ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট (ইউরোপ মহাদেশ) : স্পেনের অনিন্দ্য সাত

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : আজও টিকে আছে প্রায় ৩৫,৫০০ বছরর প্রস্তরযুগে গুহাবাসিদের আঁকা চিত্রকর্মও



অ্যানটোনি গুডির নকশায় অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনা সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া

অ্যানটোনি গুডির নকশায় অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনা সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া। ছবি : ইতিনারি


সভ্যতার একেবারেই শুরু থেকে মিশে থাকা এক দেশ স্পেন। রানি ইসাবেলার কিংবদন্তি থেকে ইসলামি শাসন কিংবা ক্রুসেডের মত ইতিহাস, সবকিছুই একবার অন্তত দেখে গিয়েছে পশ্চিম ইউরোপের এই দেশটিকে। শিল্প, সংস্কৃতি, নিজস্ব ঐতিহ্য সবকিছুই স্পেনে এক সুতোয় মিলেমিশে আছে দীর্ঘদিন ধরে। একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অবস্থান তালিকায় স্পেন আছে তিন নং অবস্থানে। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের জন্যে আজকের আয়োজনে থাকছে স্পেনের হেরিটেজ সাইটের অনিন্দ্য সাত নিয়ে।


অ্যানটোনি গুডির নকশায় অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনা সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া

অ্যানটোনি গুডির সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া। ছবি : উইকিপিডিয়া



অ্যানটোনি গুডির যত কীর্তি, বার্সেলোনা

স্পেনের কাতালুনিয়া রাজ্য। যেখানে প্রবেশ করলেই আপনার মনে হবে এ যেন স্পেনের মাঝেই আরেক দেশ। কাতালুনিয়ার ভাষা, রীতিনীতি সবই আলাদা। এই অঞ্চলটি স্পেন থেকে স্বাধীন হতে চাইছে বেশ অনেকটা সময় ধরেই। কাতালুনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা থেকে এখন পর্যন্ত স্পেনকে প্রতিনিধিত্ব করা যেসব গুণী ব্যক্তি উঠে এসেছেন তাদের মাঝে অন্যতম অ্যান্টোনি গুডি। অসাধারণ এই স্থাপত্যবিদের কীর্তি বার্সেলোনার সৌন্দর্য বাড়িয়েছে অনেকগুণে। গুডির নকশায় করা বেশিরভাগ স্থাপনাই উনবিংশ শতকের শেষ কিংবা বিংশ শতকের একেবারেই শুরুর দিকে করা।


অ্যানটোনি গুডির নকশায় কাসা মিলা

অ্যানটোনি গুডির নকশায় কাসা মিলা। ছবি : উইকিপিডিয়া


গুডির স্থাপিত অসাধারণ সব স্থাপনা থেকে সাতটি স্থাপনাকে একত্রে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এসবের মাঝে উল্লেখ করা যায়, তার অসমাপ্ত ব্যাসিলিকা 'সাগ্রাদা ফ্যামিলিয়া'। কাসা মিলা, পার্ক গুয়েই এবং কাসা ভিসেন্স। ব্যাক্তিজীবনে একজন ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক হিসেবে পরিচিত গুডি তার কাজের মাঝে ধর্মীয় এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক অপরূপ মেলবন্ধন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আলহামবারা এবং জেনারালাইফ, গ্রানাডা

ইসলামী স্বর্ণযুগের কথা বলতেই সবসময় যে শহরটির কথা উঠে আসে সেটি গ্রানাডা। গ্রানাডায় ইসলামি শাসনের অন্যতম সাক্ষী এই আলহামবারা। গ্রানাডার মরিশ পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত এই দুর্গের যাত্রা হয় খুবই ছোট আকারের কেল্লা হিসেবে, কিন্তু ত্রয়োদশ শতক নাগাদ, ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এই দূর্গের ব্যাপক আকারে সংস্কার এবং আয়তন বৃদ্ধি করা হয়। শহরের আমির বা শাসকদের সরাসরি নির্দেশে এই দূর্গের শোভাবর্ধন করা হয়। এবং ধারণা করা হয়, ইউরোপে ইসলামী শাসনের যত নিদর্শন আছে, এই আলহামবারা তার মাঝে সবচেয়ে বেশি মহিমান্বিত।




গ্রানাডায় ইসলামি শাসনের অন্যতম সাক্ষী এই আলহামবারা প্রাসাদ। ছবি : উইকিপিডিয়া


বিশেষ করে, এই দুর্গের মধ্যভাগে অবস্থিত চতুর্দশ শতকের নাজারিস প্রাসাদটি স্পেনে ইসলামী স্থাপত্যকলা, নকশা এবং কারিগরি দক্ষতার বড় নিদর্শন বলা চলে। আর দূর্গের বাইরে রয়েছে জেনারালাইফ উদ্যান। সৌন্দর্য্যের কারণে এটিও স্থান পেয়েছে ইউনেস্কোর তালিকায়। এই বাগানটি মূলত গ্রানাডার আমিরদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের জন্য নির্মিত হয়েছিল।

