ঐতিহ্যগত ভাবেই বাঙালি মানেই খাবারের সাথে আত্মিক এক বন্ধন। সেই অনাদিকাল থেকেই খাবারের বেলায় বাঙালি আপোষ করেনি। নিজের সাধ্যে যা আছে, তা দিয়েই রীতিমতো পেটপূজা করেছে বাঙালি। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলেই শুধুমাত্র খাবার কেন্দ্রিক আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এসব খাবারের সন্ধান শুরু হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের কোলে জেগে ওঠা কক্সবাজার থেকে। নিঃসন্দেহে কক্সবাজার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্রের অন্যতম। আর কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী খাবার বলতে সবার আগে যা প্রাধান্য পাবে তা হলো শুটকি।
শুটকির স্বর্গ
কক্সবাজারকে একবাক্যে বলা চলে শুটকির স্বর্গ। কক্সবাজারের নাজিরারটেকে সারাবছর চলে শুটকির উৎপাদন এবং বিপণন কার্যক্রম। চিংড়ি, লইট্যা, রূপচাঁদা, ছুরি, লাক্ষ্যা, কোরাল... যা চান প্রায় সবই পাবেন আপনি এখানে। তবে সবার আগে জেনে নেয়া যাক, শুটকি কেন খাবেন?
ঐতিহ্যবাহী শুটকি শুকানোর মাঠ। ছবি : সংগৃহীত
শুটকির গুণাগুণ
শুকিয়ে মাছ সংরক্ষণ একটি অতি প্রাচীন ও বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। শুঁটকিকরণ একটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে সূর্যালোক এবং বাতাসের মাধ্যমে মাছ থেকে পানি বা জলীয় অংশ অপসারণ বা হ্রাস করে মাছকে শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। মাছের দেহে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ পানি থাকে। সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের জন্য শুঁটকিতে পানির পরিমাণ খুব দ্রুত ১৬-১৮ শতাংশে কমিয়ে আনতে হয়। শুঁটকিকরণের ফলে মাছের দেহের পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য অণুজীবসমূহ জন্মাতে পারেনা।
শুঁটকি মাছে সাধারণত ৬০-৮০ শতাংশ আমিষ এবং ৮-২০ শতাংশ তৈল বা চর্বি থাকে। শুঁটকি মাছের তেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওমেগা-৩ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড থাকে যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী, যেমন স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা হ্রাস করে, উচ্চ রক্তচাপ হ্রাস করে এবং শর্করা বিপাকে সাহায্য করে ইত্যাদি।
শুটকি প্রস্তুত করা হচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত
তবে, আমাদের দেশে যেভাবে রোদে উন্মুক্ত রেখে তাতে বিপদ দুটি। প্রথমত, এতে প্রচুর মাছি এবং পোকামাকড় আবাস গড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, পোকা তাড়াতে কীটনাশক ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় এক্ষেত্রে। যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। তাই শুটকি খেতে চাইলে কেনার সময়েই সতকর্তা অবলম্বন করুন। এক্ষেত্রে চাইলে অনলাইন অর্ডারের ওপর নির্ভর করতে পারেন।
ঐতিহ্যবাহী কিছু পদ
রান্না করার বিভিন্ন পদ্ধতি ছাড়াও কক্সবাজারের শুটকি পাতুরির বিশেষ সুনাম আছে। এটি তৈরিতে দরকার হবে চ্যাপা শুটকি। প্রথমেই শুটকি বেটে নিতে হবে।
শুটকির পাতুরি। ছবি : সংগৃহীত
অল্প তেলে আলু কুচি ২ কাপ, ১ কাপ পেঁয়াজ কুচি, এবং স্বাদমত রসুন বাটা, মরিচ বাটা, হলুদ বাটা, আদা বাটা ভুনা করে নিন। ভুনা করা হলে বেটে রাখা শুটকির সাথে এই ভুনা মিশ্রণের একটি পুর তৈরি করে তা লাউ বা কুমড়ো পাতায় মুড়িয়ে নিন।
এরপর সেটা তেলে ভাজলেই তৈরি হবে শুটকির পাতুরি।
এছাড়া, কক্সবাজারের লইট্ট্যা শুটকি ভর্তার রয়েছে আলাদা কদর। এই শুটকি ভর্তা বেশ সহজ এবং চটজলদি বলা চলে। সাদা গরম ভাতের লইট্ট্যা শুটকি ভর্তা আপনাকে অন্যরকম স্বাদ দিবে।
শুরুতে চুলায় প্যান বসিয়ে ২ টেবিল চামচ সরিষার তেল গরম করে সামান্য লবণ দিয়ে পেঁয়াজ ও রসুন কুচি বাদামি করে ভাজুন।
মজাদার শুটকি ভর্তা। ছবি : সংগৃহীত
ভাজা পেঁয়াজ ও রসুন একটি বাটিতে উঠিয়ে একই প্যানে আরও ২ টেবিল চামচ সরিষার তেল দিন। মিডিয়াম আঁচে ৮ থেকে ১০ টি লইট্ট্যা শুঁটকির টুকরা বাদামি করে ভাজুন। হালকা বাদামি থাকতে থাকতে তুলে নিন। এবার শুকনা মরিচ ঢেলে সামান্য লবণ দিয়ে মেখে নিন। এরপর একে একে ভেজে রাখা সব উপকরণগুলো হাত দিয়ে ভর্তা করুন। একদম ভেঙে ফেলবেন না শুঁটকি। সেক্ষেত্রে পরিবেশন এবং খেতে কিছুটা দৃষ্টিকটু হতে পারে। সবশেষে ধনেপাতা কুচি দিয়ে মেখে বাটিতে সাজিয়ে পরিবেশন করুন শুঁটকি ভর্তা।
রূপচাঁদা শুটকির পদ কক্সবাজারের আরেকটি ঐতিহ্য বলা যেতে পারে। এটি তৈরি করতে প্রথমেই শুঁটকি এক ইঞ্চি সাইজের টুকরা করে নিতে হবে। এবার ভাল করে ধুয়ে ২ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন কাটা শুঁটকিগুলো। দুই ঘন্টা পরে ভেজানো শুঁটকিগুলো পানি থেকে তুলে পানি ঝরিয়ে নিন।
শুটকি বাজার। ছবি : সংগৃহীত
এবার কড়াইতে বাদামি করে পেঁয়াজ ভাজতে শুরু করুন। পেঁয়াজ বাদামী হতে শুরু করলে তাতে কিউব করে কাটা ৩/৪ টি টমেটো এবং ২ চামচ করে আদা বাটা, রসুন বাটা, জিরা বাটা এবং মরিচ বাটা দিন। সাথে হলুদ, মরিচ, ধনিয়া ও লবণ দিন স্বাদ অনুপাতে। মিনিট পাঁচেক কষিয়ে রান্না করুন। এরপর কাটা শুটকি ঢেলে আরো মিনিট দশেক রান্না করুন। খেয়াল রাখবেন, মশলা যেন পুড়ে না যায়। এরপর খানিক পানি দিয়ে আরো মিনিট দশেক রান্না করুন। সবশেষে উপরে ধনেপাতা ছিটিয়ে পরিবেশন করতে পারেন কক্সবাজারের বিখ্যাত রূপচাদা শুটকি।