ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট : ইউরোপ মহাদেশ (বাল্টিক পাড়ের সুইডেন)

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ভাইকিংস সভ্যতার সাথে জড়িত দেশটিতে আছে ১৫টি হেরিটেজ সাইট


বিস্ময়কর সৌন্দর্যের স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশ সুইডেন

বিস্ময়কর সৌন্দর্যের স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশ সুইডেন। ছবি : ব্রিটানিকা


ইউরোপ যদি কখনও যেতে পারেন তাহলে রোমান বা গ্রিক সাম্রাজ্যের বাইরে একটা জায়গায় যেতে ভুলবেন না। বাল্টিক সাগরের পাড়ে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান সমতলে ভাইকিংস সভ্যতার উর্বরভূমিতে একবার অন্তত আপনাকে থামতেই হবে। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান তিন দেশের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের পরিচিতির প্রথম দেশ হিসেবে আজ থাকছে সুইডেন পর্ব। সুইডেনে ইউনেস্কো স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট আছে ১৫টি। যার মাঝে বেশকিছু একেবারে ভাইকিংস সভ্যতার সাথে জড়িত। সুইডেনের উল্লেখযোগ্য কিছু ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট দেখে নিন এক নজরে।


ভাইকিংসদের স্মৃতিবিজরিত বিরকা অঞ্চল

ভাইকিংসদের স্মৃতিবিজরিত বিরকা এবং হোভগার্ডেন অঞ্চল। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স



বিরকা এবং হোভগার্ডেন (Birka and Hovgarden)

ভাইকিংস নিয়ে আগ্রহ থাকলে এবং ভাইকিংসদের সেই পুরানো জগতে যেতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে সুইডেনের বিরকা অঞ্চলে। রাজধানী স্টকহোম থেকে ফেরিতে একঘন্টা গেলেই পৌঁছে যাবেন মালারেন (Malaren) লেকের মাঝামাঝি অঞ্চলে। পাশের অ্যাডেলসো দ্বীপের হোভগার্ডেনের সাথে একত্রে এই পুরো জায়গাটি প্রাচীন প্রত্নতত্ত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দুটো জায়গা আপনাকে প্রাচীন ভাইকিং সাম্রাজ্যের সত্যিকার সৌন্দর্য দেখাবে। সেই সাথে এই সময়ে এসেও আপনাকে নিয়ে যাবে ভাইকিংস যুগের ইউরোপে। বিরকা আর হোভগার্ডেনে দাঁড়িয়ে আপনি সত্যিকার অর্থেই বুঝবেন স্ক্যান্ডেনেভিয়ার বুকে ভাইকিংস সভ্যতা কতবড় প্রভাব রেখেছিল।


চার্চের শহর গামেলস্টাড, লুলিয়া

চার্চের শহর গামেলস্টাড, লুলিয়া। ছবি : পিন্টারেস্ট



চার্চের শহর গামেলস্টাড, লুলিয়া (Church town of Hammelstad, Lulea)

সুইডেনের উত্তরাঞ্চলের শহর লুলিয়ার গামেলস্টাডে রয়েছে এক অভূতপূর্ব চার্চের শহর। গামেলস্টাড যার বাংলা অর্থ পুরাতন শহর, এমন এক শহর যা একসময় স্ক্যান্ডেনেভিয়ান এলাকার সমগ্র উত্তরাঞ্চলে পাওয়া যেত। গামেলস্টাডে এইসব কাঠের ঘরগুলো খোলা হত মূলত তীর্থযাত্রীদের জন্য, যারা ক্লান্ত এবং বেশ দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। শুধুমাত্র সাপ্তাহিক প্রার্থনার দিন অর্থাৎ রবিবার আর ধর্মীয় উৎসবের দিনই খোলা থাকতো এসব ঘর। বর্তমানে গামেলস্টাডে ১৫শ শতকে স্থাপিত এমন ৪২টি ঘর টিকে আছে।


হালসিংল্যান্ডের খামারবাড়ি

হালসিংল্যান্ডের খামারবাড়ি। ছবি : ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ জার্নিস



হালসিংল্যান্ডের খামারবাড়ি (Decorated Farmhouses of Halsingland)

এখানে হালসিংল্যান্ডের কেবল ৭টি খামারবাড়ি ইউনেস্কো স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত। ২০১২ সালে এই ৭টি খামারবাড়ি ইউনেস্কো স্বীকৃতি পায় স্ক্যান্ডিনেভীয় নির্মাণ পদ্ধতি অনুসরণ করার জন্য। বাঁশের সাহায্যে ঘর তৈরির এই নির্মাণ পদ্ধতি মধ্যযুগ থেকে এই অঞ্চলের আলাদা ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। আর সব খামারেই আছে অনন্য সব লোকজ চিত্র।



