স্কুল জীবনের স্মৃতি অমলিন, কোন দেশে কেমন টিফিনে কাটছে শিশুকাল

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : স্কুলের বাগানে সবজি চাষ, তা দিয়েই জাপানি শিশুদের টিফিন

recess-time ছবি : লাইফ ইজ অওসাম

স্কুল জীবনে সবচেয়ে পছন্দের সময় কোনটি চিন্তা করলে অনেকেরই মাথায় আসবে টিফিনের মুহূর্তগুলো। টিফিনের সময় ক্লাসরুমে আবার কখনও মাঠে সবাই গোল করে বসে আড্ডা দেয়ার মুহূর্তগুলো। মনে পড়ে যাবে ক্লাসে বসে টিফিনের ঘন্টার জন্য অপেক্ষার কথা। সেই ক্ষুধা পেটে চিন্তা করা, আজ টিফিন বক্সে মা কি দিয়েছে! ক্যান্টিন থেকে কি খাব? ঘন্টা দেয়ার সাথে সাথে ছুটে যেতে হবে ক্যান্টিনে, না হলে লাইনে সবার পেছনে পরে যেতে হবে। এরকম কত স্মৃতিই না মনে পরে টিফিনকে ঘিরে। তবে কখনও কি আমরা ভেবে দেখেছি, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ছেলেমেয়েরা টিফিনে কি খেয়ে থাকে? অন্য দেশের স্কুলের টিফিনের নিয়মগুলো কি! সেই চিন্তা থেকেই এই আর্টিকেলটি লেখা। আসুন জেনে নিই অন্যান্য দেশের মজাদার টিফিনের গল্প।

জাপান  :

japanese-bento-box ছবি : এনডিটিভি ফুড

জাপানের স্কুলে টিফিনের সময়কে বলা হয় লাঞ্চ ব্রেক বা দুপুরের খাবার। জাপানের স্কুলগুলোতে দুপুরের খাবার খাওয়ার কিছু নিয়ম আছে। ছাত্রছাত্রীদের বাসা থেকে টিফিন আনা একদম মানা। তাদের কে স্কুল থেকেই দুপুরের খাবার দেয়া হয়। শুধুমাত্র কলেজের শিক্ষার্থীরা বাসা থেকে খাবার নিয়ে যেতে পারে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা সবাই মিলে প্রতি বছর স্কুলের বাগানে সবজি চাষ করে। সেই বাগান থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিদিনের দুপুরের খাবার তৈরি করা হয়। টিফিনের সময় প্রতি ক্লাসের কয়েকজন শিক্ষার্থী রান্নাঘর থেকে তাদের ক্লাসের খাবার নিয়ে আসে। খাবার নিয়ে আসার সময় যারা রান্না করেছেন তাদেরকে মাথা নত করে ধন্যবাদ জানায়। এরপর খাবার ক্লাসে নিয়ে যাওয়া হয়। লাইন ধরে খাবার নেয়ার আগে ক্লাসের সবাই সাদা এপ্রোন পরে, মাথায় সাদা টুপি দিয়ে চুল ঢেকে নেয় এবং মুখে মাস্ক পরে। খাবারের তালিকায় থাকে পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। যেমন : স্যুপ, স্মেশড পটেটো, মাছ কিংবা মাংস, ফল এবং দুধ। সকল খাবার চপস্টিক দিয়ে খেতে হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে খাবার শেষে সবাই ব্রাশ করে। ব্রাশ এবং ছোট একটি মগ সবার ব্যাগেই থাকে।

সাউথ কোরিয়া :

south korea ছবি : এশিয়া সোসাইটি


সাউথ কোরিয়ার স্কুলগুলোতে টিফিনের ঐতিহ্য সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত। স্কুল থেকেই সকল ছাত্র-ছাত্রীদের দুপুরের খাবার দেয়া হয়। খাবারের পুষ্টিগুণ বিচার করে বিশেষ ধরণের প্লেটে তাদের খাবার দেয়া হয়। প্লেটটি বড় এবং ছোট দুই ভাগে ভাগ করা থাকে। বড় ভাগে দেয়া হয় ভাত এবং স্যুপ, ছোট ভাগে দেয়া হয় সালাদ, ফলমূল, সবজি এবং সামুদ্রিক মাছ। যে সকল শিশুরা অন্যদের তুলনায় বেশি রোগা বা অপুষ্টিতে ভুগে তাদেরকে চামচ দিয়ে মেপে ফিশ ওয়েল বা মাছের তেল খাওয়ানো হয়। এছাড়াও খাদ্য তালিকায় আরো থাকে কিমচি, সিসামে লিভস, মিষ্টিকুমড়ার সুপ, প্যানকেক, অক্টোপাস এবং গাজরের সালাদ।

থাইল্যান্ড  :

থাইল্যান্ডের স্কুলের টিফিন ট্র্যাডিশন অনেকটা জাপানের মতি। ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুল থেকেই দুপুরের খাবার দেয়া হয়। সবাই একসাথে বসার পর খাবার শুরু করে। দুপুরের খাদ্য তালিকায় থাকে, স্যুপ, শুকরের মাংস, ভাত এবং কলাপাতায় পেঁচানো এক ধরণের বিশেষ পুডিং।

