ভারতীয় জাদুঘর : ভারতের ঐতিহাসিক জাদুঘর
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : দুষ্প্রাপ্য সামগ্রীতে পরিপূর্ণ বিশ্বের ৯ নম্বরে থাকা এই 'ইমপেরিয়াল জাদুঘর
সারা বিশ্বের তালিকায় নয় নম্বরে আছে ভারতীয় এই জাদুঘর। ছবি : বঙ্গদর্শন
কোলকাতা শহর মানুষের কাছে আনন্দ নগরী বলে পরিচিত। কোলকাতায় যেমন রয়েছে বিনোদনের নানা রকম ব্যবস্থা ঠিক তেমনই রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাতত্ত্বের নিদর্শনস্বরূপ অসংখ্য স্থাপনা। কোলকাতায় রয়েছে ভারতের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন জাদুঘর। এছাড়া সারা বিশ্বের তালিকায় জাদুঘরটি রয়েছে নয় নম্বরে। সময়ের সাথে সাথে রূপ ও নাম বদলালেও সংগ্রহ বেড়েছে অনেক বেশি। একসময়ের এশিয়াটিক সোসাইটি মিউজিয়াম এখন নতুন রুপ নিয়েছে। নতুন রূপে জাদুঘরের নাম 'ইমপেরিয়াল মিউজিয়াম' বা 'ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম'। জওহর লাল নেহেরু রোড, পার্ক স্ট্রিটে অবস্থিত প্রাচীন জাদুঘরের স্থাপত্যশিল্পে রয়েছে আভিজাত্যের ছাপ।
বর্তমানের সাদা রঙের তিন তলা দালানটি নির্মাণে ইতালিয়ান স্থাপত্যশিল্পের ভাবধারা রয়েছে। চমৎকার স্থাপনাটির নকশা করেছিলেন ওয়াল্টার বি গ্রানভিল। প্রতিটি তলার বারান্দার চারদিকে রয়েছে খিলান আকৃতির অনেকগুলো প্রবেশপথ। কোলকাতার সবচেয়ে পুরনো জাদুঘরটির নির্মাণের পেছনে রয়েছে অনেক ইতিহাস। ১৭৮৪ সালে যখন স্যার উইলিয়াম জোন্সের উদ্যোগে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল প্রতিষ্ঠা লাভ করে তখন থেকেই মূলত জাদুঘরের চিন্তা মাথায় আসে। সোসাইটির মানুষেরা নিজেদের উদ্যোগে নানা রকম নমুনা সংগ্রহ করতে থাকে। এই চিন্তাধারার বাস্তব ফল হিসেবে ভারতীয় জাদুঘরের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৮০৮ সালে। দীর্ঘ ৬ বছর ধরে কাজ চলার পর অবশেষে ১৮১৪ সালে জাদুঘরটি স্থাপিত হয়। জাদুঘর তৈরির জমি দিয়ে সাহায্য করেন তৎকালীন ভারত সরকার। ২০৬ বছরের বয়সের ভারের চেয়ে এর সংগ্রহের ভারই বেশি নজর কাড়ে। ভারতীয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ড. নাথানিয়েল ওয়ালিচ।
ছবি : জিয়ো বাংলা
শুধু প্রতিষ্ঠাতাই নন, তিনি এই জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন। জাদুঘরের উন্নয়নে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী জাদুঘরে দুইটি আলাদা বিভাগ খোলা হয়েছিল। নানা রকম দুর্লভ গাছপালা, প্রাণী, পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন ছিল এই বিভাগের আওতাভুক্ত। ১৮১৪ সালের পহেলা জুন তিনি এই জাদুঘরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মূলত তাঁরই উদ্যোগে জাদুঘরের সংগ্রহ দিন দিন আরও বাড়তে থাকে। ৪৯ জন সংগ্রাহকের মধ্যে ২৭ জনই ছিলেন ইউরোপিয়ান। তারা ১৪৭টি নমুনা দিয়েছিলেন এই সংগ্রহশালায়। ভারতীয় সংগ্রাহকদের মধ্যে ছিলেন বাবু রাম কমল সেন, মহারাজা রাধাকান্ত দেব, মথুরানাথ মল্লিক প্রমুখ। এসব সংগ্রাহকদের পাশাপাশি ড. ওয়ালিচ নিজেও অসংখ্য নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন জাদুঘরের জন্য।
