ঐতিহাসিক দুবলহাটি রাজবাড়ী, নওগাঁ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : দুবলহাটি রাজবাড়ী


দুবলহাটি রাজবাড়ী

ছবি : সংগৃহীত


যুগের পর যুগ ধরে অতীতের সোনালি ইতিহাস আর সমৃদ্ধ সময়ের সাক্ষী প্রাচীন জমিদার বাড়িগুলো ভ্রমণপ্রেমীদের সবসময় আকর্ষণ করে। বহমান সময়ের সাথে জমিদার বাড়ির পলেস্তারা ভাবনার দেয়ালের মত খসে পড়লেও এর সাথে জড়ানো ঐতিহ্য ও স্মৃতি কখনোই মুছে যায় না। কালের সাক্ষী হয়ে তাই জমিদার বাড়িগুলো জানান দেয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা। আমাদের দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্যশৈলীগুলো ভ্রমনপ্রেমীদের মনে করিয়ে দেয়, সেসময়ও আমাদের দেশ স্থাপত্য শিল্পে কতটা সমৃদ্ধ ছিল। আজ তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ির কথা জানাবো। জমিদার বাড়িটির নাম দুবলহাটি রাজবাড়ি। আমাদের দেশের অন্যান্য সব রাজবাড়ী থেকে এটি বেশ আলাদা রকমের।

আপনার নওগাঁ ভ্রমণে অবশ্যই দেখে আসবেন অনন্য এই রাজবাড়িটি। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে ভরপুর নওগাঁ জেলার জমিদার বাড়ীগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি রাজবাড়ী এটি। নওগাঁ শহর হতে প্রায় ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে এই রাজবাড়িটি আজো দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। বিশাল জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই জমিদার বাড়ীটি প্রায় দুইশত বছরের পুরানো। পাঁচ একর এলাকাজুড়ে এই বিশাল রাজপ্রাসাদ বিস্তৃত। অনেকটাই বিলুপ্তির পথে থাকা এই জমিদারবাড়িটি আজো সেই সময়ের আভিজাত্যের চিহ্নস্বরূপ দাঁড়িয়ে রয়েছে আপন মহিমায়।

ইতিহাস

ইতিহাস থেকে জানা যায়, জমিদার কৃষ্ণনাথ ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের কাছ থেকে ১৪ লক্ষ ৪৯৫ টাকা দিয়ে দুবলাহাটি এলাকার পত্তন নিয়ে এখানে জমিদারির সূত্রপাত। কৃষ্ণনাথ-এর কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তার কন্যার পুত্র হরনাথ রায় ১৮৫৩ সালের জমিদারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই হরনাথ রায়ের সময়েই দুবলাহাটি রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এই রাজবাড়ি থেকেই তৎকালীন সিলেট, দিনাজপুর, পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও ভারতের কিছু অংশের জমিদারি পরিচালিত হতো। তার সময়কালে এই দুবলহাটি জমিদারির ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। তিনি রাজ প্রাসাদের সৈৗন্দর্য বৃদ্ধি করেন, সংস্কার ও নানান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজ্যের উন্নয়ন করেন।

এছাড়া নাট্যশালা নির্মাণ ও প্রজা সাধারণের সুপেয় জলের কষ্ট দূর করার জন্য রাজ প্রাসাদের পাশে অনেক পুকুর খনন করেন। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই সুবিশাল অট্টালিকাটি আজো মনে করিয়ে সেই সময়কার জাঁকজমক অতীতকে। ইট-সুরকিতে নির্মিত এ রাজবাড়িতে আছে সুরম্য প্রাসাদ, দুর্গা মন্দির, রঙ্গমঞ্চ। কারুকার্যে ঘেরা বারান্দা, রঙিন কাচের অলংকরণ, নানা ধরনের ভাস্কর্য এ জমিদার বাড়িটিকে পরিণত করেছে অনন্য এক আকর্ষণে। বাড়ির মূল ফটকে দেখতে পাবেন রোমান স্টাইলের স্তম্ভগুলো। যা সেই সময়ের রাজাদের অভিজাত রুচির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই জমিদারবাড়িতে মোট ৭টি আঙিনা এবং প্রায় ৩০০ টি ঘর ছিল। প্রাসাদের ভেতরে ভবনগুলো কোনটি ছিল তিনতলা, আবার কোনটি ছিল চারতলা। এখানে শান বাঁধানো একটি কুয়া দেখতে পাবেন।

দুবলহাটি রাজবাড়ী

আজ রাজ্য নেই, নেই কোনও রাজা। তবুও রাজবাড়ীটির জৌলুস আর চাকচিক্য ফুটে ওঠে এর পুরনো কাঠামোতে। প্রাসাদের ভিতরে ছিল রাজরাজেশ্বরী মন্দির। এখানে প্রতি সন্ধ্যায় জ্বলতো সন্ধ্যা প্রদীপ। বেজে উঠত শঙ্খের ধ্বনি। সময়ের কষাঘাতে এটি এখন পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত মন্দিরে। রাজবাড়ির সামনে রয়েছে গোবিন্দ পুকুর, যার পাশে সেই সময় ছিল ‘গান বাড়ি’ নামক ভবন। এখানে বসত গান বাজনা ও যাত্রার আসর। গানবাড়ীর অদূরেই ছিল কালি মন্দির। এখানে এখন আগাছা আর জঙ্গলে পরিপূর্ণ। কালি মন্দির থেকে মাত্র পাঁচশ গজ উত্তরে ছিল রাজার বাগান বাড়ি। বাগানবাড়ি এলাকা জুড়ে ছিল আম বাগান। স্থানীয়রা এই বাগানবাড়িকে ছোট রাজবাড়ি বলে ডাকতো। এছাড়াও এখানে আপনি স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়সহ অনেক ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাবেন। ১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর রাজা হরনাথ রায় চৌধুরী সপরিবারে ভারতে চলে যান। তাদের ভারত গমনের মাধ্যমে এখানে জমিদারির ইতি ঘটে এবং স্মৃতিসরূপ থেকে যায় এই সুবিশাল প্রাসাদ।

যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি যেতে পারেন নওগাঁ। শ্যামলী, হানিফ, ডিপজল ও এস আর ট্রাভেলস এর বাস রয়েছে নওগাঁয়। এসি নন এসি ভেদে ভাঁড়া ৪০০ থেকে ১১০০। এছাড়া ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেন একতা এক্সপ্রেস, লালমনি, নীলসাগর ও দ্রুতযান এক্সপ্রেসে যেতে পারেন নওগাঁ। নওগাঁর হাপানিয়া থেকে ভ্যান বা অটো রিক্সায় দুবলহাটী রাজবাড়ী যেতে পারেন। এছাড়াও গোস্তহাটীর মোড় হতে অটোরিকশায় চড়েও দুবলহাটী রাজবাড়ী পৌঁছাতে পারেন।

যেখানে থাকবেন :

নওগাঁ সদরেও থাকার জন্য ভালো মানের অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে হোটেল আগমনী, হোটেল অবকাশ, আফসার গেস্ট হাউস ইত্যাদি। এখানে ১৫০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে রুম পাবেন। এসিও রুমও পাবেন। সেক্ষেত্রে খরচ আরো কিছুটা বেশী পড়বে।  

আরো পড়ুন ঃ শত বছরের পুরনো গৌরারং জমিদার বাড়িতে একদিন 

রুবাইদা আক্তার   এস এম