এক কাপ চা খেতে খেতে জেনে নিন চায়ের ইতিহাসটাও
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : জীবনের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ঘিরে আছে নানান তথ্য
ছবি : রাজা ট্যুর ব্যান্ডিং
বর্তমান বিশ্বে জনপ্রিয় পানীয় হিসেবে চায়ের অবস্থান সবচেয়ে উপরে। চায়ের উৎপত্তির সাথে জড়িয়ে আছে চীনা সম্রাট শেন নাং এর নাম। শোনা যায়, কোনো একদিন ভ্রমণে বেড়িয়ে আহারের সময়ে সম্রাটের জন্য প্রস্তুতকৃত গরম পানির মধ্যে অজ্ঞাত এক পাতা উড়ে এসে পড়ে। জানা যায়, 'ক্যামেলিয়া সিনেনসিস' নামে পরিচিত এই পাতার গন্ধে আকৃষ্ট হন সম্রাট এবং এই পাতা ও চায়ের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন সম্রাট শেন নাং। খ্রিস্টাব্দ ৪ শতকে চীনা অভিধানে চা'কে উল্লেখ করা হয়েছে 'কুয়াং ইয়া' নামে। পরবর্তীতে চীনেই এই চায়ের তৈরি প্রক্রিয়াতে যোগ হয় আদা, কমলার রস কিংবা বিভিন্নরকম মশলা। তৎকালীন প্রচলিত ধারণা ছিল, চা রোগ নিরাময়ী পানীয়। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, চীনের সিচুয়ান প্রদেশে সর্বপ্রথম চায়ের ঘণ লিকার তৈরির প্রচলন শুরু হয়। চায়ের আঁতুড়ঘর চীন ৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের সাথে এবং ৫৬৩ খ্রিস্টাব্দে জাপানের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন শুরু করে। জাপানে চা সীমাবদ্ধ ছিল উচ্চশ্রেণীর মানুষ এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে। জানা যায়, এই ভিক্ষুরা বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের সময়ে তাঁদের সাথে চায়ের বীজ সংরক্ষণ করতেন। ৬৪৮-৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে গোয়োকি নামে এক জাপানি ভিক্ষু প্রায় ৪৮টি বৌদ্ধ মন্দিরে চা বাগান করার সিদ্ধান্ত নেন। ৭২৯ খ্রিস্টাব্দে 'হিকি অচ্চা' নামে গুড়ো চা তৈরি করে জাপানিরা। স্থানভেদে চা বিভিন্ন নামে পরিচিত হলেও আমাদের নিকট প্রচলিত শব্দ চা এসেছে চীন থেকে। ৭২৫ খ্রিস্টাব্দে চীনা সম্রাট এর নামকরণ করেন চা। পরবর্তীতে পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে ১৬১০ সালের দিকে ইউরোপে চায়ের প্রচলন শুরু হয়।
১৬১৮ সালের দিকে চীনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার জার এলিক্সারের জন্য উপহার হিসেবে চা পাঠানো হয়। প্রায় ১৭০০ সালের দিকে ব্রিটেনে চায়ের প্রসার বৃদ্ধি পাবার পরে সঙ্গত কারণেই তাদের হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে চায়ের প্রচলন শুরু হয়। প্রথমদিকে ব্রিটিশদের সাথে চীনের চা সম্পর্কিত ব্যবসায়িক লেনদেন থাকলেও ক্রমশ চায়ের জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ায় এবং চীনের কর আরোপের ফলে এর দাম বৃদ্ধি পায়। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে ভারতের আসাম অঞ্চলে চায়ের উৎপাদন শুরু হয়। ১৮৩৯ সালে এখানেই ততকালীন চীনের চেয়ে উন্নত প্রজাতির ব্ল্যাক টি বা মোটা দানার কালো চা তৈরি হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন গবেষণার পরে চায়ের আরো উন্নততর প্রজাতি আবিষ্কৃত হল এবং লন্ডনের চায়ের বাজারে বিক্রিও হতে থাকল। ১৮৮৬ সালের দিকে ভারতে উৎপাদিত এই ব্ল্যাক টি চীনকে হারিয়ে কালো চায়ের বাজারে শীর্ষস্থান দখল করে নিল। প্রায় সমসাময়িক সময়েই আসামের পাশাপাশি বাংলাদেশের সিলেটেও চায়ের উৎপাদন শুরু হয়। পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা ইত্যাদি জায়গাও চা উৎপাদনে বেশ নাম করে।
রঙ কিংবা স্বাদে যতই রকমফের হোক না কেন সব রকমের চায়ের উৎস এক প্রজাতির ক্যামেলিয়া সিনেনসিস গাছ। ছবি : ক্রোকাস
ইউরোপের বিভিন্ন পরিবার তখন চায়ের ব্যবসা শুরু করল। এদের মধ্যে বেশ প্রসিদ্ধ থমাস লিপ্টন পরিবার, প্রথম জীবনে লিপ্টন একজন মুদি ব্যবসায়ী থাকলেও পরবর্তীতে সিলন বা শ্রীলংকা থেকে চা আমদানি করে ইতিহাস বিখ্যাত হয়ে আছেনে এখনও। দানাদার চায়ের পাশাপাশি টি ব্যাগের প্রচলন হয় ১৯০৮ সালের দিকে। চা ব্যবসায়ী থমাস সুলিভ্যান ছোট সাইজের সিল্কের তৈরি পুঁটলিতে চায়ের নমুনা পাঠাতে গিয়ে টি ব্যাগের ধারণা উদ্ভাবন করেন। এদিকে ভারতীয় উপমহাদেশের ব্ল্যাক টি বিশ্ববাজার দখল করে ফেললেও তৎকালীন ভারতীয় জনগনের মধ্যে চা নিয়ে তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। শোনা যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা রাস্তায় বিনে পয়সায় চা বিলি করত, তাই হয়তো ব্রিটিশরা চলে গেলেও রাস্তার টি স্টলে দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার অভ্যাস এখন অবধি বাঙালিরা সযত্নে ব্যবহার করছে দৈনন্দিন জীবনে।
তথ্যসূত্র : https://blog.bdnews24.com/syed_ashraf_mohiuddin/189494 https://roar.media/bangla/main/food/brief-history-of-tea https://www.prothomalo.com