টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি : 'আমার বিশ্বাস, পর্যটনের সকল সংকট আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব'

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : দেশের পর্যটন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে পারলে ব্যাপক উন্নতি সম্ভব


আখলাকুর রহমান, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের ম্যানেজার। একই সাথে তিনি জাতীয় হোটেল এন্ড ট্যুরিজম টেনিং ইন্সটিটিউটে অধ্যক্ষের দায়িত্বে আছেন। সরকারের পর্যটন সেক্টরে কর্মরত থাকার সুবাদে পর্যটন শিল্পের অতীত ও বর্তমান নিয়ে আখলাকুর রহমানের অভিজ্ঞতা অনেক। আজ ট্রাভেল বাংলাদেশের মুখোমুখি হয়ে সেখানকার কিছু অভিজ্ঞতার আলোকেই কথা বলছেন তিনি।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : কোভিড-১৯ এর দুঃসময় কীভাবে অতিবাহিত করছেন?

আখলাকুর রহমান : করোনার ফলে গত ২৬ মার্চ থেকে সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় তখন এই ছুটি যে এতো দীর্ঘ হবে তা আমরা বুঝতে পারিনি। প্রথমে ভেবেছি দুই সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর অফিস খুলে যাবে। দেখলাম যে না, এটা ধীরে ধীরে আরও দীর্ঘ হলো। আমাদের পরিসংখ্যানের চেয়ে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার আরও বেড়ে গেলো।




নিজে নিয়মিত ভ্রমণ করেন আখলাকুর রহমান। ছবি : আখলাকুর রহমান


লক-ডাউনের ফলে শুরু থেকে ঘরে থাকছি। তখন থেকে ঘরে কাজের লোক নেই। ফলে পরিবারের সাথে কাজ করছি। কিছুটা ব্যায়াম করা, ছোট্ট একটা মেয়ে আছে, তাকে সময় দেয়া। এগুলো করে সময় পার করছি। বলা যায় বন্দি জীবন। আমার স্ত্রী প্রিপারেটরি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান। সে কবিতা আবৃত্তি করে, শুনি। ফেসবুকের মেমরি দেখি। আর আমাদের অফিসিয়াল কাজগুলোর অনলাইন মিটিং চালু হয়েছে। অনলাইন মিটিং চালু করার পর আমরা ধীরে ধীরে অফিসের পেন্ডিং কাজগুলো সমাধান করতে শুরু করি।

আরও জানতে : নারীরা আরও বেশি ভ্রমণ করা ও বিশ্বটাকে জানার সুযোগ পাবে এই স্বপ্ন দেখি

ট্রাভেল বাংলাদেশ : পর্যটন কর্পোরেশনের নতুন ভবন হয়েছে, এতে করে পর্যটনশিল্পের কোন ধরনের সুবিধা হবে?

আখলাকুর রহমান : বর্তমানে আমরা চারতলা একটি বিল্ডিংয়ে অফিস করছি। যেটি কাজের জন্য তেমন সুবিধার নয়। কোনও রকমে চালিয়ে নিচ্ছি। প্রথমে তেজগাঁওয়ে আমাদের অফিস ছিল। এখন আগারগাঁওতে নতুন অফিস ভবন হয়েছে। আমাদের কাছে আগস্ট মাসে হ্যান্ডওভার করা হবে। আশা করা যাচ্ছে, আমরা আগস্ট থেকে হেড অফিসে কাজ শুরু করতে পারবো। ভবনটি ১৩ তলা, গ্রাউন্ডে ২ তলা। ৭ হাজার স্কয়ার ফিটের একটা বিল্ডিং। পর্যটনের উন্নয়নের জন্য আসলে এমন একটি ভবনে অফিস প্রয়োজন ছিল। আমি যখন চাকরি শুরু করি, তখনও লোকজন তেমন ভ্রমণ করতো না। এখন কিন্তু অসংখ্য লোকজন ভ্রমণ করে। বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বেড়েছে।

দেশের পর্যটনের ক্ষেত্র বৃদ্ধি পেয়েছে। কার্যক্রমও বেড়েছে। অনেক পর্যটক বিদেশে থেকে আসেন। এই যে কলেরব বেড়েছে, সেভাবে আমাদের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্র বাড়েনি। ফলে, পর্যটকদের পর্যাপ্ত সুবিধা দিতে সমস্যা হতো। যেহেতু এখন একটা কাঠামো তৈরি হয়েছে, তাই আগের চেয়ে দ্রুত কাজ করা সম্ভব হবে। ভবনে সবধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকছে। ইন্টারনেট, ওয়াইফাই সুবিধাসহ থাকবে, ভালো রেস্টুরেন্ট। কর্মকর্তাদের নিয়মিত মিটিং রুম, অফিস-রুম সবকিছু।




পর্যটন কর্পোরেশনের নতুন বিল্ডিংয়ের সামনে আখলাকুর রহমান। ছবি : আখলাকুর রহমান


 মূলত পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের জন্য এরকম একটি অফিস-ভবন আগেই দরকার ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে তো তা সম্ভব হয় না। এখন এই ভবন থেকে সকল অফিসিয়াল কর্মকর্তাদের মিটিং করা হবে, দ্রুতগতিতে পরিষেবা দেয়া সম্ভব হবে। এতে করে বিরাট একধাপ এগিয়ে গেলো আমাদের পর্যটন ব্যবস্থাপনা। দ্রুত কাজ করা গেলে আমরা বহুজাতিক টুরিস্টসহ পর্যটনের সকল কাজে দ্রুত সেবা দিতে পারব। এতে সরকারের আয় বাড়বে, ফরেন কারেন্সি আসবে, তরুণদের চাকরির সুযোগ বাড়বে, দেশ-বিদেশের পর্যটকরাও উপকৃত হবেন।

আরও জানতে : এয়ারলাইন্সের খরচ বেড়ে গেলেও বিমানের ভাড়া বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না!

