করোনা আতঙ্কের মধ্যেই সুইডেন চলছে লকডাউন ছাড়াই

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : জীবন যেখানে থেমে নেই



সুইডেন করোনা ভাইরাস

করোনা আঘাতে থামেনি সুইডেনের গতিশীলতা। ছবি : ইউরো নিউজ


করোনা ভাইরাসের প্রকোপে বিশ্ববাসী যেখানে দিশেহারা, লকডাউন মেনে সুস্থ থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে, সেখানে সুইডেনে কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলা ছাড়া লকডাউনের কোনো বাধ্যবাধকতাই দেয়া হয়নি। পার্কে বসে আড্ডা দেয়া, রেস্টুরেন্ট-ক্যাফেতে বসে খাবার খাওয়া, ল্যাপটপে কাজ করা, বাবা-মায়ের হাত ধরে শিশুদের স্কুলে যাওয়া সবই খুব স্বাভাবিক দৃশ্য সেখানে। প্রাইমারি সব স্কুল খোলা, অফিস চলছে পুরোদমে, রেস্টুরেন্ট, বার, পার্ক সব জায়গাতেই মানুষের উপস্থিতি আছে। তবে হ্যাঁ, স্বাভাবিকের তুলনায় অবশ্যই কিছুটা কম। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম গতানুগতিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা অন্যরকম এখন। সুইডেনের এমন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কেন?


সুইডেন করোনা ভাইরাস

লকডাউনের কৌশল গ্রহণ করেনি সুইডিশ প্রশাসন। ছবি : ফোর্বস


করোনা ভাইরাস নিয়ে তাদের চিন্তা আসলে কেমন? সুইডেন মূলত ভাইরাসের বিষয়টিকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। আক্রান্ত হবার ভয়ে জীবনযাত্রা থামিয়ে দেবার পক্ষপাতি তারা নয়। এর পরিবর্তে দেশটি বেছে নিয়েছে সচেতনতাকে। সুইডেনের জনসংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ। ৯ মে পর্যন্ত দেশটিতে ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২৫,২৬৫। মৃত্যু ৩,১৭৫। এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে উঠেছে ৪, ৯৭১ জন। মৃত্যু সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়লেও সুইডেন লকডাউন দেয়নি।

সরকারি সিদ্ধান্তে আস্থা সুইডেনে সরকারি কর্তৃপক্ষের উপর জনগণের আস্থা অনেক। লকডাউন করে সব কিছু বন্ধ না করা হলেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে আছে-কোনো জায়গায় ৫০ জনের বেশি একত্র হওয়া যাবে না, বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে সাধারণ মানুষ এ মুহূর্তে যেতে পারবে না, ক্যাফেগুলোতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে নিয়ম, বার ও রেস্টুরেন্টগুলোতে শুধু টেবিলে খাবার পরিবেশন করা যাবে।


সুইডেন করোনা ভাইরাস

করোনাকালীন সুইডেন। ছবি : লস এঞ্জেলস টাইম[


এছাড়াও সম্ভব হলে বাড়ি থেকে কাজ করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা, অসুস্থ হলে অবশ্যই বাড়িতে থাকা নিয়মও যুক্ত আছে। সুইডেন অধিবাসী সব নিয়মই মানছে। তাই সরকারকেও জটিল কোনো সিদ্ধান্তে যেতে হচ্ছে না। দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা কেমন তা জানা যায় গবেষণার একটি ফল থেকে। মার্চ মাসে একটি গবেষণায় দেখা যায়, স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর প্রচণ্ড আস্থা রেখেছে ৫০ ভাগ মানুষ। এপ্রিল মাসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১ শতাংশে। একই সময় সরকারের প্রতি আস্থা ৩৪ থেকে দাঁড়িয়েছে ৫৩ শতাংশে।


সুইডেন করোনা ভাইরাস

সুইডেনে থেমে নেই সামাজিক মেলবন্ধন । ছবি : শিকাগো ট্রিবিউন


লকডাউন না করার কারণ সুইডেনের মহামারী বিশেষজ্ঞ অ্যান্ডারস টেগনেলের মতে, লকডাউন করলে যে নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে, আমরা যদি নিজেরাই স্বেচ্ছায় সেগুলো মেনে চলি, তবে সেটিও একই কথা। এজন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা সবাই মিলে এটি করার চেষ্টা করছি। নিজ উদ্যোগে সবাইকে আগের চেয়ে যাতায়াত, চলাফেরা কমিয়ে দিতে বলা হয়েছে। এর আগেও কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়লে সেটির প্রকোপও ধীরে ধীরে কমে এসেছে হার্ড ইমিউনিটির কারণে। কোভিড-১৯ নিয়ে অন্তত এটুকু বলা যায় যে, স্বেচ্ছায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখায় এই সিদ্ধান্ত ফলপ্রসূ হবে। অন্তত যেসব দেশ এটিকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করেছে, তাদের চেয়ে কিছুটা হলেও বেশি ফল পাওয়া যাবে। আশা করা যায়, এ মাসেই সুইডেন হার্ড ইমিউনিটিতে পৌঁছবে।


সুইডেন করোনা ভাইরাস

কিছু সতর্কতা বাদে সুইডেন চলছে নিজের মতো। ছবি : ওয়াশিংটন পোস্ট


 তবে দিন দিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়াই সুইডেন জানে নিজেদের এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তারা বুঝেছে কয়েক সপ্তাহ নয়, এমন অবস্থা চলবে কয়েক মাস পর্যন্ত। তবে তাদের বিশ্বাস এতদিনে তারা এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেবে।

ঝুঁকিতে কারা বেশি সুইডেনের স্বাস্থ্যকল্যাণ অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, করোনাভাইরাসে বেশি ঝুঁকিতে আছেন ৭০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী মানুষ, ওবেসিটি আছে এমন কেউ (বিশেষ করে চল্লিশোর্ধ্ব কেউ হলে), প্রতিবন্ধী, ক্যানসারের রোগী, নিউরোমাসকিউলার রোগ যেমন পারকিনসন আছে এমন কেউ, কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ যেমন, হার্ট ফেল অথবা স্ট্রোকের রোগী, হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিসের জটিলতা থাকলে, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, ফুসফুসে সমস্যা, অ্যাজমা বা লিভারের সমস্যা থাকলে, শরীরের কোনো অঙ্গে অসুস্থতা থাকলে, মেরুদণ্ডে ক্ষত থাকলে কেউ এ রোগে দ্রুত আক্রান্ত হতে পারেন। কারণ শ্বাসকষ্টের সমস্যাসহ শরীরে যে কোনো অংশে দ্রুত ভাইরাল ইনফেকশন ছড়াতে পারে।

সুইডেনে প্রত্যেকের জন্য যে নিয়ম জারি করা হয়েছে-

সুইডেন

সুইডেন করোনা ভাইরাস। ছবি : গেটি নিউজ


বাড়িতে থাকা : ঠাণ্ডা বা ফ্লু-জাতীয় কোনো সমস্যা দেখা দিলে স্বাভাবিক নিয়মেই দিন কাটানো যাবে। তবে অন্তত দুদিন বাড়িতে থেকে সুস্থ হয়ে তবেই বাইরে বের হতে হবে। স্বাস্থ্যকর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা : নিয়মিত সাবান পানি দিয়ে হাত ধুতে হবে। সম্ভব না হলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। হাঁচি-কাশির সময় কবজি দিয়ে মুখ ঢাকতে হবে। দূরত্ব বজায় রাখা : সব ধরনের জনসমাগমপূর্ণ এলাকা যেমন- দোকান, পার্ক, মিউজিয়াম, রাস্তা এড়িয়ে চলতে হবে। বাড়ি থেকে কাজ করা : সম্ভব হলে বাড়ি থেকে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই কর্মীকে আগে জিজ্ঞেস করতে হবে, সে কোথা থেকে কাজ করতে চায়।


সুইডেন

সুইডেন। ছবি : নিউ ইয়র্ক টাইমস


অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ বাতিল : সুইডেনের ভেতরে ও বাইরে পরিবারসহ ছুটি কাটানো, ভ্রমণ সব বাদ দিতে হবে। সুইডেন যদি জনগণের চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করত, অর্থাৎ কে, কখন, কী কারণে বাইরে যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে সেগুলো নজরদারিতে রাখত তবে সাংবিধানিক নীতি ভঙ্গের একটি বিষয় থাকত। সুইডেন কখনো জনগণের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। দেশের শান্তিপূর্ণ সময়ে সুইডেনের সংবিধান অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি করার নিয়ম নেই। অন্যান্য দেশ এমনটি মেনে না চললেও সুইডেন হয়ত ব্যতিক্রমতা পছন্দ করে বলেই সবার থেকে আলাদা।  


নাবিলা বুশরা   এস এম