অনাবিল গ্রাম-বাংলার সৌন্দর্যে দিগন্তজোড়া দীঘি এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। চিরায়ত বাংলার রূপে অন্যতম অনুষঙ্গ এই দীঘিগুলো একেকটি সৌন্দর্যের ভান্ডার। এই বাংলায় যেমন রয়েছে অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভাণ্ডার আর প্রাচীন স্থাপনা তেমনই সেগুলোকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য উপকথা, লোককথা ও কল্পকাহিনী।
বিভিন্ন জেলার দীঘিগুলোকেও ঘিরে প্রচলিত আছে নানান লোককথা ও কল্পকাহিনী। আর দীঘিগুলোর সৌন্দর্যও দারুণ নজরকাড়া। অপরূপ সৌন্দর্যের এই দীঘিগুলোর শীতল জলে মন-প্রাণ জুড়াতে কার না ভাল লাগে। তেমনই একটি ঐতিহাসিক দীঘি হলো আছরাঙ্গা দীঘি (Achranga Dighi)।
আছরাঙ্গা দীঘি-র অবস্থান
উত্তরবঙ্গের ছোট একটি শহর হল জয়পুরহাট। এই জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় এই আছরাঙ্গা দীঘি অবস্থিত। ক্ষেতলাল উপজেলা থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রসুলপুর মৌজার মামুদপুর ইউপির তুলসীগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে এই দীঘিটি অবস্থিত। প্রায় ৫০ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে এই দীঘি। দীঘিটির দৈর্ঘ্য ১,০৭০ ফুট এবং প্রস্থ ১,০০০ ফুট। প্রাচীন এই দীঘিটি ১,৫০০ বছর আগের।
ইতিহাস
ঐতিহ্যবাহী এই দীঘিটির সঠিক কোন ইতিহাস লিপিবদ্ধ না থাকলেও ধারণা করা হয়, তৎকালীন রাজশাহী জেলার তাহিরপুর আদি রাজবংশের পূর্বপুরুষ ভট্ট নারায়ণের বংশধর মৌন ভট্ট ৯ম শতকে এই দীঘিটি খনন করেছিলেন। বরেন্দ্র এলাকা হওয়ায় বর্ষাকাল ব্যতীত বছরের অন্য সময়ে বৃষ্টি না হওয়ার কারণে কৃষি জমি সমূহ চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়তো। ঐ কৃষি জমিগুলোকে চাষের উপযোগী করার জন্য মৌন ভট্ট এই দীঘির খনন কাজ শুরু করেন।
নবম শতকের মাঝামাঝিতে এই দীঘি খননের কাজ শেষ হয়। সে সাথে দীঘিটি পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই দীঘির পানি দিয়ে অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধানের ফলন হয়। পৌষ মাসের শুরুর দিকে ক্ষেতের ধানেরগুলো পেকে লাল রঙ ধারন করত। আর এ জন্যই এই উপজেলার নাম হয়েছে ক্ষেতলাল।
ছবি : সংগৃহীত
দীঘির আশে পাশে কি কি দেখতে পাবেন
এই দীঘিটির চারপাশে চারটি বাঁধাই করা ঘাঁট আছে। ঘাঁটে বসে দিঘীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এই দিঘীর পানি কাক চক্ষুর মতো স্বচ্ছ এবং এর পানিও মিষ্টি।
দীঘির চারপাশে প্রায় ৫,০০০ ফলদ, বনজ ও ভেষজসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। যা দিঘীর পরিবেশকে আরও শ্যামল-সবুজ করে এর সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করেছে।
নান্দনিক সৌন্দর্যের এই দিঘীটিতে শীতকালে বিভিন্ন প্রকার অতিথি পাখির আগমন ঘটে। তাদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে দিঘীটি।
অতিথি পাখি দেখতে এখানে অসংখ্য পর্যটকদের আগমন ঘটে।
১৯৯২ সালে তৎকালীন সরকার দীঘির সংস্কার ও পুনঃ খনন কাজ করে। এই খননে ১২টি মূল্যবান মূর্তি পাওয়া যায় যা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। এই দীঘিটি সনাতন ধর্ম সহ অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের তীর্থস্থান হয়ে উঠেছে। দিঘীকে কেন্দ্র করে মাজার মন্দির গড়ে উঠেছে। এখানে নানা ধরনের পূজা-পার্বণ অনুষ্ঠিত হয়।
যেভাবেযাবেন :
ঢাকা থেকে বাসে করে জয়পুরহাট যেতে পারেন। কল্যাণপুর,গাবতলি, টেকনিক্যাল থেকে জয়পুরহাট যাওয়ার বাস পাবেন। এদের মধ্যে রয়েছে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এস আর ট্রাভেলস প্রাইভেট লিমিটেড ইত্যাদি। ননএসি বাসের পড়বে ভাড়া ৪৫০ টাকা।
আর ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে নীলসাগর এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস, দ্রুত যান এক্সপ্রেস, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস এ চড়ে জয়পুরহাট যেতে পারেন। এরপর জয়পুরহাট বাস স্ট্যান্ড থেকে বাস বা সিএনজি যোগে ক্ষেতলাল উপজেলায় নেমে সেখান থেকে অটোরিকশায় চড়ে আছরাঙ্গা দিঘী যেতে পারেন।
যেখানেথাকবেন :
জয়পুরহাট শহরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। হোটেল সাদ, ১ নং স্টেশন রোড, প্রমি হোটেল, সদর থানার পশ্চিম পাশে, হোটেল পৃথিবী ইন্টারন্যাশনাল, সদর রোড,জয়পুরহাট। হোটেলগুলোতে ভাড়া ৩০০-৩,০০০ টাকার মধ্যে পড়বে। এছাড়া ক্ষেতলাল উপজেলা সদর থাকতে চাইলে ডাকবাংলোতে থাকতে পারেন। সেক্ষেত্রে আগে থেকে অনুমতি নিয়ে রাখতে হবে।