ঢাকার যত ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান (শেষ অংশ)

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: ব্যস্ত নগরী ঢাকা ও এর ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান সমূহ

ঢাকার যত ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান” শীর্ষক প্রথম ও দ্বিতীয় অংশে আমরা বাংলাদেশের ব্যস্ত রাজধানী ঢাকার যথাক্রমে ১৫টি ও ১৩টি দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে জেনেছি। ঢাকাকে আমরা ব্যস্ত নগরী হিসেবে জানি, এর রাস্তাগুলোতে প্রায় সময়ই জ্যাম লেগে থাকে। কিন্তু, এই জ্যাম ,ব্যস্ততার মাঝেও ঢাকায় অনেক সৌন্দর্যও লুকিয়ে রয়েছে, যা উন্মুক্ত করতেই আমরা 'ঢাকার যত ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান' শীর্ষক লেখাটা শুরু করা ,যার প্রথম ও দ্বিতীয় অংশে মোট ২৮টি নান্দনিক স্থান ও এর ঐতিহ্য সম্পর্কে জেনেছি। আজ আরও ১২টি স্থান, এর পরিচিতি ও এর ঐতিহ্য নিয়ে এর শেষ পর্ব দেয়া হলো।


১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক কার্জন হল; ছবি : সংগৃহীত


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত যা মূলত রমনা থানার অন্তর্ভুক্ত।এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এটিতে বর্তমানে ১৩ টি অনুষদ রয়েছে। এটি ১৯২১ সালে ব্রিটিশ ভারতে অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত অক্সব্রিজ (Oxbridge) শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণে স্থাপিত হয়। এই কারণে এটি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে স্বীকৃতি পায়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষত্ব হচ্ছে এটি পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যা একটি দেশ স্বাধীন করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।

২. ঢাকেশ্বরী মন্দির

ঢাকেশ্বরী মন্দির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ঢাকেশ্বরী রোডের উত্তর পাশে অবস্থিত। মন্দিরে প্রবেশের জন্য রয়েছে একটি সিংহদ্বার যা "নহবতখানা তোরণ" নামে পরিচিত। বলা হয় বল্লাল সেন নামে একজন রাজা মন্দিরটি নির্মাণ করেন এবং এখানের ঢাকেশ্বরী মূর্তি ও মন্দির মহারাজা বল্লাল সেনের আমলের। ঢাকেশ্বরী মন্দিরটি চুনাবালির গাঁথুনিতে নির্মিত, যা বাংলার মুসলিম আমলের স্থাপত্য রীতির বৈশিষ্ট্য। এটি ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্দির।

আরও পড়ুন : ঢাকার যত ঐতিহ্যবাহী ও দর্শনীয় স্থান (প্রথম অংশ)


৩. আর্মেনিয়ান গির্জা

আর্মেনিয়ান গির্জা

১৭৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই গির্জাটি; ছবি : সংগৃহীত


আর্মেনিয়ান গির্জা ১৭৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত পুরানো ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত একটি প্রাচীন খ্রিস্টধর্মীয় উপাসনালয়। পূর্বে এখানে আর্মেনীয়দের একটি কবরস্থান ছিলো। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে অনেক আর্মেনীয় ব্যক্তি ঢাকায় আসেন। আগা মিনাস ক্যাটচিক নামক ব্যক্তি গির্জার তৈরির জন্য এই জমি দান করলে এই গীর্জা নির্মাণ করা হয় ।গির্জায় ছিলো একটি ঘণ্টা যা ১৮৮০ সালে আর্থিক অনটনে পরে বাজানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবং পরে ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে গির্জার ঘড়িটি বিধ্বস্ত হয়।

৪. মুসা খা'র মসজিদ

তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মুসা খা মসজিদটি ঢাকার রমনা থানায় অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পশ্চিম পাশে এবং খাজা শাহবাজ খান মসজিদ থেকে দক্ষিণে অবস্থিত। মসজিদটির উত্তর-পূর্ব দিকে রয়েছে মুসা খা এর কবর। পূর্বে মসজিদটির চারপাশ দেয়াল দ্বারা ঘেরা ছিল যা বর্তমানে নেই। মুসা খান ছিলেন বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে একজন।

৫. ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ

ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ ঢাকার ধানমন্ডি থানায় অবস্থিত একটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা যা ঢাকায় অবস্থিত মুঘল স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম । সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার প্রধানমন্ত্রী মীর আবুল কাসেম ১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে এই ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঈদগাহটি সংরক্ষণ করছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। বর্তমানে ঈদগাহটি ঈদের নামাযের জন্য ব্যবহৃত হয়।

আরও পড়ুন : ঢাকা থেকে ডে ট্যুর স্পট সমূহ : পর্ব ২

৬. বেনারসি পল্লি

বেনারসি পল্লী ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত।বেনারসি পল্লীর যাত্রা শুরু ১৯০৫ সালে।এখানে রয়েছে সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় বুনন, নকশা, রঙ এর শাড়ি। বর্তমানে এর চাহিদা বাড়তে থাকায় দেশে বিদেশে এর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৭. বলধা গার্ডেন

