১৬৮০ সালে নির্মিত শাহ মাহমুদ মসজিদ, কিশোরগঞ্জ; ছবি : বাংলা ট্রিবিউন
ঢাকার খুব কাছের জেলা কিশোরগঞ্জ হাওড়-বাওড় সমৃদ্ধ সুপ্রাচীন একটি জায়গা। শুধু প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যই নয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিক থেকেও এই জেলাটি বেশ সমৃদ্ধশালী। তাই ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য কিশোরগঞ্জ তৈরি করে আলাদা এক আবেদন।
কিশোরগঞ্জের এগারসিন্দুর গ্রাম ঐতিহাসিক দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন স্থাপত্য যার রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। এসব স্থাপনার মধ্যে অন্যতম একটি নিদর্শন হল শাহ মাহমুদ মসজিদ (Sheikh Mahmud Shah Mosque)।
অবস্থান
শাহ মাহমুদ মসজিদটি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে এগারসিন্দুর গ্রামে অবস্থিত।
এগারসিন্দুর গ্রামটি ইতিহাসের স্মৃতি বিজড়িত একটি জায়গা। এখানে ঈসা খাঁর দুর্গ ছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু পুরনো স্থাপত্য। এই দুর্গের এক কিলোমিটার দূরেই এই মসজিদটি অবস্থিত।
ইতিহাস
এই প্রাচীন মসজিদটি ১৬৮০ সালে নির্মিত হয়। মোঘল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই মসজিদটি দেখতে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, এই মসজিদটি বণিক শেখ মাহমুদ নির্মাণ করেছিলেন। তিনি সেসময় এক ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। তার নামেই এই মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে। এ মসজিদ থেকে একটু দূরেই আছে শেখ সাদি জামে মসজিদ। শাহ মাহমুদের ভাই ছিলেন শেখ সাদি। তারা দুই ভাই ব্যবসায়ী ছিলেন। তাদের উত্তরসূরিরা এই মসজিদের পাশেই বসবাস করেন।
মোঘল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই মসজিদটি; ছবি : উইকিপিডিয়া
স্থাপত্যশৈলী
চারপাশে নিচু দেয়াল ঘেরা একটি উঁচু প্লাটফর্মের ওপর এই মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদটিতে মোঘল স্থাপত্যরীতি ও স্থানীয় শিল্পরীতির মেলবন্ধন দেখা যায়। এই মসজিদটি এক গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকৃতির। এর প্রবেশপথে দোচালা পাকা ঘর দেখা যায়। একে বালাখানা বলা হয়। বালাখানার ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে প্লাস্টার করা মসজিদের প্রাঙ্গণ চোখে পড়ে।
এই মসজিদের ভেতর ও বাহির সুলতানি আমলের চিত্রফলকে অলংকৃত করা আছে। বর্গাকৃতির এই মসজিদটি এক গম্বুজবিশিষ্ট। এই মসজিদের চার কোনায় চারটি আটকোনাকৃতির মিনার দেখতে পাবেন। ভেতরে পশ্চিম দিকে তিনটি মিহরাব রয়েছে।
এই ধনুকের মতো দেখতে মিহরাবগুলোতে টেরাকোটার নকশা দেখা যায়। মিহরাবের সাথে লাগানো প্রতিটি কলামে পাতার নকশাসহ বিভিন্ন ফুল সমেত ছোট গাছের নকশা করা আছে।
মসজিদটির প্রাচীর এবং কার্নিশগুলো মুঘলদের অন্যান্য স্থাপত্যের মতই সমান্তরাল। পূর্বদিকের দেয়ালে টেরাকোটার কাজ ছাড়াও দেয়ালের উপরে, কলামে এবং মিনি মিনারে মুঘল আমলের নান্দনিক নকশার কারুকার্য দেখা যায়। অতীতে মসজিদের চার কোণায় চারটি মূল্যবান প্রস্তর ফলক ছিল যা এখন বিলুপ্ত।
এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এখানে নিয়মিত সালাত আদায় করা হয়। এই মসজিদের ভেতরে শখানেক মুসল্লি সালাত আদায় করতে পারে। মসজিদের বাইরে যে সীমানা দেয়াল করা হয়েছে এর ভেতরেও নামাজের উপযোগী খোলা জায়গা আছে।
শতবর্ষী মসজিদটির পাশে একটী সান বাঁধানো ঘাট ও একটি ওজুখানাও রয়েছে; ছবি : উইকিপিডিয়া
মসজিদের এর সামনে আছে বড় একটি পুকুর। পুকুরটিতে আছে শানবাঁধানো ঘাট। এছাড়া অজুর জন্য পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করে একটি অজুখানাও করা হয়েছে এখানে।
যেভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে বাসে করে কিশোরগঞ্জ আসতে পারেন। ঢাকার মহাখালী থেকে বিভিন্ন বাস কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এসকল বাসের মধ্যে আছে জলসিঁড়ি, অনন্যা এবং নান্দাইলের বন্যা পরিবহন। এই বাসগুলোতে ভাড়া পড়বে প্রায় ১৩০ টাকার মত। চাইলে আপনি সরাসরি গোয়ালঘাটে নামতে পারেন।
সেক্ষেত্রে বাসের হেলপারকে আগে থেকেই জানিয়ে রাখবেন। এছাড়া, কিশোরগঞ্জ শহর থেকে আসতে চাইলে সিএনজি বা অটোরিকশায় ৩০ টাকা ভাড়ায় পাকুন্দিয়ায় আসতে পারেন। এরপর পাকুন্দিয়া থেকে সিএনজি বা অটোরিকশার চড়ে গোয়ালঘাটে আসতে হবে। ভাড়া পড়বে ২৫ টাকা। গোয়ালঘাট থেকে রিকশায় অথবা চাইলে হেঁটে শাহ মাহমুদ মসজিদে আসতে পারবেন।