রোমান ধ্বংসাবশেষ, টারাগোনা

রোমানদের ভাষায় টারাকো, স্প্যানিশ ভাষায় টারাগোনা। স্পেনের উত্তর-পূর্বের শহর টারাগোনায় আসলে খানিক ভ্রম হতে পারে। স্পেনের মাঝে এখানে আপনি পাবেন এক টুকরো ইতালির স্বাদ।


স্পেনের এই শহরজুড়ে রোমান সাম্রাজ্যের শাসনকালীন চিহ্ন পাওয়া যায়

স্পেনের এই শহরজুড়ে রোমান সাম্রাজ্যের শাসনকালীন চিহ্ন পাওয়া যায়। ছবি : আজামারা


দিগ্বিজয়ী রোমান সাম্রাজ্যের যেসব স্থাপনা স্পেনে আজও টিকে আছে তার বেশিরভাগই এই শহরের মাঝে। এটি প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের বেশ গুরুত্বপূর্ণ এক শহর এবং আইবেরিয়ান উপদ্বীপে রোমান শাসনের প্রথম নিদর্শন। বর্তমানে এই শহরের রোমান সাম্রাজ্যের সব কীর্তি সেই সাথে সাগরপাড়ে গড়ে ওঠা শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নগর প্রতিরক্ষা দেয়াল সবই ঠাঁই করে নিয়েছে ইউনেস্কোর তালিকায়। আর শহর হিসেবে টারাগোনার বয়সও নেহায়েত কম না। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে এই শহরের গোড়াপত্তন ঘটে।


আরেক রোমান কীর্তি সেগোভিয়া, মাদ্রিদ

আরেক রোমান কীর্তি সেগোভিয়া, মাদ্রিদ। ছবি : ইতিনারি



সেগভিয়ার কৃত্রিম জলপ্রপাত, সেগোভিয়া, মাদ্রিদ

আরেকটি রোমান কীর্তি। এবারের কীর্তির অবস্থান স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে। সেগভিয়ার এই কৃত্রিম এই জলপ্রপাত উত্তর মাদ্রিদের শহর সেগোভিয়ার পোস্টার বলা যেতে পারে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কৃত্রিম পানি নির্গমন পথ। ফ্রিও নদী থেকে এইখানে প্রায় ১৬৬টি পথ দিয়ে পানি প্রবাহিত হত। ফ্রিও নদীর দূরত্ব এই জলপ্রপাত থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার।


সেগোভিয়া, মাদ্রিদ

সেগোভিয়া, মাদ্রিদ। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স


 খ্রিস্টিয় ১ম শতকে নির্মিত এই বিশাল স্থাপনার সবচেয়ে আশ্চর্যের দিক হল, এই পুরো স্থাপনা এখন পর্যন্ত টিকে আছে শুধুমাত্র অভিকর্ষের কারণে। এই পাথরগুলোর মাঝে কোনোপ্রকার চুন বা সুরকি দেয়া হয়নি।

আলটামিরার প্রস্তরযুগীয় গুহাচিত্র

উত্তর স্পেনের ক্যান্টাব্রিয়ার আলটামিরায় আপনি দেখা পাবেন পৃথিবীর আদিমতম চিত্রকর্মের। প্রায় ৩৫ হাজার ৫০০ বছর আগে প্রস্তরযুগে গুহাবাসি মানুষের আঁকা এইসব চিত্রকর্ম আজও টিকে আছে। মুগ্ধ করে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের। কাঠকয়লায় আঁকা এসব ছবি আজ টিকে থাকাত পিছনে অবশ্য প্রকৃতিকে আলাদা করে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। গুহার গভীরতা এইসব ছবিকে এখন পর্যন্ত আলোর খুব কাছে আনতে দেয়নি। যার কারণে এত বছর পরেই ভালভাবেই অক্ষত আছে সব ছবি।




আলটামিরার প্রস্তরযুগীয় গুহাচিত্র। ছবি : সংগৃহীত


তবে গুহার ছাদে থাকা বাইসন এবং অন্যান্য চিত্রকর্ম দর্শনার্থীদের শ্বাস প্রশ্বাসে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইডের কারণে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে এখানে ভ্রমণ বন্ধ করে দেয় স্পেন সরকার।

ঐতিহাসিক শহর তুলিদো   

স্পেনের অন্যতম এক ঐতিহাসিক শহর তুলিদো। রাজধানী মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণে গেলে দেখা মিলবে এই শহরের। এই শহরে এসে বুঝতে পারবেন স্পেনের বিবর্তন আর সামাজিক জীবনের অনেকটুকুই। এই শহরে আছে স্পেনের ইহুদি সম্প্রদায়ের কলোনি, আছে ঐতিহাসিক ক্রিস্টো দে লা লুজ মসজিদ এবং খ্রিস্টানদের লুমিং গথিক ক্যাথেড্রাল।


ঐতিহাসিক শহর তুলিদো, মাদ্রিদ

ঐতিহাসিক শহর তুলিদো, মাদ্রিদ। ছবি : সংগৃহীত


প্রায় ২,০০০ হাজার বছরের পুরাতন এই শহরের পত্তন করেছিল রোমানরাই। সেই হিসেবে এই শহরের বুকেও আপনি পাবেন রোমান ঐতিহ্যের স্বাদ।  

জুবায়ের আহম্মেদ   এস এম