তুর্কি :

তুর্কির স্কুলগুলোতে কোনো ক্যান্টিনের ব্যবস্থা নেই। টিফিনের জন্য ১ ঘন্টা সময় বরাদ্দ থাকে। কেউ চাইলে বাসায় গিয়ে খেয়েও আসতে পারে। আবার কেউ চাইলে বাসা থেকে নিজের খাবার নিয়েও আসতে পারে। সাধারণত ছাত্রছাত্রীদের বাসা থেকে আনা টিফিনে থাকে পাউরুটি, ওয়ালনাট বা আখরোট এবং আপেল। যা তাদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহয়তা করে।

ফ্রান্স :

france tiffin ছবি : পিন্টারেস্ট

ফ্রান্সের স্কুলগুলোতে টিফিনের জন্য ১-২ ঘন্টা সময় দিয়ে থাকে।দুপুরের খাবার স্কুল থেকেই দেয়া হয়। খাবারের তালিকায় থাকে- মাছ, পালংশাক, আলু, পনির এবং রুটি বা পাউরুটি। কেউ চাইলে টিফিনের সময় বাসায় গিয়েও খেয়ে আসতে পারে।

ফিনল্যান্ড  :

ফিনল্যান্ডে স্কুলগুলোতে টিফিনকে খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। দুপুরের খাবারের পাশাপাশি সকালে এবং বিকেলে নাস্তারও ব্যবস্থা থাকে। প্রতিটি খাবারের পুষ্টিগুণ বিবেচনা করে দেয়া হয়। ক্যান্টিনে ব্যুফের মত সারি করে খাবার রাখা থাকে। যে যার পছন্দ মত খাবার নিয়ে খেতে পারে। এছাড়াও স্কুলগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং ধর্মানুসারে খাবারের ব্যবস্থা থাকে।

রাশিয়া  :

রাশিয়ার স্কুলগুলোতে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ফ্রি খাবারের ব্যবস্থা থাকে। এরপরে কিছু খেতে হলে টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়। দুপুরের খাবারের তালিকায় থাকে স্যুপ, মাছ, মাংস, ভাত এবং বাদাম। ক্যান্টিন থেকে না খেলে বাসায় গিয়েও খেয়ে আসার ব্যবস্থা আছে।

ইসরাইল :

ইসরাইলে স্কুলগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রদানের জন্য আইন রয়েছে। ইসরাইলের সরকার স্কুলে যেকোনো প্রকার চর্বিজাতীয়, মিষ্টি বা চিনি যুক্ত খাবার রাখতে নিষেধ করেছে। স্কুলের দুপুরের খাবারের তালিকায় থাকে স্যান্ডউইচ, ডিম, টুনা, ফল, সবজি, গ্র্যানলা বার। এছাড়াও অনেকেই নিজ নিজ বাসা থেকেও খাবার নিয়ে আসে। সেগুলোও বেশ স্বাস্থ্যসম্মত থাকে।

ইতালি :

italy school-lunch ছবি : সুপার হেলদি কিডস্

ইতালির বিভিন্ন স্কুলে টিফিনের ঐতিহ্য ভিন্ন ভিন্ন। তবে একটি ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। যা হচ্ছে স্বাদ এবং পুষ্টিগুণে। তবে বেশির ভাগ স্কুলগুলো সকালে নাস্তার পাশাপাশি দুপুরের খাবারও দিয়ে থাকে। সকালের নাস্তায় থাকে ক্র্যাকার বা বিস্কুট, কুকিস এবং বিভিন্ন ফলমূল। দুপুরের খাবারে থাকে পাস্তা বা ভাত, সামুদ্রিক মাছ বা সবজি, মাছ, মাংস এবং পনির। এছাড়াও শারীরিক অসুস্থতা এবং ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে স্পেশাল খাবারেরও ব্যবস্থা থাকে।

অস্ট্রেলিয়া  :

australia tiffin ছবি : অস্ট্রেলিয়া বেস্ট রেসিপি

কম বয়সে মোটা হয়ে যাওয়ার কারণে অস্ট্রেলিয়ার স্কুলগুলোতে চর্বি, লবণ এবং চিনি যুক্ত খাবার বর্জন করা হয়। স্কুলের টিফিনের খাদ্য তালিকায় থাকে স্যান্ডউইচ, সুশি এবং বিভিন্ন ফলসমূহ।

চিলি :

স্কুল থেকেই টিফিনের ব্যবস্থা করা হয়। খাদ্য তালিকা করা হয় পুষ্টিগুণ বিবেচনা করে। খাদ্য তালিকায় থাকে, ভাত, গরুর রোল, ফ্রেঞ্চ ফাই, সালাদ, অ্যাভোকাডো, কমলার জুস এবং বিভিন্ন ফলমূল। 


তথ্যসূত্র : https://www.youtube.com/watch?v=-7YBTX7vnVc https://www.youtube.com/watch?v=hL5mKE4e4uU