এক নজরে দেখে নিন সোমপুর বৌদ্ধ বিহারের ইতিহাস
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : সোমপুর বিহার

অন্যান্য সব অঞ্চলের মতো এই অঞ্চলের সভ্যতাও বেশ পুরনো। একটা জাতির প্রাচুর্য নিহিত থাকে তার সভ্যতার মধ্যে। তবে সভ্যতারা কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়, যা পরবর্তী নানা সময়ে আবিস্কৃত হতে থাকে। আর আবিস্কৃত সেসব সভ্যতাকে পরীক্ষা করেই জানা যায় একটা জাতির শেকড় সম্পর্ক কিংবা খোঁজ মেলে শেকড়ের পথের। বাংলাদেশের নওগাতেঁ আবিস্কৃত হয় সোমপুর বিহারের। খুঁজে পাওয়া শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে এই পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের পুরোনাম শ্রী সোমপুর-শ্রী- ধার্মপালদেব-মহাবিহার-ভিক্ষু সঙ্ঘ। শিলালিপি দেখে অনেক পন্ডিতের ধারণা এটিই পৃথিবীর বৃহত্তম বৌদ্ধবিহার। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থিত যে তিনটি ঐতিহ্য রয়েছে তার মধ্যে এই বিহারটি অন্যতম। বাকি দুটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হলো বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন।
সোমপুর বিহার - ইতিহাস
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই সোমপুর বিহার। অঞ্চলটির নামের জন্যেই অনেকের কাছে এটি পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নামে বেশি পরিচিত। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী প্রাচীন বঙ্গ জনপদে সুদীর্ঘ চার শতক রাজত্ব করেছিল পাল বংশ। মূলত বাংলা ও বিহার কেন্দ্রিক পাল রাজ্য, সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে উত্তর পশ্চিমে পাকিস্তানের খায়বার-পাখতুনখওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রাচীনকালের পাল বংশের রাজারা ছিলেন নিষ্টাবান বৌদ্ধ। ধারণা করা হয়, সোমপুর বৌদ্ধবিহারটি পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপালের সময়েই নির্মিত হয়েছিল। তবে অনেকে এও মনে করেন যে, এই বিহারের নির্মাতা ধর্মপাল ছিলেন না, ছিলেন তার পুত্র রাজা দেবপাল।কারণ, বিখ্যাত তিব্বতীয় ইতিহাস গ্রন্থ ‘পাগ সাম জোন ঝাং’-এর লেখক অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ধর্মপালের পুত্র দেবপাল (৮১০-৮৫০) কর্তৃক সোমপুরে নির্মিত বিশাল বিহার ও সুউচ্চ মন্দিরের উল্লেখ করেছেন। দীর্ঘকাল মাটির ঢিবির নিচে চাপা পড়ে থাকার দরুন এই প্রকান্ড স্থাপনাটি দূর থেকে পাহাড়ের মতো দেখায়। পাহাড়পুর ইউনিয়নের নামকরণ কিন্তু সেই থেকেই। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও সুদূর চীন, তিব্বত, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধরা এখানে ধর্মচর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে আসতেন। দশম শতকে বিহারের আচার্য ছিলে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। মহাপন্ডিত অতীশের জ্ঞানের সুখ্যাতি বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সুদূর তিব্বতেও। প্রচলিত আছে, তিব্বতে গিয়ে তিনি সেখানকার পানির সমস্যা সমাধান করে এসেছিলেন। এই মহাপণ্ডিতের বাড়ি ছিল ঢাকার অদূরে বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে।

ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট
অবশেষ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮০-এর দশকে এর খনন কাজ পুরোদমে শুরু হয় এবং ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে ঘোষণা করে। সোমপুর বিহারটি প্রায় ২৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এতে রয়েছে ১৭৭টি কক্ষ। মাঝখানে প্রকাণ্ড মন্দিরটিকেই মূলত দূর থেকে পাহাড়ের মত দেখায়। এই মন্দিরের বেইসমেন্ট ক্রুশাকার। প্রতিটি ক্রুশবাহুর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ১০৮দশমিক ৩ মিটার ও ৯৫ দশমিক ৪৫মিটার। মধ্যবর্তী স্থানে আরও কয়েকটি অতিরিক্ত দেয়াল কৌণিকভাবে যুক্ত এবং কেন্দ্রে দরজা-জানালা বিহীন একটি শূন্যগর্ভ চতুষ্কোণাকার প্রকোষ্ঠ আছে।এই প্রকোষ্ঠটি মন্দিরের তলদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত বিস্তৃত। এই শূন্যগর্ভ প্রকোষ্ঠটিকে কেন্দ্র করেই সুবিশাল এই মন্দিরের কাঠামো নির্মিত। মন্দিরটির বর্তমান উচ্চতা ২১ মিটারের মত। তবে ধারণা করা হয়, একসময় হয়তো এই মন্দিরের উচ্চতা ৩০ মিটারের বেশি ছিল। তবে, দিন দিন ডেবে যাচ্ছে মূল মন্দিরটা এমনটাই আশঙ্কা নওগাঁ এলাকার স্থানীয়দের। আশির দশকে খনন কাজ শুরু সময়কার উচ্চতা নাকি এখনকার চেয়েও বেশি ছিল। মূল মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটার কাজ দেখতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন রকমের মূর্তির আদলে টেরাকোটাগুলো তৈরি করা হয়েছে।

ধ্বংসাবশেষ
আনুমানিক প্রায় ১২০০ বছর আগের তৈরি করা সোমপুর বিহারের এই ধ্বংসাবশেষ ক্ষণিকের জন্য নিয়ে যায় সুদূর অতীত। শেষ বিকেলে প্রতিটি ইটের লালাভ উজ্জ্বলতা মনে করিয়ে দিতে থাকে মাটি চাপা পড়া এক সভ্যতার কথা। হয়ত মূল মন্দিরের গা ঘেঁষে উঠতে উঠতে অনেকে কল্পনা করতে থাকে এককালের কর্মচঞ্চল এই প্রাঙ্গণের প্রতিচ্ছবি। ভাবতে বাধ্য করবে মহাকালের কাছে নশ্বর মানুষ কত ক্ষুদ্র!যেভাব যাবেন :
দেশের অসাধারণ এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিতে যেতে হলে প্রথমেই যেতে হবে নওগাঁ শহরে। ঢাকা থেকে নওগাঁর দূরত্ব ২৬০ কিলোমিটার। বাসে যেতে সময় লাগে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। ঢাকার আব্দুল্লাহপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর কিংবা গাবতলী বাস স্ট্যান্ড থেকে মোটামুটি যেকোন সময়ই নওগাঁ গামী বাস পাওয়া যায়। নন এসি বাসের ভাড়া ৩৫০-৪৫০ টাকার মতো। এসি বাসের ভাড়া মোটামুটি আটশ টাকার কাছাকাছি। তবে সময় ও সার্ভিস অনুসারে ভাড়ার তারতম্য হতে পারে। নওগাঁ শহর থেকে খুব সহজেই পাহাড়পুর যাওয়া যায়। দল বেঁধে গেলে মাইক্রবাস ভাড়া করে যেতে পারেন সময় লাগবে মোটামুটি ১ ঘণ্টার মত। ভাড়া নেবে ১৫০০-২০০০ টাকার মত। শহর থেকে পাহাড়পুরের দূরত্ব মোটামুটি ৩২ কিলোমিটারের মতো। আসেপাশের খাবার দাবারের ব্যবস্থা খুব একটা ভাল নেই। তাই নওগাঁ থেকেই খাবার নিয়ে গেলে ভাল হয়।যেখানে থাকবেন :
যেহেতু খুব নওগাঁ ছোট শহর এবং এখনও সেভাবে পর্যটন শিল্প বিকশিত হয়নি তাই আগে ভাগেই হোটেল বুকিং দিয়ে যাওয়াই ভাল। যদি কেউ খুব অল্প সময়েরর জন্য যেতে চান এবং সাইটেই রাত কাটাতে চান তাদের জন্য আদর্শ হতে পারে পাহাড়পুর প্রত্নতত্ত্ব রেস্ট হাউস। মূল সংরক্ষিত এলাকার মধ্যেই ছোট্ট পরিসরে প্রত্নত্তত্ব অধিদপ্তরের এই রেস্ট হাউস বুকিং করে রাখতে হবে কিন্তু আগে থেকেই!নাবিলা বুশরা এস এম
