নিস্তব্ধ কক্সবাজার : সাগরে খেলছে ডলফিন, বদলাচ্ছে পানির রঙ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : নিস্তব্ধ কক্সবাজার


নিস্তব্ধ কক্সবাজার


বঙ্গোপসাগরের কোলঘেষে গড়ে ওঠা বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। দেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ এই সমুদ্র সৈকতে ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলছিল মানুষের আনাগোনা। পর্যটক বৃদ্ধি সু-সংবাদ হলেও অপরিকল্পিত অবকাঠামো, সমুদ্রের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংসের কর্মকান্ড এবং পর্যটকদের অসচেতন আচরণে হুমকির মুখে ছিল বঙ্গোপসাগরের এই তীর। করোনা আতঙ্কে মানুষ যখন নিজ ঘরে অবরুদ্ধ হয়ে গেলো, প্রকৃতি তখন ডানামেলে দম নেয়া শুরু করলো। করোনা ভাইরাস আতঙ্ক মানবজীবনে নেতিবাচক প্রভাব থাকলেও প্রকৃতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। আমরা অসেচতন হওয়াতে প্রকৃতির যে বিনাশে মেতে উঠেছিলাম সেটাই যেন এখন প্রকৃতি দেখিয়ে দিচ্ছে।

প্রকৃতিকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিলে তা যে আমাদের জন্য অনেক সুফল বয়ে আনে তাই যেন বুঝিয়ে দিল সামুদ্রিক ডলফিন। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে হঠাৎ করে এক বিরল দৃশ্যের দেখা মিলেছে। কোভিড-১৯ আতঙ্কে বৈশ্বিক পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমার ইতিবাচক ফল কক্সবাজারেও দেখা গিয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজার সৈকতের নিকট বঙ্গোপসাগরে ভেসে বেড়াতে দেখা গেছে ডলফিন, সমুদ্রের পানি ক্রমে নীল আকার ধারণ করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ১৫২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্হিত একটি পর্যটন শহর কক্সবাজার। নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত কক্সবাজার চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত যা কক্সবাজার শহর থেকে বদরমোকাম পর্যন্ত একটানা ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশের বৃহত্তম সামুদ্রিক মৎস্য বন্দর এবং সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশান কক্সবাজারে অবস্থিত।

নিস্তব্ধ কক্সবাজার

রাজধানী ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব প্রায় ৪১৪ কিলোমিটার, এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র। দেশের রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক পথে এবং বাসযোগে কক্সবাজার যাওয়া যায়, তবে সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার অবধি রেললাইন স্থাপনের প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। দেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হওয়াতে এই সমুদ্র সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে। মিয়ানমারের সামরিক নিধনযজ্ঞ থেকে বাঁচতে প্রায় সাড়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কক্সবাজারের টেকনাফে অবস্থিত শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। এসব শরনার্থীকে ঘিরে আচমকাই সেখানকার জনসংখ্যা হু হু করে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক দাতব্য, মানবাধিকার ও দেশের বিভিন্ন সংস্থার লোকেরে ভিড়ে হঠাৎ ই যেন কক্সবাজার জনসমুদ্রে পরিণত হয়ে যায়। এরই সাথে দেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হওয়াতে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে শত শত হোটেল-রিসোর্ট। যা সৈকতের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।

পর্যটকদের অসচেতনতার কারনে এতদিন ধরে যে সমুদ্র নিষ্প্রাণ হয়ে ছিল, করোনা আতঙ্কে সেই সাগরে প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধের পদক্ষেপ হিসেবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটক নিষিদ্ধ করেছে। সৈকত ও সাগরে নামতে দেয়া হচ্ছেনা স্থানীয়দেরকেও। গত ৫ দিনে সম্পুর্ন প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরে এসেছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। সোমবার (২৩ মার্চ) সারা দিন পর্যটক শুন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বিরল ডলফিন খেলা করতে দেখা গেছে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে কলাতলি পয়েন্টে সোমবার সকাল থেকে এক দল ডলফিন খেলা করতে করতে দেখা গেছে। ১০ থেকে ১২ টি ডলফিনের এই দলটি সকাল ৯টা থেকে সাগরে নীল জলে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করছিলো। কলাতলি সমুদ্র সৈকতের একদম কাছেই ডলফিন গুলো খেলা করতে দেখা গেছে। সমুদ্র পাড় থেকে ডলফিনের খেলা করার দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো।

নিস্তব্ধ কক্সবাজার

নিস্তব্ধ কক্সবাজার

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, কক্সবাজার। ছবি : আল-জাজিরা


 স্থানীয়দের মতে, সকালে স্থানীয় কয়েকজন সার্ফার সমুদ্র সৈকতে সার্ফিং করতে গিয়ে ডলফিনের এই দলটি দেখতে পান। সার্ফার দলটি উঠে যাওয়ার পরে ডলফিনের দলটি সৈকতের আরো কাছাকাছি এসে খেলতে থাকে। বিকেল ৩টার পরে ডলফিনের দলটি আর দেখা যায়নি। স্থানীয়রা জানিয়েছে, গত ৩ দশকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে কখনো ডলফিন খেলা করতে দেখা যায়নি। গত ৫ দিন ধরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত খালি করে রেখেছে স্থানিয় প্রশাসন। এর ফলে সৈকতের দূষন একেবারেই কমে গেছে। সৈকতে দূষন ও পর্যটক না থাকায় ডলফিন এসেছে বলে ধারনা করছে তারা। কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করাটা এখন সময়ের দাবি। পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থা ও ভ্রমণপ্রেমীদের সচেতনতাই পারে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে। যে ডলফিনকে গত ৩ দশকেও কক্সবাজারে আশেপাশে দেখা যায়নি, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ইতিবাচক আচরণেই তারা আমাদের নিকটে ফিরে এসেছে। সমুদ্র তীরবর্তী সব অবকাঠামোকে নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে নির্মাণ করা উচিৎ। একই সঙ্গে সরকারী উদ্যোগে সমুদ্র তীরবর্তী সকল কল-কারখানা, শিপইয়ার্ড ও বন্ধ করে দেয়া উচিৎ। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে আমরা টিকতে পারব না। পরিবেশের জন্যে ইতিবাচক পদক্ষেপ আমাদের নেয়া উচিৎ। প্রতিটা পর্যটকের উচিৎ সৈকত, সমুদ্র এবং এর জীব বৈচিত্রের কোনোভাবে যেন ক্ষতি না হয়ে সেটা নিশ্চিত করা। নয়তো প্রকৃতি আমাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আমরা যদি প্রকৃতির যত্ন নিই তাহলে প্রকৃতি আমাদের জন্যে অকল্পনীয় উপহার বয়ে আনবে। পর্যটন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তাই সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে।  

আরো পড়ুন ঃ আজ রাত ১২টা থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ  

নাবিলা বুশরা   এস এম