থামেল : পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হিমালয় কন্যার এই এলাকা

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : রোমাঞ্চকর আয়োজনের কোনো কমতি নেই নেপালের থামেল এরিয়াতে

হরেক রঙের পতাকায় সাজানো নেপালের থামেল এরিয়া। ছবি : হলিডিফাই

 হিমালয় কন্যা হিসেবে বিশ্বে পরিচিত নেপালকে সাজানোর বেলায় প্রকৃতি যেন একটুও কার্পণ্য করেনি। প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধে অপরূপ এক লীলাভূমি হিসেবে গড়ে তুলেছে নেপালকে। যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই জেগে ওঠা পর্বতের গায়ে নানা রঙের খেলা, হিম হিম মৃদু-মন্দ হাওয়া। গ্রামীন একটা শান্ত পরিবেশের নিজেকে হারিয়ে প্রকৃতির অংশ হিসেবেই খুঁজে পাওয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার জন্য যেকোনো পর্যটকেরই পছন্দের স্থান নেপাল। আর এমনই এক দেশে নাগরিক কোলাহল আর ব্যস্ততার এক নতুন স্বাদ পাওয়া যায় দেশটির রাজধানী কাঠমুন্ডুর মেইন টুরিস্ট স্পট থামেলে। থামেল চা, রেশমি কাপড়, গরম কাপড়, পর্বতারোহণের সরঞ্জাম, অ্যান্টিক, চিত্রকর্ম, ট্রাভেল এজেন্সি ও টুরিস্ট-স্যুভেনির বা পর্যটন-স্মারক এসবের দোকানে ভরপুর। পর্যটকদের স্যুভেনির সংগ্রহ, দামাদামি কিংবা ভাঙা বুলিতে স্থানীয়দের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা পর্যটক, মাঝেমধ্যেই রাস্তার পাশের নাইট ক্লাবগুলো থেকে গান-বাজনার আওয়াজ।

টিমটিমে আলো, রাস্তার পাশে খাবারের দোকান থেকে ভেসে আসা ঘ্রাণ সবকিছুতেই পাওয়া যায় থামেলের বিচিত্র জীবনদৃশ্য। প্রতিদিনই কতো নতুন মানুষেরা আসে আর পুরনোরা চলে যায় আবার নতুন কারো অপেক্ষায় থাকে থামেল। থামেলের জীবনে যেন একটু অবসরের ফুসরত নেই। সবসময়ই ছুটে চলা আর ছুটে চলা।

সন্ধ্যার পর এখানকার নাইট ক্লাবগুলো পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। হুট হাট অ্যান্টিকের দোকানে ঢুকে পড়া পর্যটকেরা আগ্রহ নিয়ে জিনিসপত্র দেখে। এখানে পাওয়া যায় কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, বুদ্ধমূর্তি, গান-বাজনার নানা সরঞ্জাম, বিভিন্ন  চিত্রকর্ম, কাঠের বানানো মুখোশ, নেপালের ঐতিহ্যবাহী খুরপি- একধরনের খাপওয়ালা ছুরি, বিভিন্ন ধরনের রঙিন পুঁতির মালাসহ ট্রাইভাল বিভিন্ন গহনা। এছাড়াও আছে ট্যাপেস্ট্রি, নেপালের বিভিন্ন দর্শনীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও স্থানের ছবি সংবলিত বিভিন্ন স্যুভেনির, কাঠে খোদাইকৃত হ্যান্ডমেইড জিনিসপত্র, ক্যালেন্ডার, শুভেচ্ছা কার্ডসহ পর্যটনের নানা স্মারক পণ্য। প্রতিটা দোকান এসব পণ্যে ঠাসা। আবার এসব পণ্য কেনার জন্য দোকানগুলোয় পর্যটকের বেশ ভিড়ও আছে। অনেক দর্শনার্থীরা আবার ঘুরে ঘুরে রাতের কাঠমান্ডুতে এসব পর্যটন-স্মারক, পর্যটকদের পদচারণা দেখে, খেয়ালি হেঁটে চলা, নাগরিক কোলাহলে নিজেকে আলাদা করে খোঁজা।