ট্রাভেল বাংলাদেশ : ইদানীং অনেক তরুণ পর্যটনশিল্পে উদ্যোগ নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে পর্যটন কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে তাদের উদ্যোগে কোন ধরনের সহযোগিতা করা হয়?

আখলাকুর রহমান : তরুণদের অবশ্যই সহযোগিতা করা হয়। এক্ষেত্রে তাদেরকে প্রস্তাবনা দিতে হবে। সরকারের চাওয়া প্রজেক্ট প্রোফাইল অনুযায়ী তা তৈরি করতে হয়। প্রস্তাবনা ট্যুরিজম প্লানিং উইংয়ে জমা দেয়ার পর সেটি মন্ত্রণালয়ে চলে যাবে। মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে দেখে ভালো মনে হলে প্রজেক্ট পাশ করে থাকে৷ আমি কিছু ধারণা দিলাম। আরও অনেক কিছু নিয়ম-কানুন আছে। সেগুলো প্লানিং উইংয়ের সাথে যোগাযোগ করলে জানা যাবে।




ছবি : আখলাকুর রহমান


 কোনো কোনো প্রজেক্টে পুরোটা সরকার প্রদান করে। আবার কিছু প্রজেক্টে সরকার ও পাবলিক শেয়ার থাকে। যেটা যেভাবে পাওয়ার মতো যোগ্য সেভাবে পেয়ে থাকে। প্রস্তাবনা ভালো হলে পাশ হয়। মুশকিল হলো, আমাদের তরুণরা এই বিষয়ে দক্ষ না। প্রশিক্ষিত না। যে কারণে সমস্যাটা হয়।

ট্রাভেল বাংলাদেশ : পর্যটন কর্পোরেশনের পর্যটন বিষয়ে গবেষণার কোনও রকম শাখা কি আছে? সেখানে কীভাবে কাজ করা হয়?

আখলাকুর রহমান : পর্যটন নিয়ে গবেষণা করার একটা আলাদা উইং আছে। তবে ওখানে ডাটা অপ্রতুল। দক্ষ জনবল সংকট।।আমাদের প্লানিং উইংয়ে গবেষণা অফিসার আছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ডাটা না থাকার ফলে আমরা গবেষণার কোনও প্রজেক্ট সেখানে নিতে পারি না। আসলে সরকার প্রজেক্ট দেয়ার জন্য প্রস্তুত। মনে করুন, আপনাকে ৫০০ কোটি টাকা দিতে পারবে। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে দেবে? আপনাকে তো গুছিয়ে বলতে পারতে হবে। সেভাবে প্রস্তাবনা দিতে জানতে হবে।




নিজ অফিসে মিটিংয়ে ব্যস্ত আখলাকুর রহমান। ছবি : আখলাকুর রহমান


বিদেশে পর্যটনের কোন দিকটা কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে তা নিয়ে গবেষণা করা হয়, সমুদ্রের নদীর পানির কি অবস্থা তা যাচাই করা হয়, পর্যটকদের কোন ধরনের সুবিধা দেয়া যায়, কীভাবে নতুনত্ব আনা যায় ইত্যাদি সবকিছু নিয়ে গবেষণা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে তা করা সম্ভব হয় না। এখানে এখনও অগোছালো অবস্থা। লোকজনও সচেতন না। আমরা নিজেরা চেষ্টা করলে অনেক কিছু সমাধান করতে পারি। এই জায়গায় অবশ্যই পরিবর্তন দরকার। নয়তো ভালো কিছু করা যাবে না। বিশ্ব পুরোপুরি পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদেরকে সেভাবে পরিবর্তন করতে হবে। সরকারের বিভিন্ন সেক্টরে বলুন, প্রাইভেট সেক্টরে বলুন, নতুন প্রজন্মের ক্ষেত্রে বলুন, কমিউনিটি বলুন কিংবা রাজনীতি; সবখানে পরিবর্তন আসতে হবে। নয়ত উন্নতি অসম্ভব হবে।




এনএইচটিটিআইয়ের ক্লাসে আখলাকুর রহমান। ছবি : আখলাকুর রহমান


আরও জানতে : 'পর্যটন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতার বিকল্প নেই'

ট্রাভেল বাংলাদেশ : কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে কোন ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় আপনার?

আখলাকুর রহমান : আমি আশা রাখি, করোনার পরে সবকিছুতে আমূল পরিবর্তন আসবে। আমার বিশ্বাস, অন্য দেশের সাথে আমরা নিজেদের তুলনা করতে পারব। কিংবা অন্যদের চেয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারব। করোনা-কালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও পরিবর্তন আসছে। আমি মনে করি পরিবর্তন হবে। সুন্দর পৃথিবী দেখতে পারব, নতুন প্রজন্মকে আমরা সুযোগ দিতে পারবো এবং যে সংকট হয়েছে সেটাও কাটিয়ে উঠতে পারবো।  

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : সাইফুল্লাহ সাদেক   এস এম