রাজু ঘোষের প্রসিদ্ধ শিঙাড়া : স্বদেশী বাজার, ময়মনসিংহ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ময়মনসিংহ ভ্রমণে পর্যটকদের অন্যতম পছন্দ রাজু ঘোষের শিঙাড়া

ছবি : সামহয়ার ইন বাংলাদেশ

 বর্ষণমুখর বিকেল, আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর হঠাৎ আকাশ ভেঙ্গে ঝুম বৃষ্টি। এমনই কোনো এক পড়ন্ত গৌধুলি বেলায় মন চায় চায়ের কাপে চুমুক দিতে আর সাথে থাকবে ঝাল শিঙাড়া বা পাকোড়া। বাংলা, বাঙালি আর বাঙালির সংস্কৃতির সাথে ভোজনবিলাসের ব্যাপারটি ওতপ্রোতভাবেই জড়িয়ে আছে। খাদ্যতালিকায় তাই যুক্ত হয় তেলে ভাজা নানান রকমের খাবার। ইতিহাসের পাতায় সূক্ষ্ম নজর দিলেই ধরা পরে শিঙাড়ার প্রাচীন ইতিহাস। চমকপ্রদ ব্যাপার হলেও সত্য যে, ভারতীয় উপমহাদেশে এর জন্ম হয়নি। ইতিহাসে বলা হয়, ফার্সি শব্দ 'সংবোসাগ' থেকেই এই শিঙাড়া শব্দের উৎপত্তি।

নানান জনের নানা মত। কেউ কেউ বলে থাকে, গজনবী সাম্রাজ্যে সম্রাটের দরবারে এক ধরনের নোনতা বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হতো। যার মধ্যে কিমা, শুকনো বাদাম জাতীয় কিছু উপকরণ যুক্ত করে দেয়া হতো। আবার কোনো কোনো ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতে ২ হাজার বছর আগে শিঙাড়ার আবির্ভাব ঘটে। ইতিহাস থেকে আরও জানা যায়, ১৬ শতকের দিকে পর্তুগিজরা যখন ভারতবর্ষে আলুর ব্যবসায় শুরু করেন ঠিক তখন থেকেই  খাবারে আলুর ব্যবহার শুরু করেন। তারপর থেকেই শিঙাড়ার মধ্যে আলু দেয়ার রীতি চালু হয়। কালের ক্রমপরিবর্তনের ফলে পরিবর্তিত হয়েছে রন্ধনশৈলীও। বাংলাদেশেও এর ব্যাতিক্রম ঘটেনি। আজ থেকে প্রায় ২০০ শত বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল প্রসিদ্ধ রাজু ঘোষের সিঙ্গারা।

যাত্রার আদিকালে চিত্রটা ভিন্ন রকম ছিল। কালের পরিবর্তনে মালিকানা পরিবর্তিত হয়ে আজ নিজস্ব জায়গায় স্থাপিত হয়েছে এই শিঙাড়ার দোকানটি। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা যায় যে, যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় তারা এই ব্যবসার সাথে নিজেদের যুক্ত করে রেখেছে। বর্তমানে তারা তাদের সেই অনন্য স্বাদকে ধরে রাখার জন্যে তাদের হাতে তৈরি গোপন মশলা ব্যবহার করে থাকেন। তাদের এই শিঙাড়া খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনই দামেও বেশ সস্তা। প্রতিটি শিঙাড়ার দাম মাত্র ৩ টাকা। শিঙাড়ার সাথে তাদের দোকানের খাদ্যতালিকাতে যুক্ত হয়েছে নিমকি, দধি, লাড্ডু, আর চমৎকার সুভাষিত ঘি। শিঙাড়ার সাথে তারা দিয়ে থাকেন বিশেষ সস, যা তাদের নিজস্ব রন্ধনকৌশলে তৈরি। এতে করে স্বাদ যেন আরও দ্বিগুন বেড়ে যায়।

