নবাবী শাসনামল থেকে আজও টিকে আছে যেসব স্মৃতিচিহ্ন

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বাংলার নবাবদের থেকে প্রাপ্য কিছু অবশিষ্টাংশ

নবাব সিরাজউদ্দৌলা। ছবি : জাগো নিউজ ২৪

বাংলায় মুঘল সাম্রাজ্যের পর পরবর্তী শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করেন নবাবরা। সম্রাট আকবরের আমলে মুঘলদের পাঠানো আঞ্চলিক শাসকেরা বাংলা শাসন করতেন। তাদেরকে বলা হতো সুবাদার। মুর্শিদকুলি খান মুঘলদের এই শাসনকার্যের বিভিন্ন ফাঁক ফোকর ও দুর্বলতার সুযোগে নবাবী শাসন কার্য পরিচালনা শুরু করেছিলেন।

মুর্শিদ কুলি খান বাংলার প্রথম নবাব। তিনি মুঘলদের অধীনস্থে নিয়োজিত কর্মকর্তা হলেও বাস্তবে স্বাধীন শাসনকার্য পরিচালনা শুরু করতে পেরেছিলেন। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। চলুন জেনে আসা যাক নবাবদের দুটো গুরুত্বপূর্ণ প্রাসাদ সম্পর্কে :

আহসান মঞ্জিল : সঠিক সময়ে রক্ষা না করা হলে হয়তো আহসান মঞ্জিলও কালের গর্ভে হারিয়ে যেতো। ছবি : কালের কন্ঠ 

আহসান মঞ্জিল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কুমারটুলি এলাকায় অবস্থিত। এটি ছিল ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদারির সদর কাচারি। বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মুঘল আমলে এখানে জামালপুর পরগণার জমিদার শেখ এনায়েতউল্লাহ'র রঙমহল ছিল। পরে তাঁর পুত্র মতিউল্লাহ'র কাছ থেকে রঙমহলটি ফরাসিরা ক্রয় করে এখানে একটি বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে।

পুরান ঢাকায় অবস্থিত আহসান মঞ্জিল বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত নিদর্শন। ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে আহসান মঞ্জিল অবস্থিত। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নবাব আব্দুল গনি। তার ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নাম অনুসারে প্রাসাদটির নাম দেন আহসান মঞ্জিল। আহসান মঞ্জিলের জাদুঘরে অনেক গ্যালারি রয়েছে।

এখানে রয়েছে নবাবদের ভোজন কক্ষ, বড় বড় আলমারি, আয়না, চিনামাটির তৈরি জিনিস যার সবকিছুই নবাবদের ব্যবহৃত ছিল। নিচতলা থেকে নির্মিত একটি উচ্চতর গম্বুজ রয়েছে যা মূলত বাহিরে দৃশ্যমান। এছাড়াও রয়েছে তরবারি, হাতির কঙ্কাল, কাঠের বেড়া। এখানে একটি কাঠের সিঁড়ি রয়েছে যাকে বলা হয় প্রধান সিঁড়ি।

বহু বছরের পুরনো হওয়ার কারণে প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯০৪ সালের গৃহীত আলোকচিত্র অনুযায়ী কাঠের সিঁড়ি পুনরায় সংস্করণ করা হয়েছে। আহসান মঞ্জিলের নিকট রয়েছে আহসানুল্লাহ মেমোরিয়াল হাসপাতাল,মুসলিম লীগ কক্ষ এবং বিভিন্ন প্রতিকৃতি। বিভিন্ন সময়ে পর্যটকদের আনাগোনা থাকে আহসান মঞ্জিলে। ছবি : জাগো নিউজ ২৪

আহসান মঞ্জিলের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলাদেশ সরকার ভবনটিকে সংস্কার করে। পরবর্তীতে এটি জাদুঘরে পরিণত করেছে। এর সংস্কার কাজ ১৯৯২ সালে সম্পন্ন করে ওই বছরেরই ২০ সেপ্টেম্বর থেকে এই প্রাসাদটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এখানে একটি জাদুঘর স্থাপন করা হয়।

তথ্য মতে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নবাব পরিবারের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা বিদেশে পাড়ি জমান। তখন সেই সময়ে বাংলাদেশে যারা ছিলেন তারা এই প্রাসাদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণে সক্ষম ছিলেন না। ফলে এটি ক্রমাগত ধ্বংসের দিকে যেতে থাকে যা অত্যন্ত দুঃখজনক ছিল। পরে ১৯৭৪ সালে নবাব পরিবারের উত্তরসুরিরা আহসান মঞ্জিল নিলামে বিক্রি করবে বলে ভাবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবনটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করেন।

জাতির পিতা ১৯৭৪ সালের ২ নভেম্বর প্রাসাদ ভবনটি নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। এরপর সংস্কার করে এখানে জাদুঘর ও পর্যটনকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়। ১৯৮৫ সালের ৩ নভেম্বর আহসান মঞ্জিল প্রাসাদ ও  চত্বর এলাকা সরকার গ্রহণ করে সেখানে জাদুঘর স্থাপনের কাজ শুরু করে। ১৯৯২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আহসান মঞ্জিল জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। পরে জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

জিনজিরা প্রাসাদ : ঢাকার একটি ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি। ছবি : সংগৃহীত

জিনজিরা প্রাসাদ ঢাকার একটি ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি। বড় কাটারা প্রাসাদ বরাবর এর অবস্থান। এটি নির্মাণ করেছিলেন সুবেদার নবাব ইব্রাহিম খাঁ। পলাশীর যুদ্ধের সময় সিরাজউদ্দৌলার পরিবার জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দী অবস্থায় জীবনযাপন করেছিলেন। ১৭৬০ সালে মীর জাফরের পুত্র মিরনের কুচক্রে সিরাজের পরিবার জিনজিরা প্রাসাদ থেকে নেমে নদী আরোহণে বের হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘাতক বাকির খান ভ্রমণরত নৌকার ছিদ্র স্থান খুলে দেয়। এতে করে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই নৌকাটি ডুবে যায় এবং সিরাজ উদ দৌলার পরিবার মারা যায়। ছবি : সংগৃহীত 

এই প্রাসাদের কক্ষগুলো আয়তনে ছোট। এর পশ্চিম দিকে দুটি সমান্তরাল জায়গা রয়েছে। পূর্ব দিকে রয়েছে দোচালা ছাদের মত অংশ। এই প্রাসাদের তিনটি অংশ আজও টিকে আছে। প্রাসাদের প্রবেশ পথে রয়েছে একটি সুন্দর তোরণ।