-এর কাছে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রথম সহস্রাব্দের একটি কবর পাওয়া গেছে। রাজা সার্গন দ্বিতীয় এর শাসনামল ৭১৪ অব্দের আসিরিয়ান একটি এপিগ্রাফ এ তাব্রিজের কথা লেখা আছে। প্রথম যুগের ইতিহাসেও তাব্রিজ শহরটি অনেক শাসকের রাজধানী ছিল। সাসানী সম্রাটদের শাসনামলে বর্তমান তাব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর তৃতীয়, চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে অথবা সপ্তম খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।তাব্রিজ জয় করার পর ইয়েমেনের মুসলিম 'আজদ' গোত্র এখানে বসবাস শুরু করে। ৭৯১ খ্রিস্টাব্দে ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর খলিফা হারুন-আর-রশীদ এর স্ত্রী জুবাইদা এটি পুনরায় তৈরি করে তাব্রিজের সৌন্দর্য বর্ধন করেন। যেসব পশ্চিমা অভিযাত্রী ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রাচ্যে ভ্রমণ করেছেন, তারা তাব্রিজ শহরের বিশালাকৃতির সব ভবনের স্থাপত্যশৈলী, ধন-সম্পদের প্রাচুর্য এবং প্রসিদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
এমনকি মার্কো পোলোও তাব্রিজে এসেছিলেন। তিনি সিল্ক রোড ভ্রমণের সময় ১২৭৫ সালে তাব্রিজ দর্শন করেছিলেন। তিনি এ শহর সম্পর্কে বলেছেন, 'মনোমুগ্ধকর ও সুন্দর বাগানে ঘেরা বিশাল এক শহর'। কারা কনলু শাসকদের শাসনামলে ১৩৭৫-১৪৬৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এটি আজারবাইজানের কারা কনলু রাজ্যের রাজধানী ছিল। পরবর্তীতে তাব্রিজ শাফবীদের হাতে চলে যায়। এরপর কিছুদিন অটোম্যান সুলতানরাও তাব্রিজ শাসন করেছিলেন। এরপর পারস্য সেনাবাহিনী আবারও তাব্রিজ পুনরুদ্ধার করেছিলো। কাজার রাজ বংশের শাসনকালে তাদের ক্রাউন প্রিন্স এখানেই থাকতেন।
বিভিন্ন প্রাচীন স্থাপত্য রয়েছে এই শহরটিতে; ছবি : উইকিপিডিয়া
রাজনীতি :
পশ্চিমের সাথে যোগাযোগ সহজ হওয়ায় ভূ-তাত্ত্বিক কারণে শহরটি ইরানের সাংবিধানিক বিপ্লবের কেন্দ্র ছিল। পরে ইরানের কয়েকটি রাজনৈতিক এবং বিপ্লব পট পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছিল তাব্রিজ। রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোতে তাব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলো। এই শহরটি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র। এই শহরের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে পর্যটন ও শিল্প। তাব্রিজ নানা রকম যন্ত্রপাতি, বস্ত্রশিল্প, পেট্রোক্যামিক্যাল, শোধনাগার এবং অটোমোবাইলের মতো সব ভারী শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু হস্তশিল্পের জন্য এ শহরটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। শহরজুড়ে দীর্ঘদিনের ইরানের ইতিহাসের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপত্য রয়েছে পালাবদলের প্রমাণ হিসেবে। যুদ্ধ আর ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বেশিরভাগ স্থাপত্যশিল্প নষ্ট হয়ে গিয়েছে। শুধু কাজার, শাফবী এবং মঙ্গোল শাসনামলের স্থাপত্যশিল্পগুলো টিকে আছে।তাব্রিজ এর ঐতিহাসিক বাজার :
সারা বিশ্বে এই শহরের ঐতিহাসিক বাজার বেশ বিখ্যাত। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা এই বাজার দেখতে আসেন। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহত্তম বাজার হলো ঐতিহ্যবাহী এই বাজারটি। বিখ্যাত সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিলো এই ঐতিহাসিক বাজারটি। বাজার ভবনটি তৈরি করা হয়েছে ধনুকাকৃতির ছাদের নিচে যা নান্দনিক নকশাখচিত। বাজারে দোকানগুলো একটি আরেকটির সাথে সংযুক্ত। মশলা, কার্পেট, নানান রকম খাবার সামগ্রী-সবকিছুর সম্ভার যেন এই বাজারটি। শাফবী শাসনামলে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই বাজারটি প্রসিদ্ধ ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠে।ঐতিহ্যবাহী এবং নান্দনিক শিল্পকর্মের এই বাজারটিকে ২০১০ সালে ইউনেস্কো 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট' হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৪৬৫ সালে, শাসক জাহান শাহের আমলে তৈরি করা হয়েছিলো ব্লু মস্ক। নীল রঙের মোজাইক দিয়ে নিখুঁত, নিপুণ শৈলীর কারুকার্যখচিত চোখ ধাঁধানো । ঐ সময়ে এই স্থাপত্যশিল্পের জনপ্রিয়তা ছিলো সারা বিশ্বজুড়ে। দুর্ভাগ্যবশত এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে, ১৭৭৩ সালে এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই মসজিদটি পুনরায় ধীর-স্থিরভাবে নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে এই মসজিদের মনোরম ও নিখুঁত নীল কারুকার্য এবং ক্যালিগ্রাফির কাজ সম্পন্ন হয়।
তথ্যসূত্র: ১। https://www.britannica.com/place/Tabriz ২। https://www.eavartravel.com/en/blog/2019/2/6/130472/blue-mosque-tabriz/irantourismer.com/wp-content