বলধা গার্ডেন

জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী এই গার্ডেন তৈরি করেন; ছবি : উইকিপিডিয়া


৩.৩৮ একর নিয়ে গঠিত এই বলধা গার্ডেন মূলত একটি উদ্ভিদ উদ্যান। এই উদ্যানে কিছু এমন প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে যা খুবই দুর্লভ । ১৯০৯ সালে বর্তমান গাজীপুর জেলার বলধার জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী বলধা গার্ডেনের সূচনা করেন। তিনি দুটি উদ্যান তৈরি করেন। প্রথম উদ্যানটির নাম রাখেন "সাইকী"। দ্বিতীয় উদ্যানটির নাম রাখা হয় "সিবলী"। নরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকে এ দুটি উদ্যানকে সম্মিলিতভাবে বলধা গার্ডেন নামে ডাকা হয়। নরেন্দ্রনারায়ণ এখানে একটি পারিবারিক জাদুঘরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

৮. চকবাজার শাহী মসজিদ

চকবাজার শাহী মসজিদ পুরানো ঢাকার চকবাজারে অবস্থিত। এটি মোগল আমলের প্রাচীনতম ইমারত-স্থাপনা। মসজিদটিতে শিলালিপি খোদাই করা আছে যা বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে, মসজিদটি ১৬৭৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান নির্মাণ করেন। মসজিদটির নিচে কিছু কক্ষ রয়েছে যা 'আবাসিক-মাদ্রাসা-মসজিদ' হিসেবে ধারণা করা হয়।

৯. ভাষা শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা

আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ঢাকার পলাশীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের ভেতরে অবস্থিত। ২০১২ সালের ১২ মার্চ মাসে বিচারপতি হাবিবুর রহমান জহুরুল হক হলের ভেতরে ভাষা শহীদ আবুল বরকতের স্মৃতি স্মরণে এই স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন। এ দেশের বীর সন্তানরা মাতৃভাষা বাংলার অধিকার রক্ষা করতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সামনে মিছিল করা অবস্থায় তাদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেন। মাতৃভাষার মর্যাদার জন্য যে কয়জন ভাষা শহীদ প্রাণ দিয়েছেন তাদের মধ্যে আবুল বরকত অন্যতম। তাই তার ত্যাগের স্মরণে এই জাদুঘর নির্মাণ করা হয়।

আরও পড়ুন : বাঙালির গৌরবের স্মৃতিকে জ্বালিয়ে রাখা শিখা চিরন্তন : ঢাকা

১০. উদ্ভিদ জাদুঘর

উদ্ভিদ জাদুঘর ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত। এটি "বাংলাদেশ ন্যাশনাল হারবেরিয়াম"( Bangladesh National Herbarium) নামে পরিচিত। এটি দেশের একমাত্র উদ্ভিদ জাদুঘর। এটি মূলত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে গাছ ও বীজ থেকে শুরু করে লতাগুল্ম ও সাধারণ ঘাসের প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে। এখানে বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ এবং নতুন প্রজাতির উদ্ভিদ নিয়ে কাজ করা হয়। এখনে প্রায় ১৬৯ প্রজাতির নতুন উদ্ভিদ এবং বিলুপ্ত প্রায় এমন ২২৬ প্রজাতির উদ্ভিদও চিহ্নিত করা হয়েছে।

১১. জাতীয় সংসদ ভবন

জাতীয় সংসদ ভবন

বাংলাদেশের অন্যতম সেরা স্থাপত্য জাতীয় সংসদ ভবন; ছবি : সংগৃহীত


জাতীয় সংসদ ভবন ঢাকার শেরে-বাংলা নগর এলাকায় অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রধান ভবন। এটির নকশা প্রণয়ন করেন প্রখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই কান।১৯৬১ সালে জাতীয় সংসদ ভবনের নির্মাণ শুরু হয় এবং ১৯৮২ সালের ২৮শে জানুয়ারি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। এটি মূলত পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য আইনসভা হিসেবে তৈরি করা হয়। এটি দেখতে খুবই সুন্দর। আর এর আশে পাশের পরিবেশও মনোরম,যে কারণে অনেকেই অবসর সময়ে এখানে ঘুরতে আসে।

১২. টাকা জাদুঘর

টাকা জাদুঘর ঢাকার মিরপুর ২ এর বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমীর দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত। এটি মুদ্রা জাদুঘর নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের প্রথম ‘টাকা জাদুঘর’। এটি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ২০১৩ সালের ৫ই অক্টোবর প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাদুঘরটি বাংলাদেশ ও বিশ্বের মুদ্রা ইতিহাস সংরক্ষণ, মুদ্রার ঐতিহ্য ও বিকাশকে সাধারণের মাঝে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। এখানে প্রাচীন বাংলা থেকে শুরু করে আধুনিক কাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের ধাতব মুদ্রা এবং কাগজের নোট সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়াও এখানে মুদ্রা সংরক্ষণের প্রাচীন কাঠের বাক্স ও লোহার সিন্দুক রয়েছে।  

আনিসুর রহমান   এস এম