জাদুঘরে অশোক স্তম্ভ। ছবি : রয়দেব
জাদুঘরের অভিভাবক ওয়ালিচ পদত্যাগ করার পর নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। সেসময় প্রথম দিকে সোসাইটির পক্ষ থেকে বেতন দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সরকার এই দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৮৪০ সালে সরকারের পক্ষ থেকে নতুন বিভাগ চালু করার পরিকল্পনা করা হয়। নতুন এই বিভাগটি ছিল ভূতত্ত্ব ও খনিজ নমুনার জন্য। এই বিভাগের পেছনে মাসে আরও কিছু টাকা খরচ করা হত। নতুন বিভাগের জন্য নতুন বাড়ি তৈরী করা হয়। তখনকার সময়ে বাড়িটি বানাতে খরচ হয়েছিল ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। যা বর্তমান সময়ের সমমানের টাকার চেয়ে অনেক বেশি। আর এটিই বর্তমানের চৌরঙ্গী রাস্তায় অবস্থিত জাদুঘর।
এই জাদুঘরের ভিত গড়া শুরু হয় ১৮৬৭ সালে যা শেষ হয় ১৮৭৫ সালে। নতুন স্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে এশিয়াটিক সোসাইটির পুরনো জাদুঘরের যাবতীয় সংগ্রহ এখানে স্থানান্তর করা হয়। এর ২ বছর পর ১৮৭৮ সালের পহেলা এপ্রিল জাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ব গ্যালারি এবং পাখির গ্যালারি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়। এরপর জাদুঘরে আরও অনেক নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। ১৯১৬ সালে প্রাণিতত্ত্ব বিভাগ এবং ১৯৪৫ সালে নৃতাত্ত্বিক বিভাগ চালু করা হয়। বর্তমানে জাদুঘরে রয়েছে মোট ছয়টি বিভাগ। বিভাগগুলো হলো : ভারতীয় শিল্প, প্রত্নতত্ত্ব, ভূ-তত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রাণিবিদ্যা এবং অর্থনৈতিক উদ্ভিদবিদ্যা। ছয়টি বিভাগের অধীনে থাকা প্রায় ৩৫টি গ্যালারিতে রয়েছে নানা রকম সংগ্রহ, যেগুলো অনেক পুরনো আবার কোনো কোনটি বিরল প্রজাতির।
জাদুঘরে সংরক্ষিত মমি। ছবি : বঙ্গদর্শন
জাদুঘরের নানা রকম সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে মানব বিবর্তনের ভাস্কর্য, বুদ্ধের জীবনের দৃশ্যাবলী, অশোক স্তম্ভ, বুদ্ধের পায়ের চিহ্ন, বুদ্ধমূর্তি, ডাইনাসরসহ বিভিন্ন প্রাণীর ধ্বংসাবশেষসহ আরো অনেক নমুনা। তবে জাদুঘরের আকর্ষণের কেন্দ্র মিসরের মমি। এই মমি অনেকেরই আগ্রহের বিষয়। আরও রয়েছে ভারহুতের নানা ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন। দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য রয়েছে হুইল চেয়ার নেয়ার অনুমতির পাশাপাশি লিফটের ব্যবস্থা। এখানে আরও রয়েছে বিশাল বড় লাইব্রেরি। জাদুঘর সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কম থাকায় অনেকেই খুব একটা আগ্রহ দেখায় না জাদুঘর ভ্রমণের প্রতি। কিন্তু অসাধারণ এই জাদুঘরে এলে একদিকে যেমন অনেক কিছু দেখতে পারবেন, তেমনই অর্জন করতে পারবেন না জানা অনেক জ্ঞান।