রাতে যেন অন্য এক রুপ ধারণ করে নেপালের থামেল এরিয়া। ছবি : কে টি এম গাইড

রাতের থামেল আর সকালের থামেলকে প্রতিটা পর্যটকই আলাদা ভাবে আবিষ্কার করে। একটু অন্যরকম লাগে। দিনের বেলায় পর্যটকেরা ঘুরে ঘুরে দোকানগুলোর পণ্য দেখে, টুকিটাকি কেনাকাটাও করে। থামেলের রাস্তায়ও মাঝে মাঝে টুংটাং আওয়ার করে দুই-একটি রিকশা চলে। থামেলের জয়থা এলাকার অধিকাংশ হোটেল-রেস্টুরেন্ট চীনা পর্যটকদের পদচারণায় মুখর। মূলত চীনাদের থাকা-খাওয়ার জন্য এ এলাকা হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলো বিশেষভাবে পরিচিত। সেজন্য চীনা পর্যটকদের পদচারণা এই এলাকায় বেশি। থামেলের উপশহর জয়থার কাঁচাবাজারে আলু, পেঁয়াজ, টমেটো, শাকসবজি সবই বেচাকেনা হয়। এসব ছোট বাজারে পুরুষ বিক্রেতার চেয়ে নারী বিক্রেতার সংখ্যাই বেশি। আশেপাশে হেঁটে বেড়ানোর মতো অনেক জায়গা আছে। এর মধ্যে নারায়ণহিটি প্যালেস জাদুঘরে অন্যতম। থামেল থেকে দশ মিনিটের মতো হাঁটা পথ এই জাদুঘর। [caption id="attachment_27906" align="alignnone" width="1300"] রয়েছে বর্ণিল কেনাকাটার অফুরন্ত সুযোগ। ছবি : হলিডেস টু নেপাল

 একসময় নেপালের রাজপ্রাসাদ ছিল এই জাদুঘর। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে রাজা মহেন্দ্র বিশাল এই রাজপ্রাসাদ সংস্কার করেন। নেপালের রাজকীয় সব কাজ, রাজপরিবারের আবাসন, অতিথিদের আবাসন সবই ছিল এই প্রাসাদে, প্রাসাদের দেয়ালে রাজপরিবারের বিভিন্ন সদস্যের ছবি, বিভিন্ন কক্ষে তাদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র, চেয়ার-টেবিল, খাট-আলমিরা সাজানো আছে এখনও। এগুলো ঘুরে ফিরে দেখা যেতে পারে। কাঠমান্ডু এয়ারপোর্ট থেকে থামেল বাস ও ট্যাক্সি করে যাওয়া যায়। এরপর হোটেল খোঁজে নেওয়ার পালা। থামেল প্রধান টুরিস্ট এরিয়া তাই এখানে হোটেল ভাড়া একটু বেশি। মেইন থামেলে খাওয়া খরচও বেশি। তাই খরচ বাঁচাতে অনেক পর্যটক একটু শহরতলীর দিকে ইন্ডিয়ান হোটেলে রাত্রিযাপন করেন। রাতের থামেল ঘুরে দেখা যেন আবশ্যক। রাতের থামেল দেখে তবেই অন্য কোথাও যাত্রা করা।

ছবি : পিন্টারেস্ট

বিমানবন্দর থেকে থামেলের দূরত্ব প্রায় আট কিলোমিটার। এখানের রাস্তায় কিছুটা ট্রাফিক জ্যাম থাকতে পারে, অন্যসব পাহাড়ি নির্জন রাস্তার মতো নয়। এয়ারপোর্ট থেকে নেয়া ট্যাক্সির ভাড়া চুকিয়েই মাথা গোঁজার জন্য হোটেল খুঁজতে শুরু করে পর্যটকেরা। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সবচেয়ে জমজমাট এলাকা হচ্ছে থামেল। পর্যটন এরিয়া হওয়ায় অলিগলিতে হোটেল, রেস্টুরেন্ট আর নানা পণ্যের দোকানে ভরপুর এই এলাকা। থামেলকে কাঠমান্ডুর প্রাণকেন্দ্র বলা হয় এজন্য। এখানে ভারতীয় খাবার পাওয়া যায়। এছাড়া তান্দুরি রুটি আর ডাল কিংবা বিভিন্ন ভর্তা ভারতীয় খাবারের অভাব পূরণ করে। রুটি আর ডালের স্বাদে ভিন্নতা পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন ধরনের মরিচ-টমেটোর ভর্তার নেপালি স্বাদ আলাদা করা যায় খুব সহজেই। মূলত এই ভর্তার মাধ্যমেই শুরু হয় নেপালি খাবারের আলাদা স্বাদ গ্রহণের পর্ব। ঠাণ্ডার জন্য হিম হয়ে আসা হাত গরম করার জন্য রুটির পর চা খাওয়া কিংবা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে হিম হিম হাওয়া উপভোগ করা যায়। এর সাথে সাথে রেস্টুরেন্টের সামনে ব্যস্ত রাস্তায় মানুষের ছুটে যাওয়া দেখা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা দেয়। থামেলের রাস্তা দোকানপাট-রেস্টুরেন্ট সবসময়ই জমজমাট। রাস্তায় পর্যটকের সংখ্যা সবসময়ই চোখে পড়ার মতো। শহুরে ব্যস্ততার এই থামেলে গল্প-উপন্যাসে পড়া বিষন্ন কিছু সুন্দর সময় কাটে ভ্রমণপ্রেমীদের। বৈচিত্রে ভরপুর এই থামেল এরিয়ায় সব পর্যটক নিরাপদ থাকুক, ভালো কাটুক সব ভ্রমণপিয়াসী মন।


তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, ভিডিও ব্লগ