ওল্যান্ডের কৃষি জমি

ওল্যান্ডের কৃষি জমি। ছবি : সংগৃহীত



দক্ষিণ ওল্যান্ডের কৃষিজমি (Agricultural landscape of Southern Oland)

২০০০ সালে এই অনিন্দ্যসুন্দর জায়গাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। বাল্টিক সাগরের দক্ষিণাঞ্চলের এই চুনাপাথরের মালভূমিতে এসে অবাক হননি এমন লোকের সংখ্যা নেই বললেই চলে। আজ থেকে ৫,০০০ বছর আগেও প্রস্তর যুগে এখানে জনবসতি ছিল এবং আজো এখানে মানুষের ছাপ রয়েছে। দর্শনার্থীদের এখানে পা রাখলেই সভ্যতার এক বিরল অংশে পা রাখা হয়ে যায়। প্রতিবছর সুইডেনে যত মানুষ আসেন, তাদের বেশিরভাগেরই আকর্ষণ থাকে দক্ষিণ ওল্যান্ডের এইসব কৃষিজমি।


গ্রিমটন রেডিও স্টেশন, ভারবার্গ

গ্রিমটন রেডিও স্টেশন, ভারবার্গ। ছবি : গ্রিমটন রেডিও স্টেশন



গ্রিমটন রেডিও স্টেশন, ভারবার্গ (Grimeton Radio station, Varberg)

১৯২২ থেকে ১৯২৪ সালের মাঝামাঝি নির্মিত এই রেডিও স্টেশন বর্তমানে চালু না থাকলেও ভালভাবেই সংরক্ষিত আছে। এখানে এসে সত্যিকার অর্থে বোঝা যায়, টেলিযোগাযোগ খাত কতটা এগিয়েছে সময়ের সাথে। ভারবার্গের এই রেডিও স্টেশন ইলেক্ট্রনিক যুগের যগের এক রেডিও স্টেশন। এখানে এখনও রয়েছে একেবারে আসল আলেকজান্ডার ট্রান্সমিটার এবং ছয়টি ১২৭ মিটার বা ৪১৭ ফুটের উঁচু এরিয়াল সিস্টেম। সময় আর বিজ্ঞানের অগ্রগতি নিয়ে জানতে হলে এই জায়গায় আসার বিকল্প খুব একটা নেই।



তানুমের পাথুরে চিত্র

তানুমের পাথুরে চিত্র। ছবি : ভিটলিক মিউজিয়াম[



তানুমের পাথুরে চিত্র (Tanum's Rock Carvings)

তানুম অঞ্চলের এইসব পাথরের গায়ে আঁকা চিত্রগুলোর বয়স নেহায়েত কম না। সেই আদিকালের ব্রোঞ্জ যুগে আঁকা হয়েছিল অনবদ্য এসব ছবি। পুরো তানুম অঞ্চলে প্রায় ৪০০-এর অধিক এমন সব চিত্র পাওয়া যায়। এর প্রতিটি আলাদা আলাদা অর্থ বহন করে। মানুষ, শিকার হওয়া পশু, অস্ত্র, নারী, নৌকাসহ প্রায় আরো অনেক বিষয়েই ছবি আঁকা হয়েছিল এই তানুম অঞ্চলে। এসব চিত্র স্ক্যান্ডেনেভিয়ান অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গার সহাবস্থান তুলে ধরে। তানুমের এইসব চিত্র ব্রোঞ্জ যুগে ইউরোপের চালচিত্র নিয়ে পর্যটকদের স্বচ্ছ ধারণা দিতে সক্ষম।


তানুমের পাথুরে চিত্র

তানুমের পাথুরে চিত্র। ছবি : টাইম ট্রাভেল টার্টেল


সুইডেন গানের দেশ, ঐতিহ্যের দেশ। ছবির মত পরিপাটি এক দেশ এক সুইডেন, যেখানে নীরবে ইউরোপীয় ইতিহাসের অনেক চিত্র আঁকা হয়েছে আরও কয়েকশ বছর আগে। ইউরোপ গেলে তাই একবার কষ্ট করে বাল্টিক সাগর পাড়ি দেয়া আপনার ভ্রমণের জন্য উত্তম হবে।  

জুবায়ের আহম্মেদ   এস এম