শিঙাড়া তৈরির রন্ধনশৈলী :

ছবি : বার্তা ২৪

 উপকরণ : ময়দা, আলু, বাদাম, মটর, পাঁচফোঁড়ন, শুকনো মরিচ, কাচামরিচ, এলাচি, দারুচিনি, সয়াবিন, তেল, লবন, হলুদ গুঁড়ো,জিরা গুড়ো, আদা।

রন্ধনপ্রনালী :

  • ময়দার মন্ড প্রস্তুত
একটি পাত্রে পরিমানমতো ময়দা নিয়ে তাতে স্বাদমতো লবণ, তেল দিয়ে ভাল করে ময়দাকে ভেঙ্গে নিতে হবে। তারপর পরিমানমতো জল দিয়ে মেখে নিতে হবে, যাতে মাখানো ময়দা নরম না হয়। কিছুক্ষণ মেখে রেখে দিতে হবে। তারপর আলু সিদ্ধ করে ভেঙ্গে নিতে হবে। একতি কড়াইয়ে বাদাম ভেজে নিতে হবে। আলাদা একটি পাত্রে মটরগুলো সিদ্ধ করে নিতে হবে।
  • শিঙাড়ার ভেতরের পুর তৈরি প্রনালী
ছবি : কীভাবে ডট কম

 এখন শুকনো মরিচ ভাল করে ভেজে পাঁচ ফোড়নের গুঁড়োর সাথে মিশিয়ে নিতে হবে। একটি কড়াইয়ে তেল হালাকা গরম করে ঢেলে পাঁচ ফোঁড়ন, দারুচিনি, এলাচি দিয়ে দিতে হবে। সিদ্ধ আলুগুলো ভেঙ্গে তেলের ভেতর ছেড়ে দিয়ে একে একে আদা, জিরা, হলুদ গুঁড়ো, স্বাদমত লবণ, হলুদের গুড়ো, কাচা মরিচের কুচি, ভাজা বাদাম, মটরগুলো দিয়ে দিতে হবে। মিশ্রনটি ভালো করে নেড়ে অল্প পরিমানে পানি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। পানি শুকিয়ে আসলে নামিয়ে নিতে হবে। শুকনো ভাজা মরিচের গুড়ো, অল্প পরিমান পাঁচ ফোঁড়নের গুঁড়ো ছিটিয়ে রেখে দিতে হবে। বাড়তি এই পাঁচ ফোঁড়ন দেয়ার কারণে এর স্বাদের অনন্যতা বৃদ্ধি পাবে। স্বাদের জন্যে ধনেপাতা কুচি ও ব্যবহার করা যেতে পারে।

  • শিঙাড়া তৈরি
ছবি : দৈনিক নয়াদিগন্ত


প্রথমে ছোট ছোট করে বল আকারের মন্ড তৈরি করে লুচির মত করে ছোট আকারে বেলে চাকু দিয়ে মাঝ বরাবর কেটে নিতে হবে। হাতের নিয়ে মোচকাকৃতির মত করে তাতে আলু-মটরের মিশ্রনটি ভেতরে দিয়ে মুখটি ভাল করে আটকে দিতে হবে। একটি পাত্রে তেল ঢেলে গরম করে নিতে হবে। চুলের আঁচ মৃদু রেখে এক এক করে শিঙাড়া ছেড়ে দিতে হবে। শিঙাড়াগুলো লাল হয়ে আসলে নামিয়ে একটি পাত্রে টিস্যু দিয়ে রেখে দিতে হবে। এতে করে অতিরিক্ত তেল টিস্যুর সাথে চলে আসবে। তারপর টমেটো বা নিজেদের তৈরি বিশেষ সস দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন শিঙাড়া।  



তথ্যসূত্র : https://irabotee.com/singarabd/ https://today.salamweb.com উইকিপিডিয়া, দেমুর নানারকম-দেবাশিষ মুখোপাধ্যায়