সময়সূচী : জাদুঘর সপ্তাহের সোমবার বাদে প্রতিদিনই খোলা থাকে। এর মধ্যে মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার সকাল১০ টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে। শনিবার এবং রবিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এছাড়া প্রজাতন্ত্র দিবস, স্বাধীনতা দিবস, হোলি উৎসব, ঈদুল ফিতরে এবং দীপাবলি, বিজয়া দশমীতে জাদুঘর বন্ধ থাকে।
খরচ : জাদুঘরে ঢুকতে হলে টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে নিতে হবে। বয়স অনুযায়ী টিকিটের দাম আলাদা। প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য জনপ্রতি ৫০ রুপি, ৫ বছরের বড় বাচ্চাদের জন্য ২০ রুপি এবং বিদেশীদের জন্য ৫০০ রুপি খরচ হবে টিকিট কিনতে। জাদুঘরে ছবি তুলতে হলে সেক্ষেত্রেও টাকা গুনতে হবে। স্মার্টফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলতে ৫০ রুপি, ক্যামেরাতে ১০০ রুপি, ছোট ভিডিও ক্যামেরাতে ২,০০০ রুপি এবং স্ট্যান্ডসহ ক্যামেরাতে ৫,০০০ রুপি খরচ হবে।
কিভাবে যাবেন : জাদুঘরটিতে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে কোলকাতায় যেতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই ভিসা এবং পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ থেকে বাস, ট্রেন এবং বিমানে চড়ে যেতে পারবেন প্রমোদ নগরী কোলকাতায়। বাসে চড়ে কোলকাতায় আসতে হলে শ্যামলী এনআর পরিবহন, গ্রিন লাইন, সোহাগ পরিবহণ, সৌহার্দ্য পরিবহন ইত্যাদি বাসে সরাসরি ঢাকা-কলকাতা যেতে পারবেন। এক্ষেত্রে নন-এসি বাসে ভাড়া ৮০০-১,০০০ টাকা এবং এসি বাসে ১,৫০০-২,০০০ টাকা। এছাড়া ঢাকা থেকে বাসে করে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে কোঁলকাতায় যেতে পারবেন। ট্রেনে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সুবিধাজনক উপায় হল মৈত্রী এক্সপ্রেস। সপ্তাহে চারদিন ( শুক্র, শনি, রবি, বুধ) মৈত্রী এক্সপ্রেসের ট্রেন ঢাকা-কোলকাতা যায়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সকাল আটটা দশ মিনিটে ট্রেন ছাড়ে। তবে কোলকাতা খুব সহজে এবং কম সহজে যেতে চাইলে বিমানে যেতে পারেন। বাংলাদেশ বিমান, রিজেন্ট এয়ারলাইনস, নভো এয়ার, এয়ার ইন্ডিয়া, জেট এয়ারওয়েজের বিমানে যেতে পারবেন কোলকাতা শহরে। কোলকাতা শহর থেকে বাসে করে এসপ্লানেডে নেমে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথে খুব সহজেই জাদুঘরটি দেখতে যাওয়া যায়।
যেখানে থাকবেন : ভারতীয় জাদুঘরের কাছাকাছি জায়গায় বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। এখানে যেমন কম দামের হোটেল রয়েছে, তেমনই রয়েছে বেশি দামের হোটেল। বিভিন্ন হোটেলের মধ্যে রয়েছে গুজরাল গেস্ট হাউজ, আফ্রিদি ইন্টারন্যাশনাল গেস্ট হাউজ, হোটেল গোল্ডেন অ্যাপল, দা লিন্ডসে, দা এলজিন ফেয়ারলন, দা পার্ক কোলকাতা, হোটেল হীরা, হোটেল অরা, ময়ূর রেসিডেন্স অন্যতম।
খাবার : কোলকাতার জাদুঘরের আশেপাশে বিভিন্ন মানের এবং বিভিন্ন ধরনের খাবারের হোটেল রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম হল : ভোজ কোম্পানী রেস্টুরেন্ট, দ্য এশিয়ান স্ট্রিট কিচেন, খালসা হোটেল, দাওয়াত রেস্টুরেন্ট, বাদশাহ ইত্যাদি।