করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ভারতের লকডাউন চলাকালীন ইন্ডিয়া গেট। ছবি : নিউ ইয়র্ক টাইমস
প্রতিবেশি দেশ ভারত পর্যটকদের কাছে অন্যতম প্রধান এক আকর্ষণ। প্রাকৃতিক-ঐতিহাসিক সমৃদ্ধ দেশটি বিশ্বের ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে অতি আকাঙ্খিত, পর্যটকদের কাছ থেকে প্রতি অর্থবছরে মোটা অংকের মূলধন সংগ্রহ করে থাকে দেশটি। আর তাই দেশটির অর্থনীতির অন্যতম বড় উৎস ও এই পর্যটন খাত।
তবে, চলমান করোনা ভাইরাস মহামারী ভারতের পর্যটন খাতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে, যা দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিকে একটা মারাত্মক ধাক্কা দিবে।
করোনা ভাইরাসের কারনে বিশ্বব্যাপী আর্থিক ধস নেমে আসলে বৈশ্বিক পর্যটন শিল্প ও এর আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়। যার ব্যাপক প্রভাব পরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে। দেশটির অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতে পর্যটন শিল্পের সামগ্রিক ক্ষতি হবে ৪-৫ লক্ষ কোটি রুপি এবং একই সাথে এই মহামারিতে চাকরি হারাবে প্রায় ৪-৫ কোটি মানুষ।
ছবি : সংগৃহীত
মোট ক্ষতির মধ্যে রয়েছে শিল্পটির সংগঠিত খাত-ব্র্যান্ডেড হোটেল, ট্যুর অপারেটর, ট্রাভেল এজেন্সি। ভারতীয় কনফেডারেশন অনুসারে শিল্প মতে, পর্যটন খাতের মূল ভিত্তি হিসেবে এসব সেক্টর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। খাতটি প্রায় ১ দশমিক ৫৮ লক্ষ কোটি রুপির ক্ষতির মুখোমুখি।
বিশাল আয়তনের দেশ ভারত পুরো বিশ্ব পর্যটকদের কাছে এক তীর্থস্থান, পুরো বিশ্ব থেকে ভ্রমণকারীরা দেশটি ঘুরে দেখতে আসেন। বাংলাদেশ থেকে দেশের বাহিরে সবচেয়ে বেশি পর্যটক ভারতেই পাড়ি জমান। এত পর্যটকদের জন্যে দেশটিতে রয়েছে অসংখ্য পরিমাণে হোটেল-রিসোর্ট।
বন্ধ রয়েছে ভারতের সড়ক যোগাযোগ। ছবি : ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম
শিল্প সংস্থা জানিয়েছে যে, ব্র্যান্ডেড হোটেল গ্রুপগুলো প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার কোটি রুপি, অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ৪ হাজার ৩১২ কোটি রুপি, ট্যুর অপারেটর (ইনবাউন্ড ও ডমেস্টিক) ২৫ হাজার কোটি, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুর অপারেটররা প্রায় ১৯ হাজার কোটি এবং ক্রুজ পর্যটন ৪১৯ কোটি রুপি ক্ষতির মুখোমুখি।
ভারতের বিমান শিল্প ও কার্যত বন্ধ। ছবি : ইকোনোমিক টাইমস
ভারতের কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, সরকার এই খাতকে সহজ ঋণচুক্তি, কার্যনির্বাহী মূলধন এবং ঋণ পরিশোধ স্থগিতকরণের বিষয়ে বিবেচনা করছে। গত মাসে দেশটির পরিবহন ও পর্যটন বিষয়ক একটি সংসদীয় প্যানেলে খোদ মন্ত্রণালয় শিল্পের অনুমানের বরাত দিয়ে পাঁচ লাখ কোটি রুপির প্রতিবেদন দিয়েছে।
সংগঠিত সেক্টর ব্যতীত, পর্যটন শিল্প ছোট হোমস্টে, ব্রেড এন্ড ব্রেকফাস্ট এবং ছোট ছোট হোটেলগুলোও মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। এসব সেক্টরে যে বিশাল পরিমাণে মানুষের কর্মসংস্থান ছিল তাও এই সংকটের পরে আর বহাল থাকবে না বলেই শংকা প্রকাশ করছে।
হোটেল তাজ, মুম্বাই। ছবি : মুম্বাই মিরর
ভারতের ১০টি পর্যটন, ভ্রমণ ও আতিথেয়তা সংস্থার জাতীয় ফেডারেশন ফেইথ (FAITH) ব্যবসায়ের সমস্ত দিক বিবেচনা করে লোকসানের সামগ্রিক মূল্য পাঁচ লক্ষ কোটি রুপি দাঁড় করানোর প্রস্তাব দেয়।
সংস্থাটি বলছে, 'সমস্যাটি হ'ল আমাদের দেশে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটকরা আসেন এবং দেশের মধ্যে এমন কিছু লোক আছেন যারা গ্রীষ্মের ছুটিতে, পূজায় বা ডিসেম্বরে দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ করেন এবং বাকি সময় বিদেশে যাওয়ার লোকও আছে। এখন বাইরে থেকে কেউ আসছেন না। করোনা ভাইরাসের কারণে আমাদের মূল উত্সের বাজারগুলো ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আগামী ১২-১৮ মাসের মধ্যে ভারতের বাজারে এই পর্যটকরা ফিরে আসবে বলেও আশা করতে পারছি না।'
করোনার প্রকোপে শূন্য রাজস্থান। ছবি : সংগৃহীত
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ)-এর মতে, করোনা ভাইরাস মহামারী বিশ্ব ভ্রমণ এবং পর্যটন খাতের প্রায় ৫ কোটি চাকরি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। যে ৫ কোটি চাকরি হারাতে পারে তার মধ্যে প্রায় ৩ কোটিই এশিয়ার বাজার থেকে হারাবে।
পর্যটন ‘শিল্পটি আজ একটি অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে’ বলে মনে করছেন সিআইআই-এর ন্যাশনাল চেয়ারম্যান ট্যুরিজম কমিটি, দীপক হাকসার। তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে "আমরা প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে পর্যটন খাতের সাথে সম্পর্কিত এমন প্রায় ৪-৫ কোটি মানুষের কর্মহীন হবার আশঙ্কা করছি।
ভারতের বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত গোয়া এখন পর্যটনশূন্য। ছবি : সংগৃহীত
তিনি বলেন, ভ্রমণ ও পর্যটন খাতটি ‘লকডাউন পরিস্থিতির’ মুখোমুখি, আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ অবসর এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের উভয়ই এই মুহূর্তে ঘরে বন্দি আছেন। হোটেল ব্যবসায়ের কর্মসংস্থান এক অংকের ঘরে নেমে এসেছে এবং এই ক্ষতি অদূর ভবিষ্যত-এ পূরণ হবার সম্ভাবনা কম। শিল্পটি থেকে আনুমানিক ২ কোটি মানুষ চাকরি হারাবে এবং ৬০-৭০ শতাংশ লভ্যাংশের ক্ষতি হবে।
এই মুহূর্তে ভারতের পর্যটন শিল্প অক্সিজেন সংকটে রয়েছে এবং সংস্থাটি সরকারের কাছে এই শিল্পের জন্য তাত্ক্ষণিকভাবে অঞ্চলগত ত্রাণ ঘোষণার অনুরোধ জানিয়েছে। এদিকে, সিআইআই মনে করছে শিল্পটির নগদ প্রবাহ কেবল ২০২০ সালের নভেম্বরের দিকেই উন্নতি করতে শুরু করবে এবং ২০২১ সালের প্রথম দিকে সাধারণ পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।
শূন্য দার্জিলিং। ছবি : সংগৃহীত
হাসকার ভারতের পর্যটন শিল্পের পুনর্নির্মাণের জন্য স্বল্প-মেয়াদী সুদমুক্ত বা স্বল্প সুদে ঋণ, সমস্ত বিধিবদ্ধ বকেয়া ১২ মাসের জন্য মুলতবি এবং সমস্ত কার্যনির্বাহী মূলধন এবং ওভারড্রাফ্টের ওপর সুদ প্রদানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তিন থেকে ছয় মাসের স্থগিতের সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ ও শিল্পের অন্যান্য পদক্ষেপগুলো শিল্পটিতে তারল্য আনবে যার ফলে ব্যবসায়ের গতিবিধি সচল হবে।
গত বছর, ১০ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন বিদেশী পর্যটক ভারতে ভ্রমণ করেছিল, যখন এর আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১০ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন এবং ২০১৭ সালে এটি ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৪ মিলিয়ন।
কাশ্মির। ছবি : ইন্ডিয়া টুডে
স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কারণে ভ্রমণ বিধিনিষেধ এবং মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার সাথে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১ দশমিক শূন্য ১ মিলিয়ন পর্যটক ভারতে এসেছিল যেখানে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসেছিল ১ দশমিক শূন্য ৮ মিলিয়ন বিদেশী পর্যটক ভারতে এসেছিলেন। মহামারীর শুরুতেই ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ভারতের ন্যায় বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প ও মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি। এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই খাতকে রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি মহলে নানান আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি নানান সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই শিল্পে গতি আনা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সব মহল পর্যটকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে আকৃষ্ট করতে পারলে দেশের পর্যটন খাত আবারও